‘রেহানা মরিয়ম নূর’ নিয়ে মুখ খুললেন সাদ

‘রেহানা মরিয়ম নূর’ নিয়ে মুখ খুললেন সাদ
আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ। ছবি: সংগৃহীত

কান উৎসব। অফিসিয়াল সিলেকশন। আঁ সার্তে রিগা। আর কী লাগে! দেশের হয়ে প্রথমবার এই সম্মান অর্জনের পরও নিজেকে আলোকছটা থেকে সরিয়ে রেখেছেন আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ। কানের বাণিজ্যিক শাখা মার্শে দ্যু ফিল্ম কিংবা শর্ট ফিল্ম কর্নারে নিজের ছবি যুক্ত করতে পেরে খুশিতে এদিক-সেদিক বলে বেড়িয়েছেন বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন নির্মাতা। সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক উচ্ছ্বাস নিয়ে কথা বলেছেন তারা। অথচ অফিসিয়াল সিলেকশনে স্থান করে নেওয়ার পরও জনসমক্ষে আসছেন না ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ ছবির পরিচালক। কতদিন আর পারেন! অবশেষে নীরবতা ভাঙলেন তিনি।

গতকাল আমেরিকান সংবাদমাধ্যম ভ্যারাইটিতে ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ বিষয়ক একটি খবর প্রকাশিত হয়েছে। এতে জানানো হয়, আঁ সার্তে রিগায় নির্বাচিত ছবিটিকে বেছে নিলো জার্মানির ফিল্মস বুটিক। বার্লিনের এই প্রতিষ্ঠানটি ছবিটির বিশ্বব্যাপী স্বত্বের প্রতিনিধি হিসেবে থাকছে, খবরটা প্রযোজক রাজীব মহাজন গত ৩ জুন জানিয়ে দিয়েছিলেন। ভ্যারাইটিতে নতুন যা আছে তা হলো সাদের অনুভূতি। এরপর রাজীব মহাজনের সঙ্গে যোগাযোগের পর তিনি পরিচালকের বিবৃতি হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে দিয়েছেন। সেটি ভ্যারাইটিতে প্রকাশিত একই বক্তব্য।

বিবৃতিতে সাদ বলেছেন, ‘আমি মধ্যবিত্ত পরিবারে অনেক ভাইবোনের মাঝে বড় হয়েছি। আমার চিন্তাভাবনায় তাদের সবার অনেক প্রভাব। বিশেষ করে আমার তিন আপুর। সম্ভবত ওই রকম একটা জায়গা থেকে রেহানাকে নিয়ে লিখতে শুরু করি। একটু একটু করে রেহানাকে নিয়ে প্রশ্ন করতে শুরু করি। ওর ভেতরের ক্ষোভ আর অবিশ্বাস নিয়ে ভাবি। ওর ভেতরের কমপ্লেক্সিটি ও কন্ট্রাডিক্টরি আচরণ বোঝার চেষ্টা করি। রেহানা কী চায় এবং কেনো চায় তা নিয়ে লিখতে লিখতে ক্রমে আরো প্রশ্ন বের হতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত ওই প্রশ্নগুলোই আমাকে ছবিটি নির্মাণে অনুপ্রাণিত করে।’

কান চলচ্চিত্র উৎসবে অফিসিয়াল সিলেকশনে বাংলাদেশের প্রথম ছবি হিসেবে ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ আমন্ত্রিত হওয়ায় খুব খুশি ও সম্মানিত আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ। তার কথায়, ‘এই অর্জন পুরোপুরি আমার টিমের। সবাই মিলে অমানুষিক কষ্ট করেছে এবং সবাই সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়েছে। আমি কৃতজ্ঞ এই মেধাবী টিম ও আমার অভিনয়শিল্পীদের কাছে। তারা ছাড়া আমি কখনোই এতোটুকু আসতে পারতাম না।’

‘রেহানা মরিয়ম নূর’ প্রযোজনা করেছেন সিঙ্গাপুরের জেরেমি চুয়া। তিনি কানে নতুন কেউ নন। তার প্রযোজিত ‘অ্যা ইয়েলো বার্ড’ ২০১৬ সালে কানের প্যারালাল বিভাগ ইন্টারন্যাশনাল ক্রিটিক’স উইকে নির্বাচিত হয়।

