বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল

চিকিৎসাসেবার মান বাড়েনি ৫৫ বছরেও

কাগজে-কলমে ১ হাজার বেড রোগী থাকে প্রায় ২ হাজার
চিকিৎসাসেবার মান বাড়েনি ৫৫ বছরেও
শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডের শয্যা পূর্ণ। তাই বারান্দায় মেঝেতে দেওয়া হচ্ছে রোগীদের চিকিৎসাসেবা। ছবি: ফারুক লিটু

৫৫ বছরেও দক্ষিণাঞ্চলের একমাত্র বিশেষায়িত বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালে চিকিৎসসেবার মান বাড়েনি। বরং সব ক্ষেত্রে তীব্র সংকটের মুখে বর্তমানে করোনায় আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে ঘটছে মানবিক বিপর্যয়। ১৯৬৮ সালে ৩৬০ বেড নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও পরে কাগজ কলমে ৫০০ থেকে ১ হাজার বেডে উন্নীত হলেও রোগী ভর্তি থাকে প্রায় ২ হাজার। অথচ ৩৬০ বেড অনুসারে ২২৪টি চিকিৎসক পদের অনুকূলে