উদ্ভিদ বাঁশ

উদ্ভিদ বাঁশ
ছবি: ইত্তেফাক

চীনা সভ্যতায় বাঁশ শুভশক্তির প্রতীক। বাড়ির আশেপাশে বাঁশগাছ লাগানো তাদের ঐতিহ্য। বাঙালির জীবনে বাঁশ বহুবিধ কাজে লাগে। বাঁশের কুটিরশিল্প ঘরের শোভা। সুতা এবং কাগজ তৈরিতে বাঁশের ব্যবহার অনেক আগে থেকে। বাঁশের তৈরি বিভিন্ন জিনিস বিদেশে রপ্তানি হয়।

বাঁশের পাতা ঘরের ছাউনি হয়। আবার বাঁশের পাতা উত্তম গোখাদ্য। ঝড়-ঝঞ্ঝা থেকেও বাঁশ রক্ষা করে। বসতবাড়ির পাশে তাই বাঁশঝাড় দেখা যায়। পার্বত্য অঞ্চলের মানুষ বাঁশ রান্না করে খায়। সে খাবার বেশ মুখরোচক। চীন, থাইল্যান্ড ও মিয়ানমারে বাঁশের সবজি খুব জনপ্রিয়।

চাঁদপুর, সিলেট ও কুমিল্লাসহ বিভিন্ন স্থানে বাঁশের বাণিজ্যিক আবাদ হচ্ছে। চাহিদা প্রচুর। শুধু নির্মাণকাজে শত শত টন বাঁশ প্রয়োজন হয়। কাটিং পদ্ধতিতে খুব সহজেই বাঁশের চারা সংগ্রহ সম্ভব। মাঝে মধ্যে পানি দেওয়া—একটুকুই বাঁশের পরিচর্যা। দু-এক প্রজাতির বাঁশগাছে আগা মরা রোগ হয়। পৃথিবীতে ৩০০ প্রজাতির বাঁশ রয়েছে, তার মধ্যে বাংলাদেশে আছে ৩৩ প্রজাতি—হলোমুলী, মিতিয়া, ছড়ি, আইক্কা, বাইজা, বররা, মাকাল, তল্লাবাঁশ উল্লেখযোগ্য।

বাঁশগাছে ফল ধরে না। ফুল হয় কদাচিত্। বহুদিন পরপর। ১০ থেকে ১২০ বছরের চক্রে ফুল আসতে পারে। বাঁশের অধিকাংশ প্রজাতি ফুল দেওয়ার পরে মারা যায়। বাঁশ হলো ঘাস জাতীয় উদ্ভিদ। বাসা-বাড়ির কাজে বাঁশের ব্যাপক ব্যবহারের কারণে একে ‘গরিবের দারুবৃক্ষ’ বলা হয়। পৃথিবীর অনেক দেশে বাঁশকে বলা হয় মিরাকল প্লান্ট।

হাজারটা উপকার করলেও বাঁশ বড় অবহেলিত। নেতিবাচক উপমা হিসেবে বাঁশ ব্যবহার করা হয়। কেউ কারো ক্ষতি করলে বলা হয়—ওমুক তমুককে বাঁশ দিল। বাঁশঝাড়ে ভূত-পেতনি আছে—এমনটা বলে বাচ্চাদের ভয় দেখানো হয়। বাতাসে বাঁশঝাড়ে শো শো শব্দ হয়। মূলত পাতার সঙ্গে পাতার লেগে যাওয়ায় এমনটা হয়। প্রকৃত অর্থে বাঁশ খুব নিরীহ প্রকৃতির উদ্ভিদ। বাঁশ প্রচুর অক্সিজেন সরবরাহ করে। মানবজীবন, পরিবেশ, প্রকৃতি রক্ষায় বাঁশের অবদান বলে শেষ করা যাবে না।

বাঁশের ঘর ভূমিকম্প সহনীয়। জাপানে প্রচুর বাঁশের ঘর দেখা যায়। বিশ্বের প্রায় এক বিলিয়ন মানুষ বাঁশের ঘরে বসবাস করে। বৈদ্যুতিক বাল্বের আলোয় আলোকিত ঘরদোর। এই বৈদ্যুতিক বাল্ব অবিষ্কারের নেপথ্যে বাঁশের অবদান আছে। টমাস আলভা এডিসন প্রথম বৈদ্যুতিক বাতির মধ্যে বাঁশের ফিলামেন্ট ব্যবহার করেন। ১৯৪২ সালের কথা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। ইংরেজদের মনে আশঙ্কা হলো—জার্মানি, জাপান তাজমহলের ওপর বোমা বর্ষণ করতে পারে। তাই তারা বুদ্ধি করে বাঁশের ছাউনি দিয়ে তাজমহলের চূড়া ঢেকে দিয়েছিল।

ঝড়ের সময় বাঁশগাছের মাথা নুয়ে পড়া আবার উঠে যাওয়া কতই না সুন্দর দৃশ্য! বনকাক, বুলবুলি, শালিক, ফিঙে পাখির নিরাপদ আশ্রয় বাঁশঝাড়। কাঠবিড়ালি, ইঁদুর, গিরগিটি, মাকড়সা, পিঁপড়া, কিছু সাপ বাঁশঝাড়ে বাসা বাঁধতে পছন্দ করে। গোয়ালে লতা-গুলঞ্চের মতো কিছু উদ্ভিদ বাঁশঝাড়ে জন্মায়। এসব কারণে জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বাঁশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। রোধ করে ভূমিধসও।

বাঁশের বাঁশির সুর তুলনাহীন। প্রখ্যাত বংশীবাদক বারী সিদ্দিকী বাঁশের বাঁশি বাজিয়ে সারা বিশ্বকে মুগ্ধ করেছেন। ১৯৯৯ সালে বিশ্ব্ব বাঁশি সম্মেলনে তিনি অংশ নেন। দরদ মাখানো কণ্ঠে গেয়েছেন—‘আমার অনেক বাঁশের বাঁশি আছে, মিছে কেন কিনবি চাটাই-বাঁশ’।

ইত্তেফাক/কেকে

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x