জিডিপি বাতিলের সময় কি এসে গেছে

জিডিপি বাতিলের সময় কি এসে গেছে
প্রতীকী ছবি

মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই একটা দেশের অর্থনীতির স্বাস্থ্য উপলব্ধির জন্য পরিমাপক হিসেবে গ্রস ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট (মোট দেশজ উত্পাদন) বা জিডিপি ব্যবহূত হয়ে আসছে। কিন্তু বিশ্বের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নামিদামি অর্থনীতিবিদদের বেশ বড় একটা সংখ্যা অর্থনীতির প্রকৃত হালহকিকত বোঝার জন্য শুধু জিডিপির ওপর ভরসা রাখতে পারছেন না এবং হামেশাই অন্যান্য সূচকের আশ্রয় নিচ্ছেন, যেগুলো কার্যতই পরিবেশগত এবং সামাজিক প্রেক্ষাপটসমূহকেও হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করছে। বছর দশেক আগে মেক্সিকো উপসাগরের গভীর জলে খননরঙ্গস্বরূপ গগনবিদারী শব্দ মানুষ ও প্রকৃতির জন্য ডেকে এনেছিল বিপর্যয়কর পরিস্থিতি। পরিষ্কার বাবদ ব্যয় এবং প্রকৃতি রক্ষার পেছনে কয়েক বিলিয়ন ডলারের প্রচেষ্টা কিন্তু তাদের অর্থনীততে প্রতিফলিত হয়নি। পক্ষান্তরে, জিডিপি অনুসারে সেগুলো তাদের অর্থনৈতিক উত্পাদনের পরিমাণ বৃদ্ধিতে যুক্ত হয়েছিল। জিডিপি হিসাব করার পদ্ধতিই কিন্তু এর কারণ।

বর্তমানে একটা দেশের অর্থনীতিক নৈপুণ্যের পাশাপাশি কল্যাণ বিবেচনার জন্য সবচে গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হচ্ছে এই জিডিপি। জিডিপি স্বদেশে উৎপাদিত পণ্য ও পরিষেবার মূল্য নিরূপণ করে এবং সেই মূল্যই দেশটির সঙ্গে যুক্ত হয়। কিন্তু সমস্যাটা হচ্ছে, বর্ধিষ্ণু জিডিপি কোনো একটা অর্থনৈতিক কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট সম্ভাব্য নেতিবাচক পরিস্থিতিকে ধারণ করে না। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পাারে, দুর্ঘটনা, দুর্যোগ কিংবা সামাজিক অসমতার কথা। তার মানে দাঁড়াচ্ছে, স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, বর্ধিষ্ণু জিডিপির অর্থনীতিসমূহ ইতিবাচকভাবেই বিকশিত হচ্ছে। কিন্তু বিশেষত পরিবেশ ও সমাজের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবগুলোকে বরাবরই পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়।

