করোনায় বেসরকারি খাতের করুণ দশা

করোনায় বেসরকারি খাতের করুণ দশা
ফাইল ছবি

করোনা মহামারির কারণে বিশ্বব্যাপী যে মহামন্দা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তাতে বেসরকারি খাতে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বিশ্বের এমন কোনো কোম্পানি নেই যাতে এই মহামারির আঁচড় পড়েনি। যেসব কোম্পানি পণ্য উৎপাদন করে তাদের বিক্রি ২৭ শতাংশ কমে গেছে। এছাড়া এক চতুর্থাংশ কোম্পানির পণ্য বিক্রি অর্ধেকে নেমে এসেছে।

মহামারির মধ্যে বিশ্বব্যাংক সারা বিশ্বের কোম্পানিগুলোর ওপর জরিপ চালিয়ে এ তথ্য পেয়েছে। মোট ৬০টি দেশের ১ লাখ ২০ হাজার কোম্পানির ওপর এ জরিপ চালানো হয়েছে। ব্যবসায় মন্দার ধাক্কা লাগার সঙ্গে সঙ্গে তার প্রভাব পড়েছে এ খাতের কর্মীদের ওপর। বিশ্বব্যাংক বলছে, এ সময়ে কর্মীদের আয়ও কমেছে। ৬৫ শতাংশ কোম্পানি কর্মীদের শ্রমঘণ্টা কমিয়ে দিয়েছে। ১১ শতাংশ কোম্পানি তাদের কর্মীদের বিনা বেতনে ছুটি দিয়েছে। বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা এমনতর পরিস্থিতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের দিকে নজর দিতে সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন।

বিশ্বব্যাংক জরিপ চালিয়ে দেখেছে যে, করোনা ভাইরাস মহামারির কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ছোট ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো বেশ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মূল্যস্ফীতি, ঋণের দুষ্প্রাপ্যতা এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের ব্যাপক তারতম্যের কারণে সংকট আরও বেশি ঘনীভূত হয়েছে। মাত্র কয়েকটি কোম্পানি জানিয়েছে, বছর ধরে চলমান কোভিড পরিস্থিতিতে তাদের বিক্রি ঠিকঠাক ছিল। ২৫ শতাংশ কোম্পানি জানিয়েছে, এক বছরের ব্যবধানে তাদের বিক্রি ৭২ শতাংশ কমেছে। যেমন পর্যটন খাতের ছোট ছোট কোম্পানিগুলো একেবারে পথে বসেছে। বিশ্বব্যাপী বিমান চলাচল বন্ধ থাকার কারণে দেশগুলোর মধ্যে আন্তঃপর্যটন ব্যবসায় একেবারে ধস নেমেছে।

তবে কোভিডকালীন অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান তাদের পরিকল্পনা বদল করে সফলও হয়েছে। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো অনলাইন বিক্রি বাড়ানোর মাধ্যমে তাদের রাজস্ব বাড়িয়েছে। এক্ষেত্রে খাদ্যপণ্যের বিষয়টি উল্লেখযোগ্য। অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদিত পণ্যে বৈচিত্র্য আনার মাধ্যমে টিকে থাকার চেষ্টা করেছে। করোনা ভাইরাস থেকে সুরক্ষাসামগ্রী তৈরি এবং রপ্তানির হার বেড়েছে। এছাড়া করোনাকালীন বাসায় বসে কাজ করার হার বেড়ে যাওয়ার কারণে অনেক কোম্পানি এ খাতের পণ্য উত্পাদনের দিকে নজর দিয়েছে। তবে রপ্তানি বাণিজ্যের সঙ্গে যেসব কোম্পানি জড়িত তাদের অসুবিধা হয়েছে সবচেয়ে বেশি।

এদিকে, করোনাকালনী ব্যবসার ক্ষেত্রে যেমন প্রভাব পড়েছে সঙ্গে সঙ্গে কোম্পানিতে যারা কাজ করেন তাদের অসুবিধাও হয়েছে বেশি। গত বছরের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত ১৫ শতাংশ কোম্পানি কর্মীদের বিদায় করেছে। কিন্তু ২০২০ সালের অক্টোবর থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত কর্মী ছাঁটাই প্রবণতা কমে এসেছে। এ সময়ে কর্মী ছাঁটাইয়ের হার ১১ শতাংশে নেমে এসেছে।

ঋণ স্বল্পতার কারণে ছোট কোম্পানিগুলোর অসুবিধা হয়েছে বেশি। এ সময়ে ঋণ না পয়ে অনেক ছোট প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। এ খাতের ২০ শতাংশের মতো প্রতিষ্ঠান নতুন যন্ত্রপাতি যোগ করে ডিজিটাল প্ল্যাটফরমের মাধ্যমে ব্যবসা টিকিয়ে রেখেছে।

বিশ্বব্যাংকের এ রিপোর্টেও সঙ্গে একমত হয়েছেন শীর্ষ বণিক সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি এবং ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্সের (আইসিসি) ভাইস প্রেসিডেন্ট এ কে আজাদ। তিনি বলেন, সরকার যে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে তাতে হয়তো বড় মাপের ব্যবসাগুলো টিকে যাবে। কিন্তু ক্ষুদ্র, মাঝারি খাতের শিল্পগুলো বাঁচিয়ে রাখতে সরকারকে মনোযোগ দিতে হবে। তিনি বলেন, যেসব ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক ঋণ পাওয়ার যোগ্যতা নেই সেগুলোকে বিশেষ সহায়তা দিলে কর্মসংস্থান বাড়বে। কারণ গত কয়েক বছরে সে অর্থে তেমন কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি। এ কে আজাদ বলেন, নিয়মিত ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে ঋণ দেওয়া না গেলে বিশেষায়িত ব্যাংকগুলো থেকে বিশেষ ভাবে ঋণ দেওয়া যেতে পারে। এতে করে করোনাকালীন সময়ে যারা চাকরি হারিয়েছে তারা আবারো চাকরি ফেরত পেতে পারে।

বিশ্বব্যাংক জরিপের ফলাফল প্রকাশ করার সঙ্গে সঙ্গে মন্দা পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের কিছু পথও বাতলে দিয়েছে। যেহেতু উন্নয়নশীল দেশগুলো করোনা অভিঘাত মোকাবিলায় যথেষ্ট পারংগম নয়, সেক্ষেত্রে এ দেশগুলোর ওপর নজর দিতে হবে বেশি। বিশেষ করে কোম্পানিগুলো এবং কর্মীদের বাঁচিয়ে রাখতে ব্যাপক প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে হবে। বিশ্বব্যাংকের জরিপে দেখা গেছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ছোট দেশগুলো প্রণোদনার অর্থ কম পেয়েছে। এসব দেশের মাত্র ১০ শতাংশ কোম্পানি প্রণোদনার অর্থ পেলেও উন্নত দেশগুলোর অর্ধেকেরও বেশি কোম্পানি এ অর্থ পেয়েছে। তবে ছোট ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর সরকারের উচিত হবে অর্থনীতিকে ঠিক রাখতে সব ধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে সাপোর্ট করা। এক্ষেত্রে কোম্পানির কর্মীদের বিষয়টিও নজরে আনতে হবে।

ইত্তেফাক/ইউবি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x