সানেমের জরিপ

করোনার দ্বিতীয় ধাক্কায় ব্যবসায়ীদের আস্থা আরো কমেছে

৬৯ শতাংশ ব্যবসায়ী জানিয়েছেন তারা প্রণোদনা প্যাকেজ পাননি ব্যবসার খরচসংক্রান্ত সূচকের সবচেয়ে অবনতি হয়েছে
করোনার দ্বিতীয় ধাক্কায় ব্যবসায়ীদের আস্থা আরো কমেছে
ছবি: সংগৃহীত

করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের প্রভাবে দেশে ব্যবসায়ীদের আস্থা আগের চেয়ে কমেছে। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরুর পরে মাত্র ২ শতাংশ ব্যবসায়ী মনে করেন অর্থনীতি শক্তিশালী পুনরুদ্ধারের দিকে যাচ্ছে। মাঝারি মানের পুনরুদ্ধারের দিকে যাচ্ছে বলে মনে করেন ৩১ শতাংশ এবং দুর্বল মানের পুনরুদ্ধারের দিকে যাচ্ছে বলে মনে করেন ৬৭ শতাংশ ব্যবসায়ী। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) ও দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশনের এক জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে

করোনা মহামারির সময়ে ব্যবসায় আস্থাসংক্রান্ত জরিপের চতুর্থ পর্যায়ের ফলাফল নিয়ে গতকাল রবিবার ওয়েবিনারের আয়োজন করা হয়। ওয়েবিনারে জরিপের ফলাফল উপস্থাপন করেন সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান। আলোচক হিসেবে ওয়েবিনারে উপস্থিত ছিলেন অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন এবং ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি রিজওয়ান রাহমান।

জরিপের ফল উপস্থাপনে ড. সেলিম রায়হান জানান, ২০২১ সালের এপ্রিলের ৬ থেকে ১৮ তারিখের মধ্যে ৩৬টি জেলার মোট ৫০৩টি ক্ষুদ্র, ছোট, মাঝারি ও বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের ওপর এই জরিপ করা হয়েছে। এই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ পদাধিকারীদের সঙ্গে ফোনালাপের মাধ্যমে এই জরিপ পরিচালনা করা হয়। জরিপে অংশ নেওয়া ২২ শতাংশ ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, তারা প্রণোদনা প্যাকেজের সুবিধা পেয়েছেন। ৬৯ শতাংশ ব্যবসায়ী জানিয়েছেন তারা প্রণোদনা প্যাকেজ পাননি এবং ৯ শতাংশ ব্যবসায়ী জানিয়েছেন তারা প্যাকেজ সম্পর্কে জানেন না। জরিপকৃত বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রণোদনা প্যাকেজ পেয়েছে ৪৬ শতাংশ, মাঝারি ৩০ শতাংশ এবং ৯ শতাংশ ক্ষুদ্র ও ছোট প্রতিষ্ঠান প্রণোদনা পেয়েছে।

এর আগের তিনটি জরিপের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, এই সময়কালে ব্যবসার খরচসংক্রান্ত সূচকের সবচেয়ে অবনতি হয়েছে। ২০২১ সালের জানুয়ারি-মার্চ সময়কালে আর্থিক, ফার্মাসিউটিক্যাল, টেক্সাইল ও খুচরা ব্যবসা তুলনামূলকভাবে অন্য খাতের চেয়ে ভালো করেছে, পিছিয়ে আছে পরিবহন, রেস্টুরেন্ট, চামড়া শিল্প, হালকা প্রকৌশল শিল্প ও রিয়েল এস্টেট খাত।

২০২১ সালের এপ্রিলে পরিচালিত চতুর্থ পর্যায়ের জরিপে দেখা যাচ্ছে, ব্যবসায়ীদের ব্যবসার আস্থা অনেকখানি কমে গিয়েছে। ২০২০ সালের জুলাই মাসে পরিচালিত জরিপে বিজনেস কনফিডেন্স ইনডেক্স বা ব্যবসার আস্থা সূচকের মান ছিলো ৫১ দশমিক ০৬, ২০২০ সালের অক্টোবরে পরিচালিত জরিপে এই সূচক ছিল ৫৫ দশমিক ২৪, ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে এই সূচক ছিল ৫৭ দশমিক ৯০ এবং ২০২১ সালের এপ্রিল মাসে পরিচালিত চতুর্থ পর্যায়ের জরিপে এই সূচক ছিল ৪১ দশমিক ৩৯। এ সময়ে হালকা প্রকৌশল, পরিবহন এবং রেস্টুরেন্ট খাতের ব্যবসায় আস্থা সবচেয়ে কম পাওয়া গেছে।

ড. সেলিম রায়হান বলেন, আমরা যখন পুনরুদ্ধারের কথা বলি তখন শুধু অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের কথাই বলি, কিন্তু সামাজিক পুনরুদ্ধারের গতি অনেক শ্লথ হয়ে গেছে। কর্মসংস্থান কীভাবে হবে, সামাজিক অন্য খাতের পুনরুদ্ধার কীভাবে হবে সেগুলো বাজেটে কিছুই উল্লেখ থাকে না। তিনি চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল, পাইকারি ব্যবসা, পরিবহন, তৈরি পোশাক, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং রিয়েল এস্টেট খাতে অগ্রাধিকার প্রদানের আহ্বান জানান। এই খাতগুলোতে দীর্ঘ সময়ের জন্য সুদহার কমানোসহ এসএমই খাতে ঋণ ও প্রণোদণা প্রাপ্তি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বড় প্রতিষ্ঠানগুলো যেভাবে নিজেদের বিষয়গুলো নীতি নির্ধারকদের কাছে তুলে ধরতে পারে ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো সেভাবে পারে না। অথচ এই ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে তুলনামূলক বেশি কর্মসংস্থান তৈরি হয়। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো গত বছর প্রথম প্রান্তিকে বড় ধসের পরে আমরা সার্বিক পুনরুদ্ধার দেখতে পেয়েছি, করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আসার আগ পর্যন্ত ধারাবাহিক পুনরুদ্ধার দেখা গেছে। কিন্তু পুনরুদ্ধার সবার জন্য একরকম হয়নি। ঢাকা চেম্বারের সভাপতি রিজওয়ান রাহমান বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যবসায় আস্থা বাড়ানোর জন্য সরকারকে খাতভিত্তিক গাইডলাইন তৈরি করতে হবে এবং তা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। ব্যাংকের ঋণ প্রণোদনার বিষয়ে তিনি বলেন, ব্যাংকগুলোকে ঋণের টার্গেট নির্ধারণ করে দেওয়া হয়, তারা বড় মাপের ঋণ দিয়ে লক্ষ্য অর্জন দেখিয়ে দেয়। অথচ কোন খাতে এই ঋণ বিতরণ হলো সেটি গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পকে মহামারির প্রভাব থেকে বাঁচাতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ বিতরণের জন্য সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকতে হবে।

ইত্তেফাক/কেকে

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x