ঢাকা শনিবার, ২০ জুলাই ২০১৯, ৫ শ্রাবণ ১৪২৬
৩১ °সে


এ সময়ের টিভি নাটক: শফিকুর রহমান শান্তনু

এ সময়ের টিভি নাটক: শফিকুর রহমান শান্তনু
ফাইল ছবি

আজকাল অনেক মানুষকে ঘন ঘন দীর্ঘশ্বাস ফেলে একটা কথা বলতে শুনি, আমাদের সময় ছিল আসল সময়! যাকে আমরা আদর করে হাত বুলিয়ে বলি, ‘গোল্ডেন টাইম’। আর এখন? কথায় আছে না, যায় দিন ভালো, আসে দিন... বাকিটা কি আর বলার দরকার আছে? নাটকের ক্ষেত্রেও তাই। আগে এত ভালো ভালো নাটক হইছে। এখন কই?

আমি হাসিমুখে (নাট্যকাররাও এক আধটু অভিনয় জানে। হাসি না এলেও মাঝেমধ্যে হাসি ঝুলিয়ে রাখতে হয় ঠোঁটের কোনে) জানতে চাই, আপনি শেষ কোন নাটকটা দেখেছেন?

আমি তো নাটকই দেখি না!

নাটক না দেখলে ভালো নাটক এখন হচ্ছে না, কিভাবে বুঝলেন?

আরে, এটা বোঝার জন্যে নাটক দেখা লাগে নাকি? চারপাশে লোকজনের কাছে শুনি না! তাছাড়া এত বিজ্ঞাপনের যন্ত্রনায় নাটক দেখা যায় নাকি?

তাহলে সমস্যাটা কোথায়? বিজ্ঞাপন না নাটকের মানহীনতা নাকি সময়ের দোষ?

সাধারনত এই পর্যায়ে এসে প্রশ্নকারী খুব বিরক্ত হন। কেউ কেউ বলে বসে, ঐ মিয়া, ইন্টারভিউ নিতেছেন? টাকা দিবেন?

আমি আর কথা বাড়াবার সাহস করি না। মনে পড়ে সেই ডাক্তারের কথা, সর্বঅঙ্গে ব্যথা, ঔষধ দেবো কোথা? আমাদের নাটকে হয়েছে সেই অবস্থা। আসলেই আমরা কি আমাদের সময়ের গল্পটা বলতে পারছি কিংবা এসময়ের বৈচিত্রতা তথা বিভিন্ন পেশাজীবি চরিত্রের সামাজিক, রাজনৈতিক, মানসিক, অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট, সম্পর্ক, মূল্যবোধ আমাদের নাটকে ধরা পড়ছে? ভেতরে একটা শংকা কাজ করে, আমরা ফর্মুলাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছি নাতো? ব্যক্তিগতভাবে আমি যখন কোন নতুন নাটক লিখি, (২৫০ এর ওপরে নাটক লেখা ও প্রচারেরর পরেও) আমার মনে হয়, আমি প্রথম নাটক লিখতে বসেছি। এটা দর্শক নেবে তো? এই প্রথম লিখতে বসার উপলব্ধির কারণটা হচ্ছে আমি সচেতনভাবে চেষ্টা করি, কোন ফর্মুলায় আবদ্ধ না হয়ে নিরীক্ষা করতে। সেটা হতে পারে, গল্প নিয়ে, চরিত্র নিয়ে, আমার অভিপ্রায় নিয়ে, এমন কি, ভাষা নিয়েও। কিন্তু এই নিরীক্ষার সযোগটা মনে হচ্ছে একটু সংকুচিত হয়ে আসছে।

আমাদের দেশে একটা রীতি চালু আছে, কোন বিশেষ ধরণের গল্প দর্শক পছন্দ করলে ঐ একই প্যাটার্নে আরো অনেকগুলো গল্প লেখা ও নাটক নির্মিত হয়। ধরি, কোন বিশেষ চরিত্রের নামে একটি নাটক দর্শক সাড়া পড়ল। সাথে সাথে অমুক চরিত্রের আদলে আশাবাদি আজিজ, মারাত্মক মারিয়া ধরণের গল্প দর্শকের পাতে পড়ে। একই খাবার (পোলাও মাংস হলেও) যেমন রোজ খেতে ভালো লাগে না তেমনি ফমুর্লা গল্প (যতই চাকচিক্যপূর্ণ হোক) বারবার দর্শনে দর্শকমনে বিরক্তি সৃষ্টি করাই স্বাভাবিক। আমাদের চারপাশে যেখানে প্রতিমুহূর্ত্তে হাজারো নাটকীয় গল্পের জন্ম হচ্ছে সেখানে আমরা কেন কিছু বহুল চর্চিত পুরনো গল্প ও চরিত্রের ছকে আটকে থাকবো? আমরা যখন সময়কে আটকাতে পারি না, তখন নাটকের গল্পকে গন্ডিবদ্ধ না করে স্বাধীন করে দেয়া জরুরি। সেদিন মজা করে বলছিলাম, মানুষ প্রশংসা করে ট্রাজেডির। কিন্তু পছন্দ করে রোমান্টিক কমেডি। রোমান্টিক কমেডি’র প্রতি আমার কোন আক্ষেপ নেই। কিন্তু যখন তা ভাঁড়ামির পর্যায়ে গিয়ে ক্যারিকেচারসর্বস্ব হয়ে ওঠে তখন চরিত্র হারায় তার বিশ্বাসযোগ্যতা আর গল্প হারায় তার সময়বোধ।

প্রযুক্তির জয়যাত্রায় আমাদের জীবন যেমন বেগবান হয়েছে, তেমনি অস্থিরতা ঢুকে পড়েছে আমাদের নাটকে। নাটক লিখতে, চরিত্রায়ন করতে, পরিচালনার মাধ্যমে দৃশ্যধারণ করতে - সবকিছুতেই একধরনের তাড়াহুড়ো। এক্ষেত্রে বাজেট একটি বড় কারণ। সবকিছুর দাম যেখানে উর্ধমুখি, সেখানে নাটকের দাম দিন দিন কমছে। কিন্তু আশা করা হচ্ছে, সবচেয়ে ভালোটা। তাহলে কি কম বাজেটে ভালো কাজ করা সম্ভব না? অবশ্যই সম্ভব, তবে সব গল্পের ক্ষেত্রে নয়। সময়কে বিনির্মাণ করার জন্যে গল্পের কিছু চাহিদা থাকে, সব চাহিদাকে রূপক সাংকেতিকভাবে বিশ্বাসযোগ্য করা যায় না, উচিতও না। বাজেটের কথা যখন উঠলই, আরেকটি অদ্ভুত সমস্যার কথা বলি। সমস্যাটা প্রথম ধরিয়ে দেয়, আমার মা। সন্ধ্যার পরে নিয়মিত বিভিন্ন চ্যানেলে নাটক দেখা তার রুটিন। রাতে যখন একসঙ্গে খেতে বসি, সেই নাটকগুলোর পোস্টমর্টেম হয়। পোস্টমর্টেম রিপোর্টের একটা কমন পয়েন্ট হচ্ছে - মাত্র দু’তিনজন শিল্পী নিয়ে নাটক শেষ! আসল ব্যাপার হচ্ছে, আজকাল নাটকে নায়ক বা নায়িকার দেখা পেলেও তাদের পরিবারের দেখা পাওয়া মুস্কিল। মনে হয়, তারা এলিয়েন বা এতিম হয়ে পৃথিবীতে এসেছে। কোন নাটকে সৌভাগ্যক্রমে মা থাকলে বাবা থাকে না। বোন থাকলে ভাই বাদ। অর্থাত্ যত কম শিল্পী ব্যবহার করা যায়! এই ফ্যামিলি প্ল্যানিংএর মূল কারণ আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এতে নষ্ট হচ্ছে নাটকের পারিবারিক আবহ। তবে অকারণে পরিবারের সবার উপস্থিতি দেখানোর আমি বিপক্ষে। চরিত্র জন্ম দেয়ার আগে ভাবা দরকার মানুষ করা যাবে কিনা!

নাট্যকারদের আড্ডায় একটা কথা প্রচলিত, অমুক অভিনেতাকে নিয়ে অমুক স্থানে স্ক্রীপ্ট লিখতে হবে। কোন বিশেষ শিল্পী ও স্থানকে মাথায় নিয়ে গল্প লেখা কষ্টকর না। তবে তাতে ভাবনার স্বাধীনতা ও সম্ভাবনা খর্ব হয়। যেখানে প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা ছিল, সমাজ ও সময়ের কোন ঘটনা (বা দুর্ঘটনাকে) কেন্দ্র করে একটা গল্প ভাবনা ও চরিত্র সৃষ্টির মধ্য দিয়ে এবং সেটা পূর্নাঙ্গ চিত্রনাট্য হওয়ার পরে চরিত্রানুযায়ী শিল্পী বাছাই করা। সেটা না করে আমরা প্রক্রিয়ার শেষ থেকে শুরুর দিকে যাচ্ছি। ফলে নাটকটা সময়ের প্রতিবিম্ব না হয়ে (কিছু ব্যতিক্রম বাদে) হয়ে উঠছে অভিনেতার প্রতিবিম্ব।

এরমধ্য দিয়েও আমি মনে করি, টিভি নাটকে আমরা যা বলতে চাই, তা পারছি। হয়তো প্রতিটি কাজের মধ্যে দিয়ে নয়, হাতে গোনা কিছু কাজ দিয়ে হলেও। নাটক যেহেতু একটা টীমওয়ার্ক, এখানে টীমের প্রত্যেক সদস্যের একটা দায়বদ্ধতা আছে। দায়বদ্ধতা তৈরি হয়, শিল্পসাহিত্যের বিষয়ভিত্তিক লেখা - পড়া, দেখা ও চর্চার সমন্বয়ে। সেই জায়গা থেকে আমরা নাট্যকাররা যদি ঠিক করি, সময়কে আমি যেভাবে দেখি, সেভাবে উপস্থাপন করবো, একজন পরিচালক যদি তার সময়ের গল্পটা দেখানোর তাগিদবোধ করেন, অভিনেতা যদি নিজের চরিত্রকে সচেতনভাবে ভুলে গিয়ে গল্পের চরিত্রকে উপলব্ধি ও ধারণ করেন, তাহলে আমার বিশ্বাস, আমাদের সময়ের সেরা টিভি নাটক আমাদের হাত দিয়েই বেরিয়ে আসবে।

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
২০ জুলাই, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন