কারখানা যথাযথ তদারকির অভাবেই ঘটছে দুর্ঘটনা

কারখানা যথাযথ তদারকির অভাবেই ঘটছে দুর্ঘটনা
ফাইল ছবি

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারে রানা প্লাজা ধসে মৃত্যু হয় ১ হাজার ১৩৪ জন শ্রমিকের। বিশ্বে তৈরি পোশাকশিল্পের ইতিহাসে বৃহৎ এই প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার পর বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে দেশের প্রধান রপ্তানি খাতকে। তবে সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলায় সেজান জুস কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ৫১ জনের প্রাণহানির ঘটনায় প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছে কারখানার নিরাপত্তার তদারকি প্রতিষ্ঠানগুলো।

‘ব্যবসায়িক সংগঠনগুলো শুধু সরকারের কাছ থেকে প্রণোদনা নিতেই ব্যস্ত’

রানা প্লাজা ধস ও তাজরীনে অগ্নিকাণ্ডের পর পোশাকশিল্প কারখানাগুলোর তদারকিতে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তে থাকে। বাংলাদেশ থেকে পণ্য কেনাও বন্ধ করে দেয় অনেক প্রতিষ্ঠান। ক্রেতা, বায়ারদের পক্ষ থেকে কারখানা তদারকিতে গঠিত হয় অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স। ঐ দুর্ঘটনার পর গত আট বছরে দেশের তৈরি পোশাকশিল্প কারখানায় বহু পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু পোশাকশিল্প কারখানার বাইরে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা কী, সে বিষয়ে আলোচনা তেমন নেই।

বাংলাদেশ লেবার স্টাডিজের (বিলস) জরিপমতে, গত জুন পর্যন্ত আগের সাড়ে চার বছরে দেশের বিভিন্ন শিল্প খাতে ৯৮টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রাণ হারিয়েছেন ১১৭ জন শ্রমিক। আহত হয়েছেন ২৭৫ জন। পোশাকবহির্ভূত খাতেই বেশি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে, যার সংখ্যা ৯১। পরিসংখ্যানে স্পস্ট, তৈরি পোশকশিল্পে যে ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেভাবে অন্য কারখানাগুলোতে নেওয়া হয়নি। ফায়ার সার্ভিসের তথ্যমতে, গত ১০ বছরে প্রায় ১ লাখ ৬৮ হাজার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে, যেখানে দায়িত্ব পালনে অবহেলাই সবচেয়ে বড় কারণ। একটি শিল্প কারখানা নির্মাণ করতে ট্রেড লাইসেন্স, পরিবেশ সনদ ছাড়াও কলকারখানা অধিদপ্তর, রাজউক, ফায়ার সার্ভিসসহ আরো বহু সংস্থা থেকে অনুমতি নিতে হয়। কারখানায় দায্য পদার্থ ব্যবহার করলে বিস্ফোরক পরিদপ্তরের অনুমতিও নিতে হয়। এগুলো সময়ভিত্তিক হালনাগাদও করতে হয়। এসব কারখানা সঠিকভাবে চলছে কি না, তা তদারকিতে নিয়োজিত সংস্থাগুলো যথাযথভাবে তদারক করছে না। জনবল ও অবকাঠামোর সংকটের দোহাই দিয়ে বছরের পর বছর চলছে। পোশাক কারখানায় ক্রেতাদের চাপে একধরনের নিয়মতান্ত্রিকতা বজায় থাকলেও অন্য কারখানার ক্ষেত্রে তা হচ্ছে না।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, দেশে এখন ২৫ লাখ ৪০ হাজার ৮৯৭টি শিল্প ও বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ১ কোটি ৪১ লাখ ৪ হাজার ৭৫৩ জন শ্রমিক কাজ করছেন এসব প্রতিষ্ঠানে। কলকারখানা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩৭ হাজার ৩২৭টি কারখানা, দোকান ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করেন পরিদর্শকেরা। করোনার আগে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৪৩ হাজার প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করেছেন তারা। এর আগের বছর ২৬ হাজার প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করা হয়। তবে গত দেড় বছরে তা সীমিত করা হয়। খুব সংক্ষিপ্ত পরিদর্শনে শ্রমিকদের জীবনমান-সংক্রান্ত কয়েকটি প্রশ্নেই শেষ হয় কার্যক্রম।

২০০৬ সালের শ্রম আইন অনুযায়ী গার্মেন্টসহ যে কোনো কারখানার নিরাপত্তা তদারক করার দায়িত্ব শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থা কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের। শ্রমিকনেতারা অভিযোগ করেন, তাজরীনের অগ্নিকাণ্ড, রানা প্লাজা ধসের পর রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্প কারখানার কর্মপরিবেশ উন্নয়নে বিশেষ জোর দেওয়া হলেও অন্যান্য শিল্পকারখানায় নজর দেওয়া হয়নি। ফলে পোশাকশিল্পের বাইরে একের পর এক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটছে। অবশ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, লোকবলের সংকটই তাদের বড় দুর্বলতা। তা ছাড়া আইনে শাস্তির বিধান কম থাকায় পরিদর্শকদের ক্ষমতাও কম।

ইত্তেফাক/কেকে

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x