ঢাকা মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০১৯, ১০ বৈশাখ ১৪২৬
২৭ °সে

চিনি উত্পাদনের চেয়ে আমদানিতেই লাভ

চিনি উত্পাদনের চেয়ে আমদানিতেই লাভ
ফাইল ছবি

বাংলাদেশে চিনি উত্পাদনের চেয়ে আমদানি করলেই লাভ অনেক বেশি। দেশের চিনিকলগুলোর অধিকাংশের প্রতিকেজি চিনির উত্পাদন খরচ সর্বোচ্চ তিনশ টাকার বেশি। অথচ প্রতিকেজি চিনি আমদানি করলে খরচ পড়ে মাত্র ৪৮ টাকা। আর অপরিশোধিত চিনি এনে দেশে শোধন করলে প্রতিকেজিতে খরচ পড়ে ৪০ টাকার মতো।

দেশে সরকারি চিনিকল আছে ১৫টি যার ১৪টি লোকসান গুনছে। একমাত্র কেরু অ্যান্ড কোম্পানিই লাভের মুখ দেখছে। চিনি উত্পাদনের ক্ষেত্রে লোকসান করলেও কেরুর ডিস্টিলারি ইউনিটই লাভ করছে। ১৯৩৮ সালের প্রতিষ্ঠিত এই চিনি কলটিতে দেশি মদের পাশাপাশি নয়টি ব্র্যান্ডের বিদেশি মদ বা ‘ফরেন লিকার’ তৈরি হয়। আখ থেকে চিনি বের করে নেওয়ার পর তিনটি উপজাত থাকে। মোলাসেস বা চিটাগুড়, ব্যাগাস বা ছোবড়া, প্রেসমাড বা গাদ। মোলাসেসই লিকার উত্পাদনের মূল উপকরণ। এছাড়া এই চিনিকলে তৈরি হয় দুই ধরণের ভিনেগার, স্পিরিট ও জৈব সার। গত অর্থবছরে কেরু এ্যান্ড কোম্পানী প্রায় ৮ কোটি টাকা লাভ করে। কিন্তু বাকী চিনিকলগুলো বছরের পর বছর লোকসান দিচ্ছে। এই কলগুলোকে লাভজনক করার জন্য তেমন উদ্যোগ নেই।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ খাদ্য ও চিনি শিল্প কর্পোরেশনের আওতায় এই চিনিকলগুলো রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য, চিনির উত্পাদনের পর আখের উপজাতকে কাজে লাগাতে পারলে কারখানা লাভজনক হতে পারে। কেরু অ্যান্ড কোম্পানির আদলে চিনিকলগুলোকে ব্যবহার করার কথা উঠলেও কর্পোরেশনের শীর্ষ কর্তারা এতে আগ্রহ দেখায়নি। তবে নর্থ বেঙ্গল ও ঠাকুরগাঁও চিনি কলদুটিতেও মদ, বিদ্যুত্ ও জৈব সার তৈরির প্রক্রিয়া চলছে। এই দুটি চিনি কলে প্রায় আটশ কোটি টাকার দুটি প্রকল্প একনেকে অনুমোদন হয়েছে।

উল্লেখ্য, দেশে বর্তমানে চিনির চাহিদা আনুমানিক ১৫ লাখ টন। বাংলাদেশের সরকারি ১৫ টি চিনি মিলের সক্ষমতা ২ লাখ টন হলেও এবার এর বিপরীতে উত্পাদন করেছে মাত্র ৬৮ হাজার টন। যার মধ্যে বেশিরভাগই অবিক্রিত থাকে।