অর্থনীতিবিদরা অনেকটা বাধ্য হয়েই দীর্ঘদিন ধরেই জিডিপির বিকল্প অনুসন্ধান করছেন, যেটি কিনা অধিক সর্বাত্মকভাবে অর্থনৈতিক নৈপুণ্য ও পরিস্থিতি এবং সমাজের প্রতিফলন ঘটায়। এমন সুপরিচিত অনেকগুলো নির্দেশকের একটি হচ্ছে জিপিআই (জেনুইন প্রোগ্রেস ইনডিকেটর), যেটি বিকশিত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে এবং সেদেশের অর্থনীতি ও নোবেল পুরস্কার জয়ী অর্থনীতিবিদ জেমস টবিনের ধারণা থেকে। এই সংক্ষেপণকে ভেঙে মোটামুটি যে বাংলাটা দাঁড় করানো যায়, সেটি হচ্ছে বিশুদ্ধ প্রগতি সূচক। আসল উন্নতির সূচক হিসেবে এই জিপিআই সম্পূরক হিসেবে জিডিপিকে সাহায্য করে সমাজের ইতিবাচক ও নেতিবাচক উপাদানগুলো দিয়ে এবং এরই সঙ্গে হিসাবের মধ্যে নিয়ে আসে একটা দেশের সম্পদ কতোটা অসমভাবে বিন্যাসিত। এর ফলাফল দাঁড়াচ্ছে এরকম— সাম্প্রতিক কয়েক দশক জুড়েই দেখা যাচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্রে জিডিপির চেয়ে জিপিআইতে অনেক কম প্রবৃদ্ধি উঠে আসছে। এমনকি কোনো কোনো বছরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে দেখা যাচ্ছে একেবারে স্থবির। প্রকৃত অবস্থা উপলব্ধি করেন মেরিল্যান্ডসহ যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি রাজ্য বেশ কয়েক বছর ধরে জিপিআই হিসেব করছে এবং উদাহরণস্বরূপ এর ফলাফল ব্যবহার করছে গণপরিবহন, জীবাশ্ম জ্বালানি ও কর বৃদ্ধির প্রশ্নে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নও ভ্রান্ত জিডিপি ইস্যুকে বেশ ভালোভাবে আমলে নিয়েছে। যে কারণে তারা জিডিপির বাইরে প্রকল্প চালু করে ১১ বছর আগেই। সে জন্যই বিশেষজ্ঞরা সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কল্যাণ নির্ধারণে অর্থনৈতিক নৈপুণ্যের বাইরে নজর দেয় এবং জাতিসংঘের ১৭টি টেকসই উন্নয়নমূলক লক্ষ্যসমূহের (এসডিজি) ওপর বিশেষভাবে দৃষ্টিপাত করে। যেগুলোর মধ্যে আছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ ইত্যাদি এবং সবগুলোকেই নিয়ে হিসাবের মধ্যে। সংগত কারণেই মনে প্রশ্ন জাগে, এসব মূল্যায়নের ফলাফল কী ছিল? উত্তরটা জেনে বিস্মিত না হওয়াটাই অস্বাভাবিক। জিডিপির বাইরের বিষয়গুলোকে বিবেচনায় আনার ব্যাপারে নেতৃত্বদানকারী ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত উত্তরাঞ্চলীয় দেশগুলোও সবার জন্য টেকসই কল্যাণ অর্জন থেকে অনেক দূরে ছিল। বিভিন্ন জরিপের ফলাফল বলছে, ইইউ সদস্যদের অধিকাংশই টেকসই অর্থনৈতিক কার্যক্রম ও জলবায়ু সুরক্ষার প্রশ্নে বড় রকমের ঘাটতিতে ভুগছে, প্রধানত কার্বন ডাইঅক্সাইড নির্গমন প্রশ্নে, যা কিনা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক উচ্চ।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের কয়েকটি দেশ আবার সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র উদ্যোগও গ্রহণ করেছে। এ ব্যাপারে প্রথমেই উল্লেখ করতে হয় জার্মানির নাম। তাদের ফেডারেল এনভায়রনমেন্ট এজেন্সি জিডিপিকে প্রসারিত করে জাতীয় কল্যাণ সূচকের (এনডব্লিউআই) মধ্যে নিয়ে গেছে এবং এর মধ্যে যুক্ত হয়েছে আরো প্রায় ২০টি নিয়ামক, যেগুলো যথেষ্ট ভূমিকা রাখে মানুষের কল্যাণের হ্রাস ও বৃদ্ধির পেছনে। বায়ু ও পানিদূষণের সংযুক্তি হয় বিলম্বিত এবং কাজে যাওয়া-আসার ভ্রমণের সময়টাকে হিসাবে না আনাটাও এনডব্লিউর একটা বড় ত্রুটি। অন্যদিকে গৃহকর্ম ও স্বেচ্ছাসেবী কাজও বিবেচিত হয়েছে কল্যাণ বৃদ্ধিতে। ১৯৯০-এর দশকে শুরুর পর থেকে এ যাবত জার্মানিতে এনডব্লিউআই বৃদ্ধি পেয়েছে মাত্র ৮ শতাংশ, যেটি জিডিপি প্রবৃদ্ধির তুলনায় খুবই কম।

কিছু সূচক আবার আরো এক কাঠি সরেস। ঐ সিডির ‘উন্নততর জীবন সূচক’ বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিস্তৃত সূচককে অন্তর্ভুক্ত করে, যাতে আছে আয়, চাকরি, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও কর্মজীবনের ভারসাম্য। এর রয়েছে আবার এক মজাদার বৈশিষ্ট্য। প্রত্যেক নাগরিকই বিশেষভাবে ডিজাইন করা ওয়েবসাইট ব্যবহার করতে পারে। এতে তারা একান্ত নিজস্ব বোধের ভিত্তিতে দেশের কল্যাণের মূল্যায়ন করতে পারে এবং চিহ্নিত করতে পারে তাদের জন্য সুনির্দিষ্টভাবে কোন বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ।

সত্যিই অবাক করে দেওয়ার মতো বিষয় হচ্ছে, সবার আগে জিডিপি বৃদ্ধির মোহ কাটায় দক্ষিণ এশিয়ার অত্যন্ত ক্ষুদ্র ও রাষ্ট্র ভুটান। অর্থনৈতিক অবস্থা যাচাইয়ে জিডিপিকে ভ্রান্ত বলার ব্যাপারে তাদের জনকই বলা চলে। বর্তমান রাজা জিগমে সিঙ্গে ওয়াংচুক সেই ১৯৭০-এর দশকেই তত্ত্ব দিয়েছিলেন, জিডিপি আসলে কিছুই নয়। ভালোমন্দ বুঝতে হবে ‘গ্রোস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস’ দিয়ে। অবশ্য এর ফলও তারা পাচ্ছে। ভুটানের শতকরা প্রায় ৪০ জনই এখন সুখী এবং এই বৃদ্ধির ধারাটা অব্যাহত রয়েছে।

— এলজিটি অনলাইন ম্যাগাজিন অনুসরণে

ইত্তেফাক/কেকে

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x