স্থানীয় ব্যবসা এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি

করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত পুরো অর্থনীতি, সুবিধা কেবল রপ্তানি খাতের জন্য

করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত পুরো অর্থনীতি, সুবিধা কেবল রপ্তানি খাতের জন্য
প্রতিকী ছবি।

করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় রপ্তানি খাতের শিল্পের বেতনভাতা পরিশোধের জন্য সরকারের দেওয়া প্রণোদনার আওতায় ঋণ পরিশোধের লক্ষ্যে গ্রেস পিরিয়ড আরো ছয় মাস বাড়াতে যাচ্ছে সরকার।

আগামী মার্চ থেকে পরবর্তী ছয় মাস রপ্তানি খাতের জন্য দেওয়া সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হবে না। এর আগে ঋণ দেওয়ার পর শুরুতে ছয় মাস সময় দেওয়া হয়েছিল। এ নিয়ে ঋণের কিস্তি পরিশোধে এক বছরের গ্রেস পিরিয়ড বা মোরাটরিয়াম পাচ্ছে রপ্তানি খাত। পরবর্তী ১৮ মাসের মধ্যে পুরো অর্থ পরিশোধ করতে হবে।

সেই হিসেবে সরকারের দেওয়া দুই বছরের মধ্যে ঋণ পরিশোধের সময়সীমাও আরো ছয় মাস বাড়ল। করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের এ সিদ্ধান্তকে ব্যবসায়ীরা স্বাগত জানালেও রপ্তানির বাইরে অন্যান্য খাত এ সুবিধার বাইরে থাকায় হতাশাও প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, রপ্তানি খাত বরং সম্প্রতি কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু স্থানীয় শিল্পোদ্যোগ ও ব্যবসা সেভাবে এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। এ সুবিধা বরং তাদেরই বেশি প্রয়োজন।

অন্যদিকে অর্থনীতিবিদদের অনেকেই সরকারের এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে তারাও বাস্তবতা বিবেচনায় রপ্তানির বাইরে স্থানীয় শিল্পোদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী বিশেষত ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের জন্য প্রণোদনার আওতায় এ সুবিধা দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। কেবল অর্থনীতিবিদ নন, খোদ রপ্তানিকারকদের প্রতিনিধিরাও অন্যান্য খাতের জন্য এ সুবিধা দেওয়া যৌক্তিক বলে মত দিয়েছেন।

করোনা ভাইরাসের প্রকোপ শুরু হওয়ার পর সরকার গত বছরের এপ্রিলে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে। শুরুতে দুই শতাংশ চার্জে তৈরি পোশাক খাতের কারখানার শ্রমিকদের বেতনভাতা পরিশোধের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনার ঘোষণা দেওয়া হয়। এরপর এই ঋণ আরো বাড়িয়ে সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়। তবে এর মধ্যেই অন্যান্য খাতের জন্য বড় অঙ্কের প্রণোদনাও ঘোষণা করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবমিলিয়ে ১ লাখ ২১ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেন। এর মধ্যে বড় প্যাকেজ হলো ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও সেবা খাতের জন্য। প্রথমে এ খাতের ঋণের আকার ৩০ হাজার কোটি টাকা হলেও পরে বাড়িয়ে ৪০ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। এর বাইরে দেশি ও বিদেশি কোম্পানিগুলোর জন্য ৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়। এছাড়া গত মাসে করোনা মহামারির প্রভাব মোকাবিলায় দেশের কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে সরকার নতুন করে ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। সর্বশেষ বরাদ্দ দেওয়া দেড় হাজার কোটি টাকাসহ এসএমই খাতের জন্য বরাদ্দ ২১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে এসএমই খাতে বিতরণ হয়েছে এক চতুর্থাংশের মতো। সবমিলিয়ে বরাদ্দকৃত প্রণোদনার ঋণ বিতরণ হয়েছে ৫৫ শতাংশের কিছু বেশি।

রপ্তানি খাতের উদ্যোক্তারা দীর্ঘদিন থেকেই ঋণ পরিশোধের সময় বাড়ানো ও ঋণের কিস্তি পরিশোধে আরো এক বছর পিছিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছিলেন। ইস্যুটি নিয়ে দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএ অর্থ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভাগে একাধিকবার চিঠিও পাঠায়। সর্বশেষ বিজিএমইএর সাবেক দুই সভাপতির নেতৃত্বে তিন উদ্যোক্তা গত সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাত্ করে এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সবুজ সংকেত পান।

এরপর গতকাল ছয় মাস কিস্তি পরিশোধ পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল অর্থমন্ত্রণালয়। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানানো হয়। এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সিনিয়র সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তবে তিনি বলেন, যেহেতু করোনায় অন্যরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সংকট এখনো শেষ হয়নি, সেজন্য এ সুবিধা অন্যদেরও দেওয়ার উচিত।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি রিজওয়ান রাহমান ইত্তেফাককে বলেন, রপ্তানি খাত সুবিধা পাক। কিন্তু দেশের অর্থনীতির ৮৫ শতাংশই হোম গ্রোন। ফলে অবশ্যই এ সুবিধা তাদের পাওয়া উচিত। তিনি বলেন, প্রতি ১০ জনে সাত জনের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাত (সিএমএসএমই)। এই করোনার সময়ে তারা বেশি সংকটে। তাদেরই এ ধরনের সুবিধা দরকার আগে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, রপ্তানিকারকদের পরিচালন মূলধনের জন্য সরকারের দেওয়া ঋণ পরিশোধের সময় বাড়ানো সংক্রান্ত এ সুবিধা যৌক্তিক। তবে অন্যান্য খাতের জন্য ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল হিসেবে দেওয়া ঋণ এ ধরনের সুবিধার বাইরে থাকলে, তাদেরও এ সুবিধা দেওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।

এদিকে প্রণোদনা ঘোষণা হলেও ঐ ঋণ পাওয়া নিয়ে বিস্তর আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ব্যাংক গ্রাহক সম্পর্কে ভিত্তিতে প্রণোদনার অর্থ দেওয়ার শর্ত দেওয়ায় ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কিংবা মাঝারি খাতের উদ্যোক্তাদের বেশির ভাগই এ সুবিধা পাননি। এসএমই উদ্যোক্তা ও এসএমই ফাউন্ডেশনের পরিচালক রাশেদুল করিম মুন্না ইত্তেফাককে বলেন, সরকার প্রণোদনার সুবিধা দিলেও ব্যাংকগুলোর বিভিন্ন শর্তের কারণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের বেশির ভাগ উদ্যোক্তা এ সুবিধা নিতে পারেনি। অথচ তাদের দরকার ছিল বেশি।

ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, যারা বাস্তবায়ন করছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত তাদের ওপর চাপ তৈরি করা, তারা টাকা দিচ্ছে কি না। যারা পাচ্ছে, তাদের মধ্যে কত শতাংশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের উদ্যোক্তা—তাও দেখা দরকার। এক্ষেত্রে ব্যাংকের বাইরে এনজিওগুলোকেও সম্পৃক্ত করা এবং এসএমই খাত থেকে মাঝারি শিল্পকে আলাদা করার পক্ষেও মত দেন তিনি।

ইত্তেফাক/এএইচপি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x