লকডাউনে কারখানা বন্ধের খবরে উদ্বেগ

স্বাস্থ্যবিধি মেনে কারখানা চালু রাখতে চায় গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল খাত
লকডাউনে কারখানা বন্ধের খবরে উদ্বেগ
ছবি: সংগৃহীত

দেশে করোনা সংক্রমণের হার বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে তা ঠেকাতে সরকার আরো কঠোর হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। ইতিমধ্যে আগামী ১৪ এপ্রিল থেকে এক সপ্তাহের সর্বাত্মক লকডাউন দেওয়ার ঘোষণাও এসেছে, যাতে সব ধরনের শিল্পকারখানাও বন্ধ থাকবে বলে ইতিমধ্যে জানা গেছে। এ পরিস্থিতিতে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে শিল্পোদ্যোক্তাদের মধ্যে।

রপ্তানিমুখী শিল্প, বিশেষত তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, প্রতিযোগী অন্যান্য দেশে করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও তাদের শিল্পকারখানা চালু রয়েছে। বাংলাদেশে গত বছরব্যাপী করোনার ছোবলে ক্ষতির মুখে পড়া শিল্প এখন কোনোমতে টিকে থাকার চেষ্টায় রয়েছে। নতুন করে কারখানা বন্ধ থাকলে শ্রমিকেরা গ্রামে চলে যাবেন। ফলে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে রপ্তানি আদেশের পণ্য তৈরি করা এবং তা জাহাজীকরণ সম্ভব হবে না। অন্যান্য দেশে যেহেতু কারখানা চালু রয়েছে, ফলে এসব ক্রয়াদেশ অন্য দেশে চলে যাবে। বিদেশি ক্রেতার (বায়ার) কাছ থেকে অর্থ না এলে রপ্তানিকারকেরা বহুমুখী চাপে পড়বেন। ঈদ সামনে রেখে শ্রমিকদের বেতন-ভাতাও পরিশোধ করা দুরূহ হবে। এ পরিস্থিতিতে শ্রম অসন্তোষের মতো আশঙ্কাও করছেন তারা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, গত বছরের ন্যায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে কারখানা চালু রাখতে চান শিল্পোদ্যোক্তারা। এছাড়া কারখানা বন্ধ হলে কী ধরনের ক্ষতি হতে পারে, তা নিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গেও তারা আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। ইস্যুটি নিয়ে আজ সংবাদ সম্মেলন করে বিস্তারিত তুলে ধরবে তৈরি পোশাক, বস্ত্র খাত ও রপ্তানিকারকদের সংগঠনসহ চারটি সংগঠন।

যোগাযোগ করা হলে অন্যতম রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান জায়ান্ট গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিজিএমইএর সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার অপেক্ষায় থাকা ফারুক হাসান ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমাদের প্রতিযোগী কোনো দেশে কারখানা বন্ধ নেই। ভারতের যে অঞ্চলে খুব বেশি সংক্রমণ, সেখানে তারা রাতে কারফিউ দিয়েছে, কিন্তু কাজ বন্ধ নেই। এই সময়ে কারখানা বন্ধ থাকলে আমাদের শ্রমিকদের বেশির ভাগই গ্রামে চলে যাবেন। বিপুল পরিমাণ ক্রয়াদেশ বাতিল হবে, পণ্য জাহাজীকরণ করা যাবে না। জাহাজে পাঠাতে ব্যর্থ হলে ১৪গুণ বেশি খরচে বিমানে পাঠাতে হবে। অন্যদিকে ক্রেতার কাছ থেকে টাকা পাওয়া না গেলে ব্যাংক সহযোগিতা করবে না। আগামী ঈদের বেতন ও বোনাস দিতে হবে। অন্যদিকে কারখানা বন্ধ হলে, ক্রেতারা অন্য দেশে চলে গেলে তাদের সহজে ফেরত আনা যাবে না। অনেকে বেতন-ভাতা না দিতে পারলে শ্রম অসন্তোষের শঙ্কাও রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘গত বছর লকডাউনের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মেনে পোশাক কারখানা চালু রাখায় ভালো ফল এসেছে। এ খাতের শ্রমিকদের মধ্যে করোনা সংক্রমণের হার মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ, যা একেবারেই কম। আমরা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং সরকারের দেওয়া স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে মেনে কারখানা চালানোর ব্যবস্থা করেছি।’

বস্ত্র খাতের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিটিএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন ইত্তেফাককে বলেন, গত বছর পহেলা বৈশাখ, ঈদ ও পূজার বাজার হারিয়েছেন স্থানীয় বস্ত্রশিল্পের উদ্যোক্তারা। কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে এ ধরনের হাজার হাজার শিল্পোদ্যোক্তা বড় বিপদে পড়ে যাবেন। কারখানা বন্ধ হলে শ্রমিকেরা বাড়ি চলে যাবেন। এতে সংক্রমণ আরো বাড়তে পারে। অন্যদিকে অনেকের পণ্য পাঠানো সম্ভব হবে না। বেতন-বোনাস দেওয়ার অর্থ কোথা থেকে আসবে? এতে শ্রম অসন্তোষ বাড়তে পারে। তিনি বলেন, কিছু লোক সুবিধা নেওয়ার জন্য এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়ে সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলতে পারে।

গতবার যেভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে কারখানা চালু করা হয়েছিল, সেই অভিজ্ঞতা ইতিবাচক উল্লেখ করে তিনি বলেন, যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে কারখানা চালু করা উচিত।

অবশ্য স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদ অনেকেই মনে করছেন, বর্তমানে করোনার বিস্তার ঠেকাতে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কঠোর লকডাউন হওয়া উচিত। পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর ইত্তেফাককে বলেন, দুই সপ্তাহ সবাইকে কষ্ট করে ঘরে থাকতে হবে। কারণ, এখনই হাসপাতালে জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না। এই সময়ে যাতে শ্রমিকেরাও বাড়িতে যেতে না পারেন, সেই ব্যবস্থা থাকা দরকার। তিনি বলেন, কারখানা খোলার পর প্রয়োজনে শিফট করে, দিনরাত কাজ করে কিংবা ঈদের ছুটি কমিয়ে দিয়ে কাজ করানো যেতে পারে। কিন্তু এখন পোশাক ও বস্ত্র খাতকে দিলে অন্যরাও একই সুবিধা চাইবে। তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হবে।

প্রসঙ্গত, গত বছর দেশব্যাপী লকডাউনের কারণে কারখানা বন্ধ থাকা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় প্রায় ৩১৯ কোটি ডলারের তৈরি পোশাকপণ্যের রপ্তানি আদেশ বাতিল কিংবা স্থগিত হয়। অবশ্য পরে ঐ সব পণ্যের বেশির ভাগই রপ্তানি করা সম্ভব হয়েছে। যদিও অর্থপ্রাপ্তি বিলম্ব হওয়ার পাশাপাশি ক্ষেত্রবিশেষে ডিসকাউন্টও দিতে হয়েছে। রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এর বাইরে অন্যান্য রপ্তানি পণ্যও একই সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।

ইত্তেফাক/এমএএম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x