‘লকডাউনকালেও প্রতিষ্ঠানে সন্তান প্রসব করাতে হবে’

‘লকডাউনকালেও প্রতিষ্ঠানে সন্তান প্রসব করাতে হবে’
প্রতীকী ছবি। ছবি: সংগৃহীত

গত বছর যখন লকডাউন শুরু হয়, তখন অনেক গর্ভবতী ও প্রসূতি মা বাড়িতে সন্তান প্রসব করেন। সেটা একটা অবস্থা ছিল, যখন আমাদের স্বাভাবিক স্বাস্থ্যসেবা অনেকাংশে ব্যাহত হয়। প্রয়োজনের সময় মানুষ চিকিৎসা পায়নি।

এ সময় বাড়িতে প্রসবের বিষয়ে এমনও অনেকে বলেন, যে এখন সিজারের হাত থেকে বাঁচা গেল। কিন্তু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলছেন, কোনোভাবেই বাড়িতে নিরাপদভাবে প্রসব সম্ভব নয়। তাই লকডাউন হলেও বাড়িতে নয়, বরং চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানে সন্তান প্রসব করাতে হবে। কারণ প্রসবকালীন যে কোনো সময় যে কোনো গুরুতর অবস্থা হতে পারে, যাতে মা ও নবজাতক উভয়ে ঝুঁকিতে পরতে পারে। এ বিষয় জানান আদ-দ্বীন মহিলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. বনিকা বিশ্বাস। তার সঙ্গে কথা বলেছেন রাবেয়া বেবী

লকডাউনে গর্ভবতী মায়েদের কোন বিষয় সতর্ক হওয়া প্রয়োজন?

আমরা করোনাকালে গর্ভবতী হওয়াকে উত্সাহিত করি না। যদি কারো সুযোগ থাকে, সে যেন এই সময়ে সন্তান ধারণ না করেন। কিন্তু আমরা দেখছি, বিষয়টি খুব একটা আমলে নেওয়া হয় না। এই সময়ে আমাদের কাছে নতুন দম্পতি আসেন, তারা সন্তান চান। কিন্তু তারা চাইলে কিছুদিন সময় নিতে পারেন। এমন রোগীকে প্রশ্ন করে জানা যায়, পরিবার চায় এখনই সন্তান। আবার যাদের আগের সন্তান আছে, এই মুহূর্তে সন্তান না নিলেও চলে, তেমন রোগীও এই সময়ে গর্ভবতী হচ্ছেন। কী আর করার, তাদের চিকিত্সা করি!

এই সময়ে আপনারা তাদের কীভাবে চেকআপ করেন?

করোনাকালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গর্ভবতী মায়েদের একটি চেকআপ রুটিন করে দিয়েছে, যা চারটি ভিজিটের। আমরা তা অনুসরণ করি। অর্থাত্, করোনাকালে গর্ভবতী মা প্রতি মাসে নয়, বরং মোট চার বার ডাক্তার দেখাবেন। যদি কোনো জটিলতা হয়, তখন তিনি বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের কাছে যাবেন। প্রথম চেকআপ হবে ১৬ সপ্তাহের মধ্যে। দ্বিতীয় ২৪ থেকে ৩২ সপ্তাহে। ৩৬ সপ্তাহে একটা এবং শেষের চেকআপ। এই চেকআপের মধ্যে তিনি তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা যা লাগবে তা করিয়ে ফেলবেন। জটিলতা না থাকলে খুব বেশি পরীক্ষা নিরীক্ষা লাগে না। যেমন- প্রথম পর্যায়ে আমরা কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করি। কারো পরিবারিক ডায়াবেটিস, হাইপ্রেশার থাকলে ২২-২৪ সপ্তাহের দিকে বাচ্চার ত্রুটি আছে কি না, তা পরীক্ষা করি। আবার শেষে গিয়ে পানির পরিমাণ ও বাচ্চার বৃদ্ধি ঠিক আছে কি না, তা পরীক্ষা করি।

এই সময়ে রোগী তত্ক্ষণাত প্রয়োজন হলে কী ব্যবস্থা নিতে পারেন?

