সরেজমিন মির্জাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স

ভূতুড়ে পরিবেশ হাসপাতালে

ফাঁকা শয্যায় আয়েশ করে পোষা প্রাণী
ভূতুড়ে পরিবেশ হাসপাতালে
মির্জাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অধিকাংশ শয্যা ফাঁকা। এতে পোষা প্রাণীরা করছে আরাম-আয়েশ। মঙ্গলবার তোলা ছবি তুলেছেন সামসুল হায়দার বাদশা

টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা সেবা নেওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন রোগীরা। গত রবিবার ইত্তেফাকের এই প্রতিনিধি সরেজমিনে গিয়ে দেখতে পান, হাসপাতালে ভূতুড়ে পরিবেশ বিরাজ করছে। চারদিকে অন্ধকার। ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ময়লা-আবর্জনা। হাসপাতালের অধিকাংশ বেডই খালি। কয়েকটি বেডের উপরে শুয়ে আছে পোষাপ্রাণী। ফাঁকা শয্যায় তারা আয়েশ করছে। যে এলাকায় হাসপাতালটি অবস্থিত সেই এলাকাটি সুন্দর। তবে হাসপাতালের ভিতরে ঢুকলে কারোরই বিশ্বাস হবে না যে, এটি একটি সরকারি হাসপাতাল। ওয়ার্ডে ও রোগীর বিছানায় পোষাপ্রাণী বিচরণ করলেও দেখার যেন কেউ নেই। হাসপাতালের মেঝেতে বিড়ালের মলসহ নোংরা আবর্জনা ও দুর্গন্ধময় পরিবেশ বিরাজ করছে।

মির্জাপুর উপজেলায় ৪ লাখ ৭৫ হাজার মানুষের বসবাস। এই উপজেলায় ১৩টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা আছে। হেলথ কমিউনিটি ক্লিনিক আছে ৫৪টি। ১৩টি ইউনিয়নের মধ্যে ৫টিতে উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র আছে। বাকি ৮টি ইউনিয়নে উপ স্বাস্থ্য কেন্দ্রের স্থাপনাই নেই। এসব ইউনিয়নের মানুষ স্বাস্থ্য সেবা থেকে বঞ্চিত। ৩১ শয্যা বিশিষ্ট মির্জাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৪ জন কনসালটেন্ট পদের মধ্যে মাত্র একজন গাইনি কনসালটেন্ট আছেন। হাসপাতালে মাত্র দুই জন মেডিক্যাল অফিসার আছে। এরমধ্যে একজন প্রেষণে আছেন।

রবিবার দুপুর ২টার দিকে ইত্তেফাকের এই প্রতিনিধি যখন মির্জাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে যান দেখেন, জরুরি বিভাগে একজন উপ স্বাস্থ্য কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার ও একজন চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী আছেন। পরবর্তীতে দোতলায় গিয়ে মাত্র দুই তিনজন নার্সের দেখা মেলে।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্বাস্থ্য সহকারী পদ আছে ৫৯টি। এরমধ্যে ২৯টি পদ শূন্য। ডাক্তারসহ সব মিলিয়ে ৫৪টি পদ খালি। এক্সরে-ইসিজি পরীক্ষা চালু থাকলেও অপারেশন করা বন্ধ রয়েছে। মাঝে মধ্যে অন্য কোথাও থেকে এনেসথেসিওলজিস্ট এনে শুধুমাত্র সিজারিয়ান অপারেশন করা হয়। অধিকাংশ বেড খালি। অথচ করোনার এই সময়ে এই হাসপাতালে রোগীতে ভরে থাকার কথা ছিল। কারণ মির্জাপুরে করোনা শনাক্তের হার ৫২ ভাগ। চিকিৎসা সেবা না পাওয়ার কারণে রোগীরা এই হাসপাতালে আসেন না। এই হাসপাতালে করোনা রোগীদের জন্য আইসোলেশন বেড আছে ৫টি। একজন রোগীও সেখানে নেই। এছাড়া হাসপাতালের বিছানা ও পরিবেশ এমন অবস্থায় রয়েছে একজন সুস্থ মানুষও হাসপাতালে এসে অসুস্থ হয়ে পড়ে বলে রোগীর স্বজনরা জানিয়েছেন। এদিকে রোগীদের সরবরাহ করা খাবার নিয়েও দুর্নীতির অভিযোগ আছে। রোগীদের অনেকেই হাসপাতালের খাবার খান না। এছাড়া রোগী ৩ জন থাকলে দেখানো হয় ১৫ জন।

রোগীরা বলেন, হাসপাতাল থেকে দেওয়া খাবার খুবই নিম্নমানের। এই খাবার মুখেই নেওয়া যায় না। তাই বাইরে থেকে খাবার এনে খান।

কর্মরত চিকিৎসকরা বলেন, আমরা সার্ভিস দিতে প্রস্তুত। কিন্তু হাসপাতালে জনবলের তীব্র সংকট। বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ও সিভিল সার্জনের কাছে জনবল চাওয়া হলেও দেওয়া হয় না। মন্ত্রণালয়ে গেলে দুর্ব্যবহার করা হয়। অথচ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ইউনিয়ন পর্যায়ের উপ স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও ওয়ার্ড পর্যায়ের হেলথ কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে জনবল সংকট না থাকলে করোনাসহ সব চিকিৎসা মানুষ হাতের কাছে পেতো। ১০০ জন রোগীর মধ্যে মাত্র ৫ থেকে ১০ জন রোগীর জেলা সদর হাসপাতালে যাওয়া লাগতো।

মির্জাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা ডা. মাকসুদা খানম বলেন, হাসপাতালে অন্ধকার আছে, কারণ পর্যাপ্ত লাইট নেই। ময়লা-আবর্জনার বিষয়ে তিনি বলেন, টাইলস না থাকায় ময়লা মনে হয়।

তিনি বলেন, জনবল সংকট আছে। আটটি ইউনিয়ন পর্যায়ের উপ স্বাস্থ্য কেন্দ্রের স্থাপনা নেই, কিন্তু ডাক্তার আছে। এসব ডাক্তার দিয়েই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হয়। নির্ধারিত মেডিক্যাল অফিসার আছেন মাত্র একজন।

ডা. মাকসুদা খানম বলেন, জনসাধারণের কাছে আমার মোবাইল নম্বর দেওয়া আছে। কারোর করোনার উপসর্গ দেখা দিলে সাথে সাথে আমার সাথে যোগাযোগ করতে বলা আছে।

ইত্তেফাক/বিএএফ

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x