বাংলাদেশ চিনি শিল্প কর্পোরেশনও চিনি উত্পাদনের পাশাপাশি গতবছর ১ লাখ ৮ হাজার টন চিনি আমদানি করে। যার মধ্যে এখনও ৮৪ হাজার টন অবিক্রিত আছে। প্রতি কেজি চিনির আমদানি খরচ পড়েছে ৪৮ টাকা। বেসরকারি কোম্পানীগুলো প্রতিবছর গড়ে ১৪ লাখ টন চিনি অপরিশোধিত চিনি আমদানি করে। এগুলো আমদানির পর নিজস্ব মেশিনে পরিশোধন করে সাদা চিনি তৈরি করা হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কুষ্টিয়া সুগার মিলে প্রতি কেজি চিনির উত্পাদন খরচ ৩৩৪ টাকা। পাবনা সুগার মিলে এ খরছ প্রায় ৩শ টাকা। কোনও মিলে উত্পাদন খরচ ১৩০ টাকার কম নয়। অন্যদিকে প্রতি কেজি চিনির বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৫০ টাকায়। তাহলে লোকসানতো হবেই।

অন্যদিকে বছরের বেশিরভাগ সময় শুধু আখের অভাবে এসব মিলের উত্পাদন বন্ধ থাকছে। ১২ মাসের মধ্যে কুষ্টিয়া সুগার মিল চলে মাত্র ২ মাস। আর আখের অভাবে বন্ধ হয়ে আছে জয়পুরহাট সুগার মিল।

চিনিকলগুলো লোকসানে থাকায় কর্মকর্তা কর্মচারি ও শ্রমিকদের ৩/৪ মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে। বেতনের বদলে তাদের দেয়া হচ্ছে চিনি। এই চিনি বিক্রি করেও পুরো বেতন নিতে পারছেন না তারা। অন্যদিকে আখচাষীরা এই কর্পোরেশনের কাছে পাবেন ৩৫০ কোটি টাকা। এর উপরে আছে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার ব্যাংক ঋণে বোঝা।

কুষ্টিয়া সুগার মিলে জেনারেল ম্যানেজার আবু সায়েম বলেন, সুগার মিলগুলোর মেশিন দীর্ঘদিনের পুরনো হওয়ায় উত্পাদন কম। নিয়ম অনুযায়ী ১শ কেজি আখ থেকে সাড়ে ৭ কেজি চিনি পাওয়ার কথা। অথচ দেশের চিনি মিলগুলোতে পাওয়া যায় ৫ কেজিরও কম। আবু সায়েম জানান, ঋণের টাকা পরিশোধ করতে দিয়েই লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে। কোন চিনি কলের মোট ব্যয় ৫০ কোটি টাকা হলে সুদ পরিশোধ করতে হয় ২০ কোটি টাকা। এ কারণে চিনির উত্পাদন খরচও বেড়ে যায়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আখের বীজ রোপন থেকে শুরু করে কাটা পর্যন্ত ১২ থেকে ১৪ মাস সময় লেগে যায়। সারা বছর ধরে জমিতে একটি ফসলই পড়ে থাকে। ধান, ডাল ও সবজি চাষে কম সময় নেয়, লাভও বেশি। এ কারণেই আখ চাষে কৃষক আগ্রহ হারাচ্ছে। আখের অভাবে চিনিকল বন্ধ থাকলেও শ্রমিকদের বসিয়ে বসিয়ে সারাবছরের বেতনভাতা দিতে হয়। ফলে লোকসানের পরিমাণও বাড়ছে।

বাংলাদেশ চিনি ডিলার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান বাবলু বলেন, প্রশাসনিক অদক্ষতায় চিনি কলগুলোতে লোকসান হয়। তিনি প্রাক্তন এক চেয়ারম্যানের নাম উল্লেখ করে বলেন, কোন উদ্যোগ নেননি। অথচ নিজে চারটি গাড়ি ব্যবহার করেছেন। কর্মকর্তা কর্মচারিরা বেতন পাননি অথচ টিএ/ডিএ নামে বেশ টাকা তুলে নিয়েছেন তিনি।

কেরু এ্যান্ড কোং এর প্রাক্তন ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ বি এম আরশাদ হোসেন বলেন, শুধু চিনি দিয়ে কোনভাবেই লাভের মুখ দেখা যাবে না। কেরু এ্যান্ড কোং এর পথেই হাটতে হবে সব চিনিকলগুলোকে।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
২৩ এপ্রিল, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন