আজাদ সিনেমা হলের বেহাল দশা

‘বি গ্রেড’ সিনেমা আর অশ্লীল পোস্টারে সয়লাব
আজাদ সিনেমা হলের বেহাল দশা
ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ও প্রথম সিনেমা হল ‘আজাদ সিনেমা হল’। ছবি: সংগৃহীত

পুরান ঢাকার রায় সাহেব বাজার দিয়ে সদরঘাটের দিকে একটু এগোলেই কোর্টের বিপরীতে দেখা যাবে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ও প্রথম সিনেমা হল ‘আজাদ সিনেমা হল’। ঐতিহ্যবাহী প্রেক্ষাগৃহটির এখন জরাজীর্ণ অবস্থা। হলের দেওয়ালগুলো থেকে ইট, সিমেন্ট খসে পড়ছে। হলের ওপরে টিনের চালা, ভারী বৃষ্টি হলেই পানিতে ভেসে যায়।

এ ছাড়া দর্শক আকর্ষণের জন্য আজাদ ম্যানশনের দেওয়াল জুড়ে ‘বি গ্রেড’ চলচ্চিত্রের পোস্টারে ছেয়ে আছে, যা সুস্থ সংস্কৃতির ও উন্নত মানসিকতাসম্পন্ন দর্শক টানতে সক্ষম নয়। ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় দর্শকশূন্য হলটি। আর সিনেমাও দেখানো হচ্ছে কম্পিউটার আর পেনড্রাইভের মাধ্যমে, নেই রিল। কালের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে ৮৮ বছরের ঐতিহ্যবাহী এই হল। ‘বি গ্রেড’ সিনেমায় সয়লাব এবং রুচিহীন কর্মকাণ্ডে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে দর্শক। বর্তমানে দর্শকের বদলে জায়গা করে নিয়েছে মাদকসেবী আর অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িতরা। প্রশাসনের নাকের ডগায় এসব কর্মকাণ্ড চললেও নেওয়া হয় না কার্যকর কোনো ব্যবস্থা।

আরও পড়ুন: নায়করাজের জন্মবার্ষিকী আজ

জানা যায়, মুড়াপাড়ার জমিদার মুকুল ব্যানার্জির নামানুসারে প্রথম দিকে এর নাম ছিল ‘মুকুল টকিজ’। ১৯২৯ সালে ঢাকায় নির্মিত প্রথম নির্বাক চলচ্চিত্র ‘দ্য লাস্ট কিস’ এই হলে প্রদর্শিত হয়। ঢাকা শহরের রুচিশীল দর্শক থেকে শুরু করে সব ধরনের দর্শকে সরগরম থাকত আজাদ সিনেমা হল। ১৯৩০ সালে এই হলে দেখানো হয় ‘চণ্ডীদাস’, ‘গোরা’, ‘ফেয়ারওয়েল টু আর্মস’সহ বিখ্যাত সব ছবি। বর্তমানে জীর্ণশীর্ণ হলটি কোনো রকমে টিকে আছে।

আজাদ সিনেমা হলের ম্যানেজার পরিতোষ রায় বলেন, দেশের চলচ্চিত্রের একসময় স্বর্ণযুগ ছিল, তবে সেই স্বর্ণযুগ গত হয়েছে অনেক আগেই। আর নিম্নমানের গল্পের কারণেই দেশীয় চলচ্চিত্রগুলো দর্শক হারিয়েছে। আর দর্শকদের চলচ্চিত্র থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার কারণেই মুখ থুবড়ে পড়ছে দেশের ঐতিহ্যবাহী সিনেমা হলগুলো। তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের অবকাঠামোগত সমস্যা থাকার কারণে আমরা ভালো সিনেমা প্রদর্শনের সুযোগ পাই না। বাংলাদেশ পিকচার এক্সিবিশন কেন্দ্র থেকে আমাদের ভালো সিনেমা দেওয়া হয় না, যার কারণে পুরাতন সিনেমাগুলো মডিফাই করে এখানে প্রদর্শন করি। হলের নাজুক পরিবেশ হওয়ার কারণে আমাদের এখানে রুচিসম্মত সিনেমার দর্শকও আসে না।’ হলের ভেতরে মাদকসেবীদের আড্ডা ও নানান অসামাজিক কার্যকলাপের অভিযোগ এড়িয়ে গিয়ে তিনি বলেন, ‘এ রকম হয় কি না, আমার জানা নেই।’

আরও পড়ুন: উৎসবের চলচ্চিত্র দেখা যাবে অনলাইনে

‘বি গ্রেড’ সিনেমার নোংরা ও অশ্লীল পোস্টারের বিষয়ে পরিতোষ রায় বলেন, ‘এই পোস্টারগুলো সিনেমার ডিস্ট্রিবিউটরদের করা। আমরা পোস্টারিং করি না। তারা যদি এ ধরনের পোস্টার প্রদান করে, তাহলে আমাদের কী করার আছে? আমরা না করেছি এ ধরনের পোস্টার দেওয়ার জন্য। তবে আমরা সিনেমার ডিস্ট্রিবিউটরের সঙ্গে কথা বলে পোস্টার পরিবর্তনের বিষয়টা জানাবো।’

এ প্রসঙ্গে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন বিভাগের চেয়ারম্যান ও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত অধ্যাপক জুনায়েদ আহমদ হালিম বলেন, সিনেমা বা এরকম হলগুলোর করুণ পরিস্থিতি এক দিনে তৈরি হয়নি। প্রথমত, সিনেমা হলগুলো ব্যক্তিমালিকানায়। আর দ্বিতীয়ত, ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন (এফডিসি)ভিত্তিক সিনেমা নির্মাণের মান কমে যাচ্ছে, যার কারণে হলে সিনেমা দেখতে দর্শক হিসেবে যারা যান, তাদের বোধশক্তির জায়গা নিম্ন। সিনেমা যে একটা শিল্প; এর থেকেও যে শেখা যায়, সেটা আমাদের শিক্ষিত সমাজেরও জানার বাইরে ছিল। সিনেমায় সরকারি অর্থায়ন করতে হবে এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শেখাতে হবে। তাহলে সিনেমা হলগুলোয় ভালো মানের চলচ্চিত্র দেখা যাবে।’

ইত্তেফাক/এমএএম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x