এই সময়ে রোগী যে ডাক্তার দেখাবেন, তার সঙ্গে টেলিমেডিসিন সেবা নিতে পারেন। কোনো সমস্যা হলে ডাক্তারকে ফোন করে সে বিষয় পরামর্শ নেওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে।

গত লকডাউনের সময় বাড়িতে অনেক প্রসব হয়েছে। আমরা দেখছি, এই সময়ে প্রসূতি মায়ের অপারেশনও অনেক কমে গেছে। এটাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

প্রথমই বলব, বাড়িতে কোনো অবস্থায় প্রসব হওয়া উচিত নয়। কারণ বেশির ভাগ বাড়িতে অপ্রশিক্ষিত ব্যক্তিরা প্রসব করান। বয়স, শারীরিক অবস্থা, বাচ্চার অবস্থান- সবকিছু ঠিক থাকলে বাড়িতে সহজেই হয়তো প্রসব হয়ে যায়, কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই একটা দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা দেখা দেয়। আমি নিজেই দেখেছি খলি হাতে প্রসব করাতে। হাতে কোনো গ্লাভস পরা থাকে না। এতে রোগীর তলপেটে একটা ব্যথা দেখা দেয়। ইনফেকশনের ভাবও হয়। সারা জীবন তার এই ব্যথা থাকে। বাসায় প্রসবের আর একটি কমন সমস্যা পিপিএইচ, অর্থাত্ প্রোস প্রটাম হেমোরেজ। এই সমস্যায় ফুলটাকে টানাটানি করে বের করতে গিয়ে অনেক রক্তক্ষরণ হয়। আমরা প্রসবের সঙ্গে সঙ্গে একটা ওষুধ দিই, যেন রক্তক্ষরণ না হয়। বাড়িতে তা দেওয়া হয় না। প্রসব সকালে হয়েছে, রাত অবধি রক্তক্ষরণ হচ্ছে, তখন আমাদের কাছে আসে। তাদের প্রশ্ন করলে সব সময় বলে, সিস্টার কিংবা ডাক্তার বাসায় প্রসব করিয়েছেন। কিন্তু কথা ঠিক নয়। অপ্রশিক্ষিত ব্যক্তিই প্রসব করান। এতে রোগী মারাও যান। বাড়িতে প্রসব কারানোর আর একটা সমস্যা হলো, অনেক সময় ব্যথা বাড়ানোর ওষুধ বেশি দেয়। কিন্তু বাচ্চা সেভাবে প্রসবদ্বারে আসে না। এতে বাচ্চা-মা দুজনই ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যান। টানাটানি করতে গিয়ে অনেক সময় ক্ষত সৃষ্টি করে ফেলে। আবার প্রসবপথ আর মলপথ এক হয়ে যায়। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এই খতগুলো সারাতে হয়।

কী করা উচিত? মা ও শিশু কার অসচেতনতার কারণে ঝুঁকিতে পড়ছে?

একজন স্বামীর দায়িত্ব স্ত্রীর নিরাপদ প্রসব নিশ্চিত করা। সব রোগী চায় তার প্রসব প্রতিষ্ঠানে হোক, নিরাপদে হোক। রোগীর বয়স কম হলেও সে এক্ষেত্রে কথা বলে। কিন্তু কেউ তার কথা শোনে না। যখন সে কষ্ট পায়, তখনো বলে। স্বামীর বোঝা উচিত, মা-শাশুড়ি আগের মানুষ, তাদের সময়ে একরকম দেখেছেন। কিন্তু এখন সময় বদলেছে, এটা তাদের বোঝানোর দায়িত্বটা স্বামীর। সামাজিক প্রেক্ষাপটেই এই ঘটনাগুলো আজও শিক্ষিত পরিবারেও ঘটে চলেছে। এরকম রোগী এলে আমাদের বলে, আমি হাসপাতালে আসতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আমার কথা কেউ শোনেনি। সবারই রোগীর কথা আগে শোনা উচিত।

ইত্তেফাক/এসজেড

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x