মঙ্গল শোভাযাত্রার কথা

মঙ্গল শোভাযাত্রার কথা
ফাইল ছবি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন চারুকলা ইনস্টিটিউটের (বর্তমান চারুকলা অনুষদ) ১৯৮৬-৮৭ শিক্ষাবর্ষের কতিপয় শিক্ষার্থী-শিল্পী ১৯৮৯ সালে ঢাকা শহরে প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রার সূচনা করে। তখন সেটির নাম ছিল আনন্দ শোভাযাত্রা। এ গ্রুপটাই চার মাস আগে ১৯৮৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর প্রথম জয়নুল জন্মোৎসব শোভাযাত্রার মাধ্যমে পালন করে।

এই মহৎকর্মের একটি ব্যাকগ্রাউন্ড আছে। ১৯৮৮ সালে সারাদেশের ভয়াবহ বন্যা হয়। চারুকলা ইন্সটিটিউটের শিক্ষক শিল্পী নিসার হোসেন এবং শিল্পী আজিজ শরাফী স্যারের নেতৃত্বে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে ১৯৮৬-৮৭ বর্ষের ছাত্র-ছাত্রীরা ত্রাণ তৎপরতা চালায়। ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় বাসা থেকে কাপড়-চোপড়, টাকা- পয়সা, খাদ্যদ্রব্য সংগ্রহ করে বন্যা দুর্গতদের মধ্যে বিতরণ করে। তাদের সঙ্গে ৮৫-৮৬ ব্যাচ এবং ৮৭-৮৮ ব্যাচের কিছু ছাত্র-ছাত্রীরা অংশগ্রহণ করে। সেসময় ভিন্ন মতাবলম্বী কিছু সিনিয়র ছাত্র নিসার স্যারের বিরোধিতা করে এবং লাঞ্ছিত করে। এতে ক্ষুদ্ধ ৮৬-৮৭ শিক্ষাবর্ষের ছাত্রদের মধ্যে কয়েকজন নিসার স্যারের বাসায় দেখা করে এবং প্রতিশোধ নেওয়ার কথা বলে। কিন্তু নিসার স্যার ভালো কিছু করে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করার পরামর্শ দেন। তখন নিসার স্যারের বাবা ভাষা সৈনিক এমদাদ হোসেন যশোরের পৌষ মেলার প্রসঙ্গে কথা বলেন। সেই সূত্র ধরে সেখানে উপস্থিত মাস্টার্স ১ম পর্বের ছাত্র মাহাবুবজামাল শামীম ১৯৮৬ সালে যশোরের চারুপীঠে উদযাপিত পহেলা বৈশাখের র‌্যালির কথা বলেন এবং আগত শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের জন্মদিন উৎসবের মাধ্যমে পালন করার প্রস্তাব দেন।

১৯৮৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরে ৫/৬ দিন আগে চারুকলার ৮৬-৮৭ ব্যাচের সাখাওয়াৎ মাহাবুব, কামরুল, ফরিদ, হেলাল, মিঠু আলপ্তগীর তুষার প্রমুখ শিল্পী সাইদুল হক জুইসের সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলে। কিন্তু তিনি এত অল্প সময়ে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয় বলায় সাখাওয়াৎ সংকল্প করে। এবারই জন্মোৎসব পালন করা হবে। নিজেদের সামর্থ্যে এবং আয়োজনে বাঁশের চটা, পুরাতন খবরের কাগজ এবং গমের আঠা দিয়ে জিয়া হলের পাঁচ তলায় কাজ শুরু হয়। চারটি ঘোড়া অনেক মুখোশ এবং মুকুট, অনেকগুলো বিশাল আকারের পেনসিল, দুইটি বড় তুলি ও প্যালেট বানানো হয়। ২৯ তারিখ সকাল ৮টায় একটি ঢাকের শব্দের সাথে সাথে বকুলতলার পেছনের থিওরিরুম থেকে মাথায় গলায় ফেস্টুন ঝুলিয়ে হৈ হৈ করে একটি দল চারুকলা থেকে বের হয়ে টিএসসি এবং অপরাজেয় বাংলা ঘুরে চারুকলায় ফিরে আসে। যার বিরোধিতা করেছিল তারাও এই র‌্যালিতে অংশ নেয়। শোভাযাত্রা ব্যানারে নাম ছিল জয়নুল জন্মোৎসব ৮৮’। এই উৎসবে যারা প্রত্যক্ষভাবে কাজ করেছিল তারা হলো- মাহাবুব রহমান, সাওখাওয়াৎ হোসেন, ফরিদুল কাদের, কামরুল আহসান খান, শহীদ আহাম্মেদ মিঠু, এসএম ফারুকুজ্জান হেলাল, হানিফ তালুকদার কালাম, মনিরুজ্জামান শিপু, আহসান হাবীব, লিপু, আলপ্তগীন তুষার প্রমুখ।

পরে একদিন চারুকলার দোতলায় বারান্দায় ৮৬-৮৭ ব্যাচের সেইসব ছাত্র-ছাত্রী এবং ৮৭-৮৮ ব্যাচের কয়েকজন মাহাবুব জামাল শামীম, শিল্পী তরুণ ঘোষ, কাঞ্চন ভাই প্রমুখ শিল্পীগণ ৮৯ এর পহেলা বৈশাখের উদযাপন করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