জেরেমি চুয়ার প্রতিষ্ঠান পোটোকল ও বাংলাদেশের মেট্রো ভিডিওর ব্যানারে তৈরি হয়েছে ছবিটি। দোহা ফিল্ম ইনস্টিটিউটের পোস্ট প্রোডাকশন গ্র্যান্ট ২০২০ এবং বুসান এশিয়া সিনেমা ফান্ডের সহায়তা নিয়েছেন তারা। যৌথভাবে এটি প্রযোজনা করেছে বাংলাদেশের সেন্সমেকারস। সহযোগী প্রযোজনায় ফ্রান্সের জিরেল প্রোডাকশন। সহ-প্রযোজক হিসেবে কাজ করেছেন রাজিব মহাজন, সায়েদুল খন্দকার সবুজ ও আদনান হাবিব। নির্বাহী প্রযোজক এহসানুল হক বাবু ও সহযোগী প্রযোজক ইওহান শাপেলন।

‘রেহানা মরিয়ম নূর’ ছবির চিত্রনাট্য ও সম্পাদনা করেছেন আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ নিজেই। একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক রেহানা মরিয়ম নূরকে কেন্দ্র করেই এর গল্প। কর্মস্থলে ও পরিবারে তাল মেলাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয় তাকে। কারণ শিক্ষক, চিকিৎসক, বোন, কন্যা ও মা হিসেবে জটিল জীবনযাপন করেন তিনি। এক সন্ধ্যায় একজন অধ্যাপকের কক্ষ থেকে এক ছাত্রীকে কাঁদতে কাঁদতে বের হতে দেখে রেহানা। এ ঘটনার পর ক্রমে একরোখা হয়ে ওঠেন তিনি। ওই ছাত্রীর পক্ষ হয়ে সহকর্মীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে শুরু করে সে। কিন্তু একই সময়ে তার ছয় বছর বয়সী মেয়ের বিরুদ্ধে স্কুল থেকে রূঢ় আচরণের অভিযোগ ওঠে। অনড় রেহানা তথাকথিত নিয়মের বাইরে গিয়ে ভুক্তভোগী ছাত্রী ও নিজের মেয়ের জন্য ন্যায়বিচারের লড়াই করতে থাকে।

ভ্যারাইটিকে আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ প্রসঙ্গে ফিল্মস বুটিকের সিওও গ্যাবোর গ্রেইনার বলেন, ‘দুর্দান্ত অডিওভিজ্যুয়াল বানানো প্রতিভাবান একজন নির্মাতা সাদ। তার অসাধারণ ছবিটি যেন বাংলাদেশের সমকালীন শহুরে জীবন ও নারীর প্রতি সহিংসতার এক মনোমুগ্ধকর, চিন্তাশীল এবং হৃদয়ছোঁয়া কাব্য। দৃষ্টিনন্দন চিত্রগ্রহণ, সহজবোধ্য মনোভাব ও নিজেকে সম্পৃক্ত করার মতো প্রধান চরিত্রগুলোর সুবাদে বিশ্বব্যাপী দর্শকদের মন কাড়তে পারে ছবিটি। আমরা তার শিল্পকর্মকে আন্তর্জাতিক দর্শকদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সুযোগ পেয়ে গর্বিত।’

১ ঘণ্টা ৪৭ মিনিট ব্যাপ্তির ছবিটিতে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছেন আজমেরী হক বাঁধন। এছাড়া আছেন সাবেরী আলম, আফিয়া জাহিন জায়মা, আফিয়া তাবাসসুম বর্ণ, কাজী সামি হাসান, ইয়াছির আল হক, জোপারি লুই, ফারজানা বীথি, জাহেদ চৌধুরী মিঠু, খুশিয়ারা খুশবু অনি, অভ্রদিত চৌধুরী।

আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদের প্রথম ছবি ‘লাইভ ফ্রম ঢাকা’ ২০১৬ সালে সিঙ্গাপুর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা পরিচালক ও সেরা অভিনেতা (মোস্তফা মনোয়ার) পুরস্কার জেতে। এরপর এটি প্রদর্শিত হয় নেদারল্যান্ডসের রটারডাম ও সুইজারল্যান্ডের লোকার্নোর মতো বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসবে।

কানে বাংলাদেশ থেকে এর আগে প্রয়াত তারেক মাসুদের ‘মাটির ময়না’ ২০০২ সালে ডিরেক্টর’স ফোর্টনাইটে স্থান পেয়ে ফিপরেস্কি পুরস্কার জেতে। উৎসবটির আয়োজকদের স্বীকৃত প্যারালাল বিভাগ এটি। তবে ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ অফিসিয়াল সিলেকশনে জায়গা পেয়ে ইতিহাস গড়েছে।

ইত্তেফাক/বিএএফ

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x