প্রকৃতি

বউন্না

বউন্না
বউন্না গাছ [ছবি: ইত্তেফাক]

কখনো কখনো মানুষ নিজেই নিজের কাছে জিতে যায়। তখন নিজের ওপর আস্থা বেড়ে যায়। আমার বসবাস সবুজবাগ থানাধীন দক্ষিণগাঁও মৌজায় কুসুমবাগ এলাকায়। এখনো এখানে জনবসতি গিজগিজ করে গড়ে ওঠেনি, এখনো কিছু খানাখন্দ আছে, ঝিলের মতো দেখতে জলাশয় আছে, অল্প স্বল্প বুনো গাছ লতাপাতা এখনো অবশিষ্ট আছে।

একদিন বারান্দায় বসে দূরে একটি গাছ দেখতে পাই, মনে হয় গাছটি বউন্না ফুলের, আবার কখনো মনে হয় হয়তো কুরচি। বৈশাখ এসে গেল, এখন তো কুরচি ফুল ফোটার সময়। তবে বউন্নাই হবে বলে মন সায় দিল। ইচ্ছে হলো একদিন কাছ থেকে গাছটা দেখে আসব। নেমে পড়লাম। কাছে গিয়ে দেখি বউন্না ফুল, অনুমান ঠিক হওয়ায় নিজেই নিজেকে বাহবা দিলাম। তবে ফুলগুলো নিষ্প্রভ, ফুল মরে আসছে যেন, ডালে ডালে ছোট ছোট ফল যেন পুটলিতে জড়ানো শিশুর মতো বিপন্ন বিস্ময়ে পৃথিবী দেখছে। বুনোফুলের মধ্য বউন্না এবং ভাঁট-এর সৌন্দর্যে আমি যতবার দেখি ততবার দিশেহারা হয়ে যাই।

বউন্না গাছ জল ভালোবাসে। জলের কাছেই বরাবর তার বসবাস। গাছ জল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকে আর ফুলগুলোকে মনে হয় চোখধাঁধানো ঝাড়বাতির মতো। গাছটাকে হয়তো অচিরেই কেউ কেটে ফেলবে। এ গাছ তো তেমন কোনো কাজে লাগে না। কারে বলব প্রয়োজনই সব নয়। গাছটিকে কাটবেন না পি­জ। ঢাকা শহরে হয়তো আর কোনো বউন্না গাছ নেই।

গাছটি দেখে আমার মনোভূমে আঁকা অনেক দিন আগের এক চিত্রপট ভেসে উঠল। চৈত্রের গরমে যখন হাসফাঁস অবস্থা, কোথাও বৃষ্টির দেখা নেই, তেমন দিনে ছোট্টবেলায় আমাদের বাড়ির পাশের শীর্ণ খাল জোয়ারের নতুন পানিতে ভরে যেত, ছোট বড় কুয়াগুলো পানিতে ভরে যেত, নুয়ে পড়া বউন্নার ডালপালা ছুঁয়ে ফেলত নতুন পানি। পানি দেখে আমার মতো বউন্না গাছেরও কী আনন্দ, হলদে শাদা, ঝকঝকে সাদা মুক্তোর মতো দাঁত ছড়িয়ে হেসে গড়িয়ে পড়তে চাইত নতুন জোয়ারের পানিতে। আমি তো দূর থেকে দৌড়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়তাম নব ধারাজলে। আমার নানু বলত নতুন পানিতে ডুবাইস না, জ্বর আইবো। কে শোনে কার কথা। আমি এলোপাথাড়ি ডুবিয়ে চলেছি জলে।

আজ নানু বহু দূর পরবাসে, সেখানে কেবল যাওয়া আছে, ফিরে আসা নাই। আমার সেই গ্রামের বাড়ি, সেই শীর্ণ খাল, শুষ্ক চৈত্রের বিল, কচি ধানের চারার ওপর ঢেউ খেলে যাওয়া বাতাস, সেই বউন্না ফুলের গাছ, কিছু নেই, সেসবই আজ মাঝ দরিয়ার বুকে বিলীন হয়ে গেছে। নদীটির নাম জয়ন্তী, বাড়িটির নাম আহন বাড়ি। এই আমি আছি, আমার মতো আরো অনেকেই আছি ফসিলের মতো স্মৃতিচিহ্ন বুকে নিয়ে। তাই বউন্না ফুল দেখলেই আমার ভিতরে কেমন যেন এক দিশেহারা অনুভব হয়। বউন্না ফুল তোমরা টিকে থেকো এই বাংলায়, রঙিন করে দিয়ো নতুন কোনো কিশোরীর মন।

ইত্তেফাক/এমআর

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x