অনুন্নয়ন খাতে বরাদ্দ বাড়লেও কমছে উন্নয়নে

দুই মাসে এডিপি বাস্তবায়ন মাত্র ৩.৮২ শতাংশ *বাজেটে উন্নয়ন কর্মসূচিতে বরাদ্দ এক-তৃতীয়াংশে নেমেছে
অনুন্নয়ন খাতে বরাদ্দ বাড়লেও কমছে উন্নয়নে
[প্রতীকী ছবি]

প্রতি বছরই অনুন্নয়ন খাতে ব্যয় বাড়ছে। বাজেটে ব্যয় বরাদ্দ বাড়লেও তুলনামূলক উন্নয়ন বাজেটের হার তেমন বাড়েনি। বাজেটে উন্নয়ন খাতের বরাদ্দ নেমে এসেছে প্রায় এক-তৃতীয়াংশে। একইভাবে উন্নয়ন বরাদ্দ বাস্তবায়নের হারও কম। বছরের শুরুতে সামান্যই বাস্তবায়ন হয়। বছর শেষেও পুরোপুরি বাস্তবায়ন সম্ভব হয় না। এমনকি কোনো বছরই ঘোষিত বাজেট তো নয়ই, বরং সংশোধিত বাজেটেরও পুরোটা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। দেশ স্বাধীন হবার পর মোট বাজেটের ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ থাকত। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যে বাজেট উপস্থাপন হয়েছে, তাতে উন্নয়ন কর্মসূচিতে মোট ব্যয়ের এক-তৃতীয়াংশ বরাদ্দ থাকছে। প্রতি বছর বাজেটের আকার বাড়লেও কমেছে উন্নয়ন বরাদ্দের অংশ।

চলতি ২০২১-২০২২ অর্থবছরে বাজেটের মোট আকার ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ধরা হয়েছে ২ লাখ ৩৬ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ সরকারি বেতন-ভাতা, সুদ পরিশোধ, ভর্তুকির মতো খাতগুলোতে ব্যয়ের বড় অংশ চলে যাচ্ছে। ফলে উন্নয়ন বরাদ্দের অংশ দাঁড়িয়েছে ৩৯ শতাংশে। কিন্তু কোনো বছরই শতভাগ এডিপি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। সম্প্রতি প্রকাশিত অর্থনৈতিক সমীক্ষার প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে সংশোধিত এডিপির বাস্তবায়ন ৯০ শতাংশের ওপরে থাকলেও ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে এটি ৮০ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ সংশোধন করেও ব্যয়ের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয় সেটিও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে বাজেট ঘাটতিও বড় হচ্ছে। বিগত বছরগুলোতে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) হিসাবে ৫ শতাংশের মধ্যেই বেঁধে রাখা সম্ভব হতো ঘাটতির আকার। কিন্তু করোনার প্রকোপ শুরু হবার পর বাজেট ঘাটতি এখন ৬ শতাংশের ওপরে রেখেই হিসাব কষতে হচ্ছে। গত বছর করোনার প্রকোপ শুরুর পর থেকেই ঘাটতি বড় হবে এমনটি ধরেই বাজেট ঘোষণা করা হয়েছিল।

সূত্রমতে, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) মাত্র ৩ দশমিক ৮ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে। আগের ২০২০-২০২১ অর্থবছরের দুই মাসে বাস্তবায়ন হয়েছিল ৩ দশমিক ৮৯ শতাংশ। অর্থাৎ এডিপি বাস্তবায়ন আগের চেয়ে কম দিয়ে নতুন অর্থবছর শুরু হলো। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) হালনাগাদ এডিপি বাস্তবায়ন চিত্রে এ তথ্য উঠে এসেছে। শতাংশের দিক থেকে আগের বছরের চেয়ে কম বাস্তবায়ন হলেও টাকার অঙ্কে তুলনামূলক বেশি খরচ হয়েছে। আগের অর্থবছরের দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) ৮ হাজার ৩৫১ কোটি ৪৮ লাখ টাকা ব্যয় হলেও চলতি অর্থবছরের দুই মাসে খরচ দেখানো হয়েছে ৯ হাজার ৫৩ কোটি ১৮ লাখ টাকা। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এবার অর্থবছর শুরু থেকেই দীর্ঘদিনের ছুটি বা লকডাউনের প্রভাব পড়েছে। গত বছরেও করোনার প্রভাবে বাস্তবায়ন কম হতে দেখা গেছে। প্রথম দিকে কাজের গতি কম থাকে। এডিপির সবচেয়ে বেশি খরচ সাধারণত অর্থবছরের শেষ দিকে হতে দেখা যায়।

এডিপি বাস্তবায়ন চিত্রে দেখা যায়, এই দুই মাসে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ খরচ করতে পেরেছে বরাদ্দের মাত্র ১ দশমিক ৩১ শতাংশ। বেশকিছু বিভাগের খরচ এখনো ১ শতাংশের নিচে লক্ষ্য করা গেছে। এডিপি বরাদ্দের শীর্ষে থাকা মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে স্থানীয় সরকার বিভাগে খরচ হয়েছে বরাদ্দের ৭ দশমিক ৪৭ শতাংশ, বিদ্যুৎ বিভাগে ৩ দশমিক ৮৬ শতাংশ, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে খরচ হয়েছে ৪ দশমিক শূন ৯ শতাংশ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে ১ দশমিক ৯২ শতাংশ, রেলপথ মন্ত্রণালয়ের ৪ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। এছাড়া সেতু বিভাগ ব্যয় করেছে ৫ দশমিক ৮০ শতাংশ, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বিভাগ ১ দশমিক ১৪ শতাংশ খরচ করতে পেরেছে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ব্যয় হয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ১ শতাংশ, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ১ দশমিক ১৮ শতাংশ। তবে শিল্প মন্ত্রণালয়ের ব্যয় হয়েছে ১৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ।

উল্লেখ্য, গত অর্থবছর করোনার প্রভাবে যেসব উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বিত হয়েছে, সেগুলো অগ্রাধিকার দিয়ে চলতি ২০২১-২০২২ অর্থবছরের জন্য ২ লাখ ৩৬ হাজার ৭৯৩ কোটি ৯ লাখ টাকার এডিপি অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা বা কর্পোরেশনের প্রায় ১১ হাজার ৪৬৮ কোটি ৯৫ লাখ টাকাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। অর্থ বরাদ্দ প্রদানের ক্ষেত্রে কৃষি, শিল্প ও সেবাখাত প্রবৃদ্ধি, বিদ্যুৎ উৎপাদন, আইসিটি শিক্ষার উন্নয়ন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ক্ষয়ক্ষতি পুনর্বাসন-সংক্রান্ত প্রকল্প, সুষম উন্নয়নের লক্ষ্যে এলাকাভিত্তিক প্রকল্পকে অগ্রাধিকার প্রদান করা হয়েছে। মোট এডিপির মধ্যে অভ্যন্তরীণ উৎস (জিওবি) হতে অর্থায়ন ধরা হয়েছে ১ লাখ ৩৭ হাজার ২৯৯ কোটি ৯১ লাখ টাকা এবং বৈদেশিক উত্স হতে ৮৮ হাজার ২৪ কোটি ২৩ লাখ টাকা অর্থায়নের লক্ষ্য রয়েছে। নতুন এডিপিতে প্রকল্প সংখ্যা ১ হাজার ৫১৫টিতে।

ইত্তেফাক/এমআর

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x