প্রথম সেই র‌্যালির নাম ছিল আনন্দ শোভাযাত্রা। প্রচারের জন্য এর পোস্টার ডিজাইন করেছিল তরুণ ঘোষ। সেই সময় সোনারগাঁওয়ের লোকজ হাতির পাশাপাশি ১০টি ঘোড়া বানানো হয়েছিল। বাঁশের চটা দিয়ে এবং তার উপর পাতলা চট দিয়ে আবৃত করা হয়। চটের উপর পুরু করে খবরের কাগজ লাগিয়ে রং করা হয়।

বানানোর মূল দায়িত্ব ছিল মাহাবুবের। ৫০টিরও বেশি মুখোশ অসংখ্য মুকুট বানানো হয়েছিল। শিল্পী তরুণ ঘোষ এবং শিল্পী শিশির ভট্টাচার্যের সঙ্গে মুখোশ ডেকোরেশন অংশ নিয়েছিল ৮৬-৮৭ ব্যাচের ছাত্র-ছাত্রীরাও। এ সময় মাহাবুব জামাল শামীম এবং ফজলুর রহমান কাঞ্চনের বিশেষ ভূমিকা ছিল। সকাল ৮টায় ঢাকে বাড়ি মেরে র‌্যালির উদ্বোধন করেন সাংবাদিক ফয়েজ আহম্মেদ।

স্বৈরাচারী শাসকের পতনের পর ৯০ ও ৯১ সালেও মঙ্গল শোভাযাত্রার মাধ্যমে পহেলা বৈশাখ উদযাপন করা। ৯১ সালে দুটি মুভিং ডেকোরেটিভ কচ্ছপ বানিয়েছিল। আলপ্তগীর তুষার এবং মোহাম্মদ আলী পাপ্পু মিলে। প্রথম পহেলা বৈশাখ যারা প্রত্যেকে কাজ করেছিল তারা হলো ৮৬-৮৭ ব্যাচের মাহাবুর রহমান, সাখাওয়াৎ হোসেন, কামরুল হাসান খান, ফরিদুল কাদের, হানিফ তালুকদার, আহসান হাবীব লিপু, মনিরুজ্জামান শিপু, সালেহ মাহমুদ, হালিমুল ইসলাম খোকন, আলপ্তগীন তুষার, অনিতা ইসলাম, তৈয়বা বেগম লিপি, মিলি। নতুন ১ম বর্ষের শোভা, লাভলী চাকমা, আমিনুল ইসলাম লিটু, আদিব সাঈদ শিপু। সিনিয়রদের মধ্যে ছিলেন মাহাবুব জামাল শামীম ফজলুর রহমান কাঞ্চন, সাইদুল হক জুইস শিল্পী তরুণ ঘোষ প্রমুখ।

বাংলা ১৪০০ সালে (১৯৯৩ইং) ব্যাপক আকারে বিশাল আয়োজন শোভাযাত্রা করা হয়। আনন্দ শোভাযাত্রা নাম পরিবর্তন করে সঙ্গীতশিল্পী ওয়াহিদুল হক এবং ভাষা সৈনিক এমদাদ হোসেনের প্রস্তাবে মঙ্গল শোভাযাত্রা রাখা হয়।। আগের শোভাযাত্রাগুলো শুধু ছাত্র-ছাত্রী এবং জুনিয়র শিক্ষকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এবার সকল শিক্ষক এবং বুদ্ধিজীবীরাও এতে অংশ গ্রহণ করেন। চারুশিল্পী সংসদের সভাপতি শিল্পী রফিকুন নবী আহ্বায়ক হিসেবে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের আহ্বান করেন।

এ সময় যারা সহযোগিতা করেন তারা হলেন -ভাষা সৈনিক এমদাদ হোসেন, কামাল লোহানী মহিউদ্দিন আলমগীর, কেরামত মাওলা, মামু নূর রশীদ, আসাদুজ্জামান নূর, সানজিদা খাতুন, আক্কু চৌধুরী প্রমুখ। বিভিন্ন ফোক আইটেম বানানো এবং র‌্যালি বাস্তবায়ন করার মূল দায়িত্ব ছিল ৮৬-৮৭ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র-ছাত্রীদের উপর। ১৯৯৫ সালে পর্যন্ত এরাই মূল উদ্যোগী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয় ২০০৮ সালে উপাচার্য অধ্যাপক আবু ইউসুফ স্যারের সময়। একটি বড় বাঘ ও বক, অনেকগুলো ঘোড়া এবং মুখোশ বানানোর দায়িত্ব ছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের শিক্ষক আলপ্তগীন তুষারের উপর। যা ছিল তার ঢাকা চারুকলার অভিজ্ঞতার ফসল।

ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয় ২০১৪ সালে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমানের নেতৃত্বে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে একটি সংস্কৃতিকে বলয় তৈরির জন্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে কাজ করে যাচ্ছেন। সেই লক্ষ্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগ খুলে আলপ্তগীন তুষারকে চট্টগ্রাম থেকে এনে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের চেয়ারম্যান দায়িত্ব অর্পণ করেন। ২০১৫ সালে পরাক্রমশালীতার প্রতীক হিসেবে বড় একটি হাতি বানানো হয়েছিল। এসব তৈরির মূল দায়িত্ব পালন করেন আলপ্তগীন তুষার। নিসার স্যারের সেই উপদেশ তোমার এমন কিছু কর যাতে দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়। তার ছাত্ররা অত্যন্ত সততার সঙ্গেই সেই দায়িত্ব পালন করেছে। পরবর্তী প্রজন্ম এটাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এভাবে মঙ্গল শোভাযাত্রা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ অসাম্প্রদায়িক উৎসব হিসেবে।

লেখক : শিক্ষাবিদ।

ইত্তেফাক/ইউবি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x