ধর্ষণ ইস্যুতে ছাত্রলীগ-ছাত্র ইউনিয়ন মুখোমুখি

#ছাত্রলীগের বক্তব্য ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ঘটনাকে বৈধতা দেয়ার অপচেষ্টা মাত্র: ছাত্র ইউনিয়ন; ধর্ষকদের পক্ষে ছাত্র ইউনিয়নের সাংগঠনিক অবস্থান: ছাত্রলীগ
ধর্ষণ ইস্যুতে ছাত্রলীগ-ছাত্র ইউনিয়ন মুখোমুখি
ধর্ষণের প্রতিবাদে উত্তাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ সাম্প্রতিক সময়ে সারাদেশে ঘটে যাওয়া ধর্ষণের ঘটনার সাথে জড়িতদের বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশে ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দের বক্তব্য নিয়ে মুখোমুখি হয়ে পড়েছে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন। ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাসের বক্তব্য বিতর্কিত, ধর্ষণ ও নারী নিপীড়নকে বৈধতা দেয়া হয়েছে জানিয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে ছাত্র ইউনিয়ন। তবে ছাত্র ইউনিয়নের বিজ্ঞপ্তির প্রতিবাদ জানিয়ে গতকাল সোমবার রাত ৯টায় প্রতিবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে ছাত্রলীগ। ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় শাখার দপ্তর সম্পাদক মেফতাহুল ইসলাম পান্থ স্বাক্ষরিত ওই বিজ্ঞপ্তিটি দেয়া হয়। অন্যদিকে ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের সভাপতি সাখাওয়াত ফাহাদ ও সাধারণ সম্পাদক রাগীব নাঈম সাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়।

ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় শাখা সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাসের বক্তব্যের প্রতিবাদ করে ছাত্র ইউনিয়নের দেয়া ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গতকাল (রবিবার) সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্যের সামনে এক বক্তৃতায় ঢাবি ছাত্রলীগ সভাপতি সঞ্জিত চন্দ্র দাস ‘স্বাধীনতা বিরোধী ছাড়া অন্য কোনো নারী যদি নির্যাতনের শিকার হয়...তা প্রতিহত করব’ এমন একটা বক্তব্য দিয়েছেন। আমরা মনে করি, এই বক্তব্য ছাত্রলীগ কর্মীদের হাতে ক্রমাগত ঘটে চলা ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ঘটনাকে বৈধতা দেয়ার অপচেষ্টা মাত্র। স্বাধীনতার ৪৯ বছর পর নির্যাতনের শিকার নারীর মধ্যে ‘স্বাধীনতাবিরোধী’ খোঁজার মাধ্যমে সঞ্জিত তার সংগঠনের নারী নিপীড়কদের বাঁচানোর অপপ্রয়াস করছেন।

এর প্রতিবাদে ছাত্রলীগের দেয়া বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাসের একটি বক্তব্যকে হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে কুরুচিপূর্ণ ও উদ্দেশ্যমূলক ভাবে রক্ত মাখিয়ে বিভ্রান্তিকর করেছে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংসদ। এ ধরনের বিজ্ঞপ্তি ছাত্র ইউনিয়নের গৌরবজনক ঐতিহাসিকতার হতাশাজনক পরিণতি বলে আমরা মনে করি। আমরা উদ্বেগের সাথে আরও মনে করি, সাম্প্রদায়িক-প্রতিক্রিয়াশীল, স্বাধীনতা বিরোধী গোষ্ঠীর কাছে ছাত্র ইউনিয়নের বর্তমান নেতৃত্ব তাদের সংগঠনকে যেভাবে লজ্জাজনক ইজারা ও দখলদারিত্ব প্রদান করেছে সাম্প্রতিক যৌথ বিবৃতি তারই প্রমাণ বহন করে।

ছাত্রলীগ পুরোদস্তুর একটি ধর্ষক-নিপীড়কদের সংগঠনে পরিণত হয়েছে মন্তব্য করে ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দ বলেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে একশর অধিক ছাত্রীকে ধর্ষণ করা ছাত্রলীগ নেতা মানিককে জনগণ ভুলে যায়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে নারী নিপীড়নের কলঙ্কিত ঘটনা যারা ঘটিয়েছিল তারা এই ছাত্রলীগেরই নেতাকর্মী। সবশেষ সিলেট এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে ছাত্রলীগ গণ ধর্ষণের ঘটনা ঘটিয়েছে। এহেন ছাত্রলীগ সভাপতি নারী নির্যাতনকে বৈধতা দেয়ার অপচেষ্টা চালাবেন, এতে আমরা একটুও বিস্মিত হই না।

ছাত্রলীগের দেয়া প্রতিবাদ লিপিতে বলা হয়, এই মিথ্যাচার ও বানোয়াট যৌথ বিবৃতি প্রত্যাখ্যান পূর্বক মনে করে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী ধর্ষিত হবার ঘটনায় আশ্চর্যজনকভাবে নীরব থেকে ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংসদ ধর্ষকদের পক্ষে তাদের সাংগঠনিক অবস্থান প্রমাণ করেছে। পাশাপাশি ধর্ষকদের সাথে নিজেদের রাজনৈতিক মিত্রতাকে তারা ধর্ষিতার আর্তনাদের থেকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছে। যা এই সংগঠনের দেউলিয়াত্ব প্রমাণ করে।

ছাত্র ইউনিয়নের বিবৃতিতে বলা হয়, মুক্তিযুদ্ধে একক ছাত্র সংগঠন হিসেবে রণাঙ্গনে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক যোদ্ধা ছাত্র ইউনিয়নের ছিল। এটি ছিল একটি গণযুদ্ধ, দেশের সর্বস্তরের মানুষ এতে অংশ নিয়েছিল। সঞ্জিত তার সংগঠনের অপকর্মকে বৈধতা দিতে এই রক্তার্জিত স্বাধীনতাকে ব্যবহার করে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আদর্শকে কলঙ্কিত করেছেন। যে রাজু শহীদ হয়েছিলেন ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ-ছাত্রদলের সন্ত্রাস প্রতিহত করতে গিয়ে, সেই রাজুর নামে স্থাপিত ভাস্কর্যকে তিনি কলঙ্কিত করেছেন। তার উপস্থিতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কলঙ্কিত করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা সঞ্জিত চন্দ্র দাসকে আর ক্যাম্পাসে দেখতে চায় না।

স্বাধীনতা সংগ্রামে গৌরবান্বিত ভূমিকা পালন করা ছাত্র ইউনিয়ন বর্তমানে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির মুখপাত্রে পরিণত হয়েছে জানিয়ে ছাত্রলীগের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, একাত্তরের মহান স্বাধীনতার সংগ্রাম, ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কুলাঙ্গার শিক্ষকের মিথ্যাচারকে ‘রাষ্ট্রীয় বিতর্কিত বিষয়’ বলে উল্লেখ করার মাধ্যমে। সাম্প্রতিক যৌথ বিবৃতি সেই ধারাবাহিকতারই আরেক ধাপ পতন বলে আমরা মনে করি। ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় সংসদ যে বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক-মৌলবাদী-উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠীর খোলসে রুপ লাভ করেছে তা সাম্প্রতিক অতীতে একাধিকবার প্রমাণিত। যৌথ বিবৃতির মাধ্যমে তারা চূড়ান্তভাবে নিজেরাই তা স্বীকার করে মাত্র।

ধর্ষকদের সাথে ছাত্র ইউনিয়নের রাজনৈতিক সমঝোতা আছে জানিয়ে ছাত্রলীগের বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ সবসময় ধর্ষণ, নারী নিপীড়ন ও নারীর মানবিক মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হওয়ার বিপক্ষে সোচ্চার। বিপরীতে ছাত্র ইউনিয়ন ধর্ষণকারীদের পক্ষে নীরবতা পালন করে, ধর্ষণকারীদের সাথে রাজনৈতিক সমঝোতা গড়ে, আকারে-ইঙ্গিতে থেকে প্রকাশ্যে ধর্ষণকারীদের বাঁচানোর চেষ্টা করে নিজেদের সাংগঠনিক অবস্থান পরিষ্কার করেছে।

এমনকি নিজ সংগঠনের ভেতরে সংঘটিত নারী নির্যাতনের ঘটনার কোন প্রতিকার পূর্বে তারা করেনি যার ফলশ্রুতিতে তাদের কেন্দ্রীয় অফিসে নির্যাতিতাকে অবস্থান ধর্মঘট পালন করতে হয়েছে। সু-স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, সহমর্মিতাকে পাশ কাটিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংসদ কর্তৃক যে হীন প্রতিহিংসা দৃশ্যমান তা সামগ্রিক ছাত্র রাজনীতির জন্য নেতিবাচক বলে আমরা মনে করি। স্বাধীনতা বিরোধী, সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী, ধর্মীয় উগ্র গোষ্ঠীর সমার্থক হয়ে পরিচালিত ছাত্র ইউনিয়নের এমন কর্মকাণ্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ কোনভাবেই মেনে নিবে না।

ইত্তেফাক/এসআই

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত