ব্যাংকনীতিতে দুর্বলতা দেখা যায়

ব্যাংকনীতিতে দুর্বলতা দেখা যায়
ছবি: ইত্তেফাক

‘করোনা-১৯’ নামীয় অতিমারি থেকে আমরা অনেক শিক্ষালাভ করেছি। এর মধ্যে একটা শিক্ষা পেয়েছি ব্যবসায়-বাণিজ্যে ও ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে। ব্যবসায়-বাণিজ্য যে অঙ্ক নয়, তা আমরা বুঝতে পেরেছি। অথচ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঋণ খেলাপের সংজ্ঞা অঙ্কের মতো। এতে কোনো ব্যতিক্রম নেই। ব্যবসায় ভালো চলল কি চলল না, ক্ষয়ক্ষতি হলো কি হলো না, লাভ-লোকসান হলো কি হলো না—এসব ঋণখেলাপি নির্ণয়ে কোনো কাজে লাগে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুনির্দিষ্ট ফর্মুলা আছে, সেই অনুসারে ব্যাংকগুলো তাদের নিজস্ব ব্যাংকের খেলাপি চিহ্নিত করে। চিহ্নিত করার পর এর বিপরীতে নির্দিষ্ট হারে ‘প্রভিশন’ বা সঞ্চিতি রাখে, যাতে টাকা আদায় না হলেও ব্যাংকের কোনো ক্ষতি না হয়। এবার ‘করোনা-১৯’-এর কারণে সৃষ্ট ব্যাবসায়িক ও আর্থিক মন্দা মোকাবিলা করার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক অভূতপূর্বভাবে ঋণ খেলাপের সংজ্ঞামাফিক বিচার স্থগিত করে দেয়। ব্যাংকগুলোকে বলে, নতুন নিয়ম মেনে চলার জন্য। এই নতুন নির্দেশের আলোকে ২০২০ সালে কোনো ঋণগ্রহীতা তার ঋণ অথবা কিস্তি পরিশোধ না করলেও তাকে ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। অধিকন্তু ঋণ পরিশোধের জন্য লম্বা পরিশোধ তপশিল করার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। সুদের হিসাব স্থগিত করা হয়েছে। উপরন্তু নতুন করে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর জন্য সরকার ১ লাখ ২০ হাজার কোটিরও বেশি পরিমাণের প্রণোদনা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এতে রয়েছে ওয়ার্কিং ক্যাপিটেলের সুবিধা, রপ্তানি বৃদ্ধিকল্পে ঋণসুবিধা। ছোট-বড়-মাঝারি কুটির ও ক্ষুদ্রশিল্পে সবার জন্য বিশেষ ঋণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কৃষকদের জন্য রয়েছে এতে আলাদা ব্যবস্থা। এসব পদক্ষেপ থেকে কী বোঝা গেল? অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের উদ্দেশ্যে সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক যৌথভাবে সব নিয়মনীতি ভেঙে ঋণের ব্যবস্থা করেছে। অবশ্য বলা দরকার, করোনা-১৯-এর কারণেরই যে শুধু বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, তা নয়। করোনা-১৯-এর আগেই সরকার ঋণের ক্ষেত্রে বড় বড় ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নেয়।

ঐসব গ্রাহককে ‘ঋণ খেলাপের’ সংজ্ঞা/অঙ্ক থেকে মুক্তি দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অভূতপূর্ব সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের ঋণ পরিশোধের জন্য প্রচুর সময় দেওয়া হয়। ঋণের সুদ হ্রাস করা হয়। সুদ মওকুফের ব্যবস্থা করা হয়। স্বল্পমেয়াদি ঋণকে দীর্ঘমেয়াদি ঋণে রূপান্তিরত করা হয়। এসব বড় বড় ঋণগ্রহীতার ক্ষেত্রে ঘটে। ছোট ছোটো ঋণগ্রহীতার কপালে তা জোটেনি।

এসব কর্মকাণ্ড, সিদ্ধান্ত, পদক্ষেপ থেকে আমরা কী শিক্ষা পাই? শিক্ষা একটাই, ব্যবসায়-বাণিজ্য কোনো অঙ্ক নয়। এর উত্থান-পতন আছে, ভালোমন্দ আছে। নানা করণে তা ঘটে। এসব মোকাবিলা করার জন্য ‘ঋণ খেলাপের’ সংজ্ঞা অনেক সময় উপযোগী হয় না।

বলাই বাহুল্য, ব্যবসায়-বাণিজ্য ভালো চললে ব্যবসায়ীরা ব্যাংকের টাকা ফেরত দেবে (ইচ্ছাকৃত খেলাপিরা ছাড়া)। আবার ঋণ নেবে। হয়তো কিছু সুদ মওকুফ হবে। কিন্তু লেনদেন চলবে। ব্যবসায়ী তার ব্যবসায় বড় করবে। ঋণের পরিমাণ বাড়বে, এটাই চলমান প্রক্রিয়া। এতে অনেকে পেছনে পড়বে, অনেকে ভালো করবে। অনেকে নতুনভাবে আসবে। ব্যাংক দেবে, কাস্টমার নেবে, চলবে ব্যবসা। তা উত্থান-পতনের মধ্যেই। এই উত্থান-পতনে ব্যাংকের খেলাপি ঋণেও উত্থান-পতন ঘটবে। এই প্রক্রিয়াতে বুঝতে হবে, কেন ঋণ খেলাপ হচ্ছে। কেন ব্যবসায়ীরা ব্যাংকের টাকা ফেরত দিচ্ছে না। এসব বুঝতে হলে আবেগময় হলে চলবে না। প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করতে হবে। ফেব্রুয়ারি মাসের ১৩ তারিখের দৈনিক ইত্তেফাকে একটি খবর দেখলাম, এর শিরোনাম হচ্ছে :‘ঋণখেলাপি হওয়ার নেপথ্যে’। উপশিরোনাম হচ্ছে ‘এ অবস্থা থেকে উত্তরণে বড় ধরনের নীতি সংস্কারের কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা’। খবরটি পাঠ করে কয়েকটা বিষয় বোঝা যায়। এক গ্রুপ ঋণগ্রহীতা আছে যারা ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি। এদের কথা আলাদাভাবে আলোচনা করতে হবে। রিপোর্টটিতে বলা হয়েছে, নীতিগত, ব্যবসায়গত, প্রক্রিয়াগত অনেক সমস্যা আছে, যা ঋণখেলাপি তৈরি করে। অবকাঠামোর সমস্যা, গ্যাস-বিদ্যুতের সমস্যা, রাস্তাঘাটে কাগজপত্র পরীক্ষানিরীক্ষার সমস্যা, উচ্চ করহার, গোষ্ঠীবিশেষের প্রভাব-প্রতিপত্তি প্রকৃত উদ্যোক্তাদের অবহেলা,

ইত্যাদিকে ঐ সংশ্লিষ্ট রিপোর্ট খেলাপি ঋণ তৈরিতে সহায়ক শক্তি বলে উল্লেখ করেছে। বলাই বাহুল্য, প্রত্যেকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। নীতিগত সমস্যার কথাই বলি। সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বছরখানেক আগে একটা ইন্টারভিউতে খুবই অনুধাবনযোগ্য একটা কথা বলেছেন। ‘বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেশে ব্যাংক প্রতিষ্ঠার জন্য কোনো উদ্যোক্তা ছিল না। যারা সুবিধা নিয়েছে তারা আগে কখনো উদ্যোক্তা ছিল না। তারা লুটপাট করতে এসেছিল। লুটপাট করে চলে গেছে।’ তিনি আরো বলেন, ঋণ পুনর্গঠন করার নীতিটি ভুল। ভুল ঋণ অবলোপন (রাইট অফ) নীতি। মুহিত সাহেব ১২-১৩ বছর অর্থমন্ত্রী ছিলেন। তার কথায় মূল্য দিতেই হয়। প্রথমদিকে এমনকি শেষের দিকেও ব্যাংক প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যেসব উদ্যোক্তা নির্বাচন করা হয়েছিল, তা ছিল ভুল। ‘কমার্স’ ব্যাংকের কথা তিনি উল্লেখ করেছেন, যেখানে প্রচুর ঋণখেলাপি তৈরি হয়েছে নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে। বিখ্যাত ব্যবসায়ী ও সাবেক এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি কাজী আকবর সাহেবের মতে, ‘কিছু লোকের কবলে ব্যাংক খাত’। এটা সম্ভব হয়েছে নীতিগত ত্রুটির কারণে। দুষ্টের পালন আর শিষ্টের দমনই হচ্ছে এখানে নীতি। ভালো উদ্যোক্তারা ব্যাংকের কাছে ঘেঁষতে পারে না। অথচ একশ্রেণির লোক ‘একসেস টু পাওয়ার’-এর বলে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে খেলাপি হচ্ছে এবং অনেকে ঐ টাকা মেরে দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। ব্যাংকের বড় বড় ঋণের ক্ষেত্রে একটা নিয়ম আছে। একে ‘লার্জ লোন’ নীতি বলা যায়। একটি, দুটি ঋণগ্রহীতার কাছে যাতে ব্যাংক বন্দি না হয়ে যায়, তার ব্যবস্থা এতে করা হয়েছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, বাস্তবে অনেক ঋণগ্রহীতা প্রচুর ঋণ পেয়ে যাচ্ছে। ব্যাংকের অতিরিক্ত উদারনীতিই এর জন্য দায়ী। ব্যাংকের আরেকটি উদারনীতি হচ্ছে—প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীদের প্রতি অতিরিক্ত আস্থা। তারা যা চায় তা-ই পেয়ে যায়। ফলে তারা ব্যাংকের টাকায় এমন সব শিল্প করে, যার সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই নেই। এভাবে ব্যাংক অনেক শিল্পে অতিরিক্ত ক্যাপাসিটির সৃষ্টি করে বসে আছে। বস্ত্রশিল্প, সিমেন্টশিল্প, ইস্পাতশিল্প, চিনিশিল্প ইত্যাদি এর উদাহরণ। এসব শিল্প এখন ৫০ শতাংশ ক্যাপাসিটিতেও চলতে পারছে না। ফলে তৈরি হচ্ছে খেলাপি এবং খেলাপি তৈরির ঝুঁকি।

আরেকটি বড় নীতিগত সমস্যা হচ্ছে—ওয়ার্কিং ক্যাপিটেল-সম্পর্কিত। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, ব্যাংক শিল্প স্থাপনের জন্য ঋণ দিচ্ছে। কিন্তু ‘ওয়ার্কিং ক্যাপিটেল’ দিচ্ছে না। এটা তো কথা হলো না। ব্যাংক শিল্প স্থাপনের জন্য ঋণ দেবে অথচ তা চালু রাখার জন্য ওয়ার্কিং ক্যাপিটেল দেবে না। এটা কেমন করে হয়? এই সমস্যা একটা বিরাট সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে অনেক ক্ষেত্রে। অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে, সহজলভ্য ঋণ, এর দ্বারা সৃষ্ট অতিরিক্ত ক্যাপাসিটি তৈরি উত্তরাধিকারের অভাব, অবকাঠামোর অভাব, ওয়ার্কিং ক্যাপিটেলের অভাব, ব্যাংকগুলোর কতিপয় কাস্টমারের প্রতি অতিরিক্ত সহানুভূতি, ব্যাবসায়িক মন্দা, রপ্তানি বাজারে মন্দা, মূল্যের উত্থান-পতন ইত্যাদি কারণে প্রতিনিয়ত ঋণখেলাপি তৈরি হচ্ছে। অথচ এসব সমস্যা মোকাবিলা করার মতো ‘খেলাপি ঋণ নীতি’ নেই। যে খেলাপি ঋণ নীতি আছে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে তৈরি। সব দেশের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। অথচ কে না জানে, একেক দেশের ব্যাবসায়িক অবস্থা, অর্থনৈতিক স্তর, অবকাঠামো, নিয়মনীতি একেক রকম। মানুষের-ব্যবসায়ীদের আচরণ চরিত্রও ভিন্ন ভিন্ন ধরনের। অথচ একই ‘ইউনিফর্ম’ সবাইকে পরতে হচ্ছে। একই নিয়ম সবাইকে অনুসরণ করতে হচ্ছে। ‘ঋণখেলাপ’ এবং ‘ঋণখেলাপি’ নির্ণয়ে একই সংজ্ঞা অনুসরণ করতে হচ্ছে। এর জন্য ফর্মুলা আছে। সেই ফর্মুলা আন্তর্জাতিক। কত দিনে ঋণের টাকা পরিশোধ হবে, না দিতে পারলে কত দিনে তা খেলাপি বলে চিহ্নিত হবে, কোন প্রকারের ঋণ কতদিন অপরিশোধিত থাকলে তা খেলাপি ঋণ বলে চিহ্নিত হবে তা ‘অঙ্ক-ফর্মুলাই’ ঠিক করে দেয়। এখানে বাছবিচার করা কোনো সুযোগ নেই। অথচ সবাই জানি, ব্যবসায়-বাণিজ্যে উত্থান-পতন আছে, বাজারের উত্থান-পতন আছে। এর সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীর পরিশোধক্ষমতা। আবার এমন ঘটনা আছে, যা সবকিছু লন্ডভন্ড করে দিতে পারে। যেমন—‘করোনা-১৯’। এই অতিমারি ব্যাংকের সব নিয়মনীতি তছনছ করে দিয়েছে। ভবিষ্যতেই বোঝা যাবে এর ফলাফল। কয়েক বছর আগে নির্বাচনের পূর্বে ‘চাক্কাবন্ধ’ চলে অনেকদিন। পরিবহন, পর্যটন, খুচরা ব্যবসা, আমদানি-রপ্তানি এতে বিঘ্নিত হয় ভীষণভাবে। অথচ এ ধরনের জরুরি অবস্থা, মন্দার সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান করে তৈরি হয়নি নিয়মনীতি। যার জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে (ইচ্ছাকৃত খেলাপ বাদে) ঋণ পুনঃ তপশিল করতে হয়েছে। এতে সমস্যার সমাধান না হওয়ায় ঋণ পুনর্গঠন করতে হয়েছে। ছাড় দিতে হয়েছে সবকিছুতে। সামঞ্জস্য রাখার মতো নিয়মনীতি না থাকার কারণে এখন ঘনঘন বদল করতে হচ্ছে নিয়মনীতি। একসময় ব্যাংক গ্রাহক সম্পর্কের ওপরই নির্ভর করত ব্যবসায়ীর লেনদেন ও ব্যবসা। আজ তা নেই। মাত্রাতিরিক্ত ‘ফর্মুলাধীন’ নিয়মনীতি এবং সেই সূত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের খবরদারি পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। এর শেষ কোথায় আগামী দিনেই জানা যাবে। ফর্মুলামাফিক ঋণখেলাপ নির্ণয় হলে আগামী দিনে খেলাপি ঋণ বাড়াবে বই কমবে না।

লেখক: অর্থনীতিবিদ ও সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ইত্তেফাক/কেকে

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x