এটিএম শামসুজ্জামানের সঙ্গে কয়েক ঘণ্টা

এটিএম শামসুজ্জামানের সঙ্গে কয়েক ঘণ্টা
লেখকের ক্যামেরায় অভিনেতা এটিএম শামসুজ্জামান। ছবি: ইত্তেফাক

সকালে ঘুম ভেঙেই খবরে দেখলাম অভিনেতা এটিএম শামসুজ্জামান মারা গেছেন। মানুষটি এভাবে হুট করে চলে যাবেন এটা মানতে পারাটা সত্যিই কষ্টের। এইতো সেদিন দেখা করেছিলাম কিংবদন্তি এই মানুষটির সঙ্গে। বাংলাদেশের অভিনয় জগতে খুব বেশি কাউকে চিনি না কিন্তু চিনি এই মানুষটিকে। বরাবরই ভালো লাগতো তার অভিনয় ও কথা বলা।

এতো বড় মাপের একজন মানুষের সঙ্গে দেখা করার সুযোগটি হয়েছিলো ইত্তেফাক অনলাইনের হয়ে তার একটি ইন্টারভিউ করতে গিয়ে। তবে করোনা মহামারীর কারণে তার সঙ্গে একটা ছবি তোলার সুযোগ হয়ে উঠেনি। কিন্তু এতে বিন্দু মাত্র আফসোস নেই। কারণ তার সঙ্গে দেখতে পারা, কথা বলতে পারা, তার সামনে বসে গল্প শুনতে পারা আমার জন্য সৌভাগ্যের। কৃতজ্ঞ ইত্তেফাক অনলাইনের প্রতি।

তার সূত্রাপুরের দেবেন্দ্রনাথ লেনের বাসাটি খুঁজতে বেশ কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিলো আমার। তবে বাসা খুঁজে পাওয়ার পর সেই ক্লান্তি নিমিষেই হাওয়া হয়ে গিয়েছিলো। তিনি থাকতেন বাড়িটির নিচ তোলায়। শুরুতেই তার ঘরটি। তার ঘরে ঢুকতে গিয়ে ঘটিয়েছিলাম মজার এক কাণ্ড। আমরা আসটি জেনে তার ঘরের দরজা আগেই খুলে রেখেছিলেন তার স্ত্রী। এটিএম শামসুজ্জামান দরজার খুব কাছেই বসে ছিলেন। আমি অনেকক্ষণ দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে তার স্ত্রীর সঙ্গে ফোনে কথা বলছিলাম দরজা কোনদিকে বোঝার জন্য। কিন্তু আমি কিছুতেই বুঝছিলাম না। উফ, নিজের উপরে খুব রেগেছিলাম সেদিন। মানুষের বাড়ি আর দরজা খোঁজাতে বরাবরই আমি খুব আনাড়ি। ফোনে কথা বলার শুরু সময় থেকেই ঘরের ভেতর থেকে মৃদু স্বরে কিছু একটা শুনতে পাচ্ছিলাম। মনে হচ্ছিলো কেউ একজন ডাকছে। ফোনের কল কেটেই দরজা চোখে পড়লো। দেখলাম দরজাটি খোলাই ছিল।

দেখলাম সেই মানুষটিকে, যাকে এর আগে কোনোদিন সরাসরি দেখার সুযোগ হয়নি। ঘর জুড়ে বই। বুঝতে দেরি হলো না যে তিনি অনেক বেশি বই পড়েন। মহামারীর সময় তিনি বই পড়েই কাটিয়েছেন। মেঝেতে একটা বিছানা করা, তার এক পাশে চোখে চশমা, গাঁয়ে চাদর দিয়ে বসে রয়েছেন এই কিংবদন্তি।

করোনার কারণে তার থেকে বেশ খানিকটা দূরেই বসলাম। শুরুতে তার কথা শুনতে, বুঝতে বেশ কষ্ট পেতে হচ্ছিলো আমার। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই তার কথায় কিভাবে যেন একটা অন্যরকম মনোযোগ তৈরি হয়ে গেলো। তখন তার কথা যতই আস্তে হোক না কেনো, বুঝতে কষ্ট হচ্ছিলো না মোটেও। শুরুতেই তিনি জেনে নিলেন ইত্তেফাক থেকে গিয়েছি সে বিষয়ে। খুব পছন্দ করতেন ইত্তেফাক পত্রিকা। এমনকি ইত্তেফাকের অনেককেই ব্যক্তিগতভাবে চেনেন। খুব ভালো সম্পর্ক ছিল অনেকের সঙ্গে।

তারপর বিভিন্ন বিষয়ে কথা হলো। জানতে চেয়েছিলাম বর্তমান বিনোদন জগতের তথাকথিত অভিনয় শিল্পী ও তার সময়ের অভিনয় শিল্পীদের নিয়ে, তাদের কাজের ধরন, অভিনয়ের প্রতি ভালবাসা ও সিনেমা-নাটকের গল্প নিয়ে। পার্থক্যগুলো খুব ভালোভাবেই বোঝালেন তিনি। তার প্রতি সম্মান আরও বেড়েছিল যখন তিনি সমাজের নানা অসামঞ্জস্যতা নিয়ে কথা বললেন। বলেছিলেন, এখন আর আগের মতো কেউ সিনেমা-নাটকে এ সব জিনিস ফুটিয়ে তুলতে চায় না। কেউ চায় না সমাজ ভালো কিছু শিখুক, ভালো কিছু অনুসরণ করুক। এখনকার গল্প মানেই শুধু বিনোদন, প্রেম, পারিবারিক কলহ, আরও কত কিছু। কিন্তু সমাজের জন্য যা ভালো সেটা নিয়ে কারো মাথা ব্যথা নেই।

বর্তমানে যারা অভিনয় করছেন তাদের নিয়ে তিনি বলেন, এখন যারা অভিনয় করেন তারা অভিনয় না বুঝেই করেন। কারো অভিনয়ই তেমন একটা ভালো নয়। সবাই অভিনয় করছে শুধু টাকা পাচ্ছেন বলেই। তার সময় তিনি গল্প পড়েছেন, গল্প ভালো লাগলে তিনি প্রয়োজনে কোনো রকমের পারিশ্রমিক ছাড়াও কাজ করেছেন। কারণ তার মাথায় থাকতো যে গল্পটি সমাজের জন্য ভালো হবে, মানুষ ভালো কিছু দেখলে ভালো কিছু শিখবে। কিন্তু, বর্তমান অভিনয় শিল্পীদের নিয়ে তিনি ছিলেন খুব হতাশ।

এই পর্যন্ত ছিল তার সঙ্গে আমার ইন্টারভিউ সম্পর্কিত কথাবার্তা। কিন্তু তার সঙ্গে আমার আরও কিছু কথা হয়েছিল। আমার সাংবাদিকতা ক্যারিয়ারের শুরুর কাজ জেনে তিনি বলেছিলেন, সমাজের অন্যায়ের বিরুদ্ধে যেন মাথা নত না করে প্রতিবাদ করি। ভয়ে দমিয়ে যেন না যাই।

অসাধারণ প্রতিভাবান এই মানুষটির সঙ্গে কথা বলতে পেরে, তার কাছ থেকে মূল্যবান কিছু উপদেশ পেয়ে আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি।

কথা শেষের আগে তিনি বলেছিলেন ভালো গল্প পেলে আবারও অভিনয় করবেন। কিন্তু আজ তিনি আমাদের মাঝ থেকে বিদায় নিলেন। অভিনয়ে ফেরার স্বপ্ন অসমাপ্তই রয়ে গেলো। আমরাও আর পাবো না এমন এক অভিনেতাকে যিনি নিজের জন্য নয় বরং সাধারণ মানুষের জন্য অভিনয় করতেন। তিনি আমাদের মধ্যে সারাজীবন বেঁচে থাকবেন তার অসাধারণ কাজের মধ্যদিয়ে।

ইত্তেফাক/ইউবি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x