‘চ্যাম্পিয়ন’ দক্ষিণ এশিয়ার অবস্থা সবচেয়ে খারাপ

করোনাকালের অর্থনীতি: অবস্থার উন্নতি ঘটাতে বাংলাদেশসহ অনেক দেশকে পাড়ি দিতে হবে দীর্ঘপথ
‘চ্যাম্পিয়ন’ দক্ষিণ এশিয়ার অবস্থা সবচেয়ে খারাপ
ছবি: সংগৃহীত

করোনা মহামারি শুরু হওয়ার আগে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে চ্যাম্পিয়ন হিসেবে উল্লেখ করেছিল। কিন্তু মহামারির মাঝপথে এসে তারাই আবার বলছে, চলতি বছর এই অঞ্চল অর্থনীতিতে সবচেয়ে খারাপ করবে। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো দারিদ্র্য বিমোচন এবং অন্যান্য খাতে উন্নয়নের দিকে ভালোভাবেই এগিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু করোনা মহামারির কারনে ঠিক উলটোটাই ঘটছে। সদ্য প্রকাশিত জাতিসংঘের ‘বিশ্ব অর্থনৈতিক অবস্থার ভবিষ্যত্’ রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘অর্থনীতি যে অবস্থায় পতিত হয়েছে তা থেকে উত্তরণে দেশগুলোকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে।

শুধু দক্ষিণ এশিয়া নয়, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকাসহ সব অঞ্চলের দেশগুলোর অর্থনীতি ধুকছে করোনা মহামারির কারণে। ব্রিটেনের অর্থনীতি গত ৩০০ বছরে এমন খারাপ পরিস্থিতিতে পড়েনি বলে বলা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে কয়েক দফা উদ্ধার পরিকল্পনা ঘোষণা করার পরও শঙ্কা রয়ে গেছে। যেসব দেশে বাংলাদেশের উত্পাদিত পণ্য বিক্রি হয় সেসব দেশের স্টোরগুলো বন্ধ থাকায় খুচরা বিক্রিতে ধস নেমেছে। দেশগুলোতে পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা একেবারেই ভেঙে পড়েছে। তবে এত কিছুর মধ্যেও বিশ্ব অর্থনীতিতে উদীয়মান শক্তি চীন ভালো করছে।

বিশ্বায়নের যুগে বাংলাদেশ বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে একেবারেই সম্পর্কযুক্ত। বিশেষ করে রপ্তানি বাণিজ্য, মানবসম্পদ রপ্তানি এবং অন্যান্য ইস্যুতে বাংলাদেশকে বহির্বিশ্বের ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু এ সময়ের মধ্যে এসে বাংলাদেশের এসব খাতে নাজুক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। করোনা পরিস্থিতির কারণে এ খাতের অবস্থা একবারেই নাজুক। মহামারি শুরুর আগে ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত মোট ১ লাখ ৮১ হাজার ২১৮ জন বাংলাদেশি কর্মী বিদেশে গিয়েছিল। কিন্তু সারা বিশ্বে লকডাউনের কারণে ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে কোনো অভিবাসন হয়নি। আর পহেলা অক্টোবর থেকে ১৯ নভেম্বর পর্যন্ত মাত্র ২ হাজার ৪৬৪ জন কর্মী বিদেশে গিয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে- করোনার কারণে অভিবাসনের হার চলতি বছরে ৭০ শতাংশ কমে যাবে। বিদেশে কর্মী পাঠানোর হার কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের প্রেরিত আয়ের (রেমিট্যান্স) পরিমাণও কমেছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স কমে হয়েছে ১ হাজার ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার। এ আয় আগের বছরের তুলনায় ২৫ শতাংশ কম।

করোনার কারণে বাংলাদেশের রাজস্ব আদায়ে বড় আকারের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) জানিয়েছে, ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি হয়েছে ৩১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। অর্থবছর শেষ নাগাদ এই ঘাটতি ৮০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, করোনার কারণে অর্থনীতি প্রায় বসে গিয়েছিল। সেখান থেকে মাঝপথে এসে অর্থনীতিতে কিছটা গতি ফিরেছিল। কিন্তু ব্যক্তি পর্যায়ের আয় কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে রাজস্ব আদায়েও তার প্রভাব পড়েছে।

এদিকে, করোনার ধাক্কা কাটিয়ে মাঝ পথে রপ্তানি আয়ে কিছুটা গতির সঞ্চার হয়। কিন্তু এরপর এ খাতে আবারও নেতিবাচক ধারা তৈরি হয়। সর্বশেষ জানুয়ারি মাসেও রপ্তানি ৫ শতাংশের মতো কমেছে। এছাড়া লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কমেছে প্রায় ১০ শতাংশ। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী গত জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে ১ হাজার ৫৩৪ কোটি টাকা। রপ্তানিকারকরা বলছেন, খুব শিগিগর পরিস্থিতি উন্নতির কোনো সম্ভাবনা নেই।

জাতিসংঘের রিপোর্টে বলা হয়েছে, করোনা শুরুর আগে বাংলাদেশের মতো উঠতি অর্থনীতির দেশগুলো দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ভালোভাবেই এগিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু করোনা শুরুর পর এ উন্নতিতে ভাটা পড়েছে। বিশেষ করে শিক্ষা, দারিদ্র্য কমানো, জ্বালানি, আয় বৈষম্য দূর করা, লিংগ বৈষম্য কমিয়ে আনা, মৌলিক পয়:নিষ্কাশন প্রভৃতি খাতে দেশগুলোর উন্নতি ছিলো চোখে পড়ার মতো। কিন্তু এখন অনেক দেশকে এ খাতে নতুন করে শুরু করতে হবে।

দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতি বিশেষ করে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে কথা বলেছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং গবেষণা সংস্থা উন্নয়ন অন্বেষণের চেয়ারপারসন রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেন, বিশ্বের অনেক সংস্থা ভারতকে দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার অবস্থা বিচার করে। এটি ঠিক নয়, কারন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ভারতের চেয়ে একেবারেই ভিন্ন। এখানকার জনগণের মধ্যে অদ্ভুত অভিযোজন ক্ষমতা আছে। যে কোনো পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৪ থেকে ৫ শতাংশের মতো হতে পারে। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। তবে তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, অভ্যন্তরীণ শ্রমবাজার এবং অভিবাসীদের শ্রমবাজার ঠিক থাকলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। কারণ, এদের আয়ের অর্থ দিয়ে ভোগ ব্যবস্থা টিকে আছে। তিতুমীর বলেন, বাংলাদেশের অনানুষ্ঠানিক খাতগুলো সবসময় ভালো করে। এ খাতগুলোতে আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া গেলে ঝুঁকি কমবে। তিনি বলেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সামনে তিনটি চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এগুলো হলো- করোনার কারনে যেসব নতুন দারিদ্র্য বেড়েছে সেগুলোকে আমলে নিয়ে কাজ করা। সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়িয়ে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করা এবং সরকারি ব্যয়ের যথোপযুক্ত ব্যবহার নিশ্চিত করা।

দক্ষিণ এশিয়া পরিস্থিতি :করোনা মহামারির কারণে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো বড় ধরনের সংকটে পতিত হয়েছে বলে জাতিসংঘ তাদের রিপোর্টে উল্লেখ করেছে। ২০২০ সালে এ অঞ্চলের দেশগুলো অর্থনীতিতে সবচেয়ে বাজে পারফরম্যান্স করেছে। ২০২০ সালে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ৬ শতাংশ কমে গেছে। অথচ এ সময়ে দেশগুলোতে ৫ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছিল। জাতিসংঘের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অর্থনীতির একটি বড় অংশ নির্ভর করে শ্রমবাজারের ওপর। কিন্তু করোনার কারনে এ খাতটি একেবারেই এলোমেলো হয়ে পড়েছে। অতিরিক্ত মূল্যস্ফীতি দেশগুলোর অর্থনীতিকে ভোগাচ্ছে বেশি। দেশগুলোর অর্থনীতিতে যে সংকট তৈরি হয়েছে তা থেকে সহজে উত্তরণ হবে বলে জাতিসংঘ মনে করছে না। এর কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো রপ্তানি এবং শ্রমবাজারের ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল। করোনার কারণে মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমিকদের কাজ যেমন কমে যাবে, সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রে দেশগুলোর রপ্তানিও উল্লেখযোগ্য হারে কমবে।

ইত্তেফাক/টিআর

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x