আমাদের ছিলো একজন আইয়ুব বাচ্চু

আমাদের ছিলো একজন আইয়ুব বাচ্চু
আইয়ুব বাচ্চু। ছবি: ফাইল, সংগৃহীত

২০১৭ সাল। নভেম্বর মাস। হঠাৎ অফিস এসাইনমেন্ট দিল। আইয়ুব বাচ্চুর ইন্টারভিউ নিতে হবে। আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম। এতো বড় মাপের একজন ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নিতে হবে, তাও আবার সাংবাদিকতার শুরুতে! তা আমার চিন্তার বাইরে ছিল। যাই হোক, কাজ শুরু করলাম।

কিন্তু সমস্যা দেখা দিল, তার সঙ্গে যোগাযোগ করার। সেটা কিভাবে করবো? নম্বর তো নাই। ফেসবুকে নক করলাম। ধারণা ছিল এতে কোনো সাড়া পাবো না। কারণ আমার মতো একজন জুনিয়র সাব-এডিটরকে ইন্টারভিউ দেওয়ার মতো সময় কি তার আছে?

কিন্তু অবাক করার বিষয়, মেসেজ পাঠানোর কিছু সময়ের মধ্যেই রিপ্লাই করলেন এবি দাদা। তখন আমি উনাকে এবি দাদা বলে সম্বোধন করতাম। তাকে ইন্টারভিউ নেওয়ার কথা বললাম। তিনি সহজেই রাজি হয়ে গেলেন। আমি তার কাছে বিনয়ের সঙ্গে ফোন নম্বর চাইলাম। তিনি দিলেন। আরো অবাক হলাম। এও কি সম্ভব!

আসলে তিনি যে একজন লিজেন্ড, বিনয়ী, তার ভেতরে যে বিন্দুমাত্র অহংকার নেই এটাই তার প্রমাণ। এই হলেন আমাদের আইয়ুব বাচ্চু। বাংলা ব্যান্ড মিউজিকের কিংবদন্তী। বাংলাদেশের গর্ব। শুধু তাই নয়, পুরো বিশ্ব তার সুরে মুখরিত।

সবশেষ ইন্টারভিউ নেওয়ার জন্য তাকে মোবাইলে ফোন দিলাম। একটু নার্ভাস ছিলাম। একবার... দুইবার... তিনবার...তার মোবাইলে কল হলো। রিসিভ হয়নি। আধা ঘণ্টা পর যখন চতুর্থবার কল দিলাম রিসিভ হলো।

ওপাশ থেকে হ্যালো বললেন এবি দাদা। আমি ভয়ে ভয়ে বললাম- ‘আমি জায়েদ বলছি দাদা।’ তিনি বললেন- ‘ও জায়েদ। বলো কি বলবে।’ দরাজ কণ্ঠের এত বিনয়ী শব্দ এর আগে আমি শুনিনি।

সবশেষ আইয়ুব বাচ্চু আমাকে ইন্টারভিউ নেওয়ার একটা সময় দিলেন। আমার এখনো মনে আছে, দিনটি ছিল ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসের ১৭ তারিখ বিকাল বেলা। আমি উপস্থিত মগবাজারের এবি কিচেন স্টুডিওতে। গেটে পরিচয় দিতেই আমাকে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হলো। প্রবেশ করেই দেখলাম তখনো আইয়ুব বাচ্চু গিটার হাতে বসে আছেন।

পরিচয় দিতেই বললেন, ‘ও জায়েদ এসেছ, বসো বসো।’ আমার সঙ্গে হাত মেলালেন। নিজে থেকেই আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন আর সবার সঙ্গে।

কথা বলার কিছুক্ষণ পরপর গিটারের স্ট্রিংয়ে সুর তুলছেন। সে কি সুর সেটা তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আমার মতো একজন মানুষ তার ব্যাখ্যা কখনো করতে পারবে না। প্রচণ্ড রকম অমায়িক একজন মানুষ আইয়ুব বাচ্চু। তাকে যারা কাছ থেকে দেখেছেন এটা মানবেন নিশ্চয়ই।

অনেক কথা হলো সেদিন। দুঃখ-কষ্টের কথা বললেন। তার আক্ষেপ ছিল ‘পাইরেসি’ নিয়ে। শিল্পীদের পাওনা নিয়ে। তারপরেও তিনি ছিলেন পজিটিভ। মনে করতেন তরুণরাই বাংলাদেশের সংগীতকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। বলেছেন, তার প্রত্যেক গানের পেছনে ছিল একেকটা স্বপ্ন।

আইয়ুব বাচ্চু বরাবরই বাবা-মা ও পরিবারকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন। সেটাও বলেছিলেন তিনি। ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু সবার সঙ্গে ভালো ব্যবহারের কথাও বলেছিলেন।

সে দিনের ইন্টারভিউতেও তিনি মৃত্যুর কথা বলেছিলেন। জানিয়েছিলেন তার অনুপস্থিতিতে যেন বাংলাদেশের গান হারিয়ে না যায়। তিনি এদেশের মানুষকে ভালোবাসতেন। বারবার তিনি বাংলাদেশের মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছিলেন।

বলেছিলেন, তাদের সমর্থন না থাকলে তার আইয়ুব বাচ্চু হওয়া হতো না। কিন্তু এমন একজন কিংবদন্তী এত দ্রুতই প্রস্থান করবেন তা কল্পনাতেই ছিলো না। এই ইন্টারভিউ নেওয়ার পরের বছরই তিনি চলে যান না ফেরার দেশে।

ইত্তেফাক/জেডএইচ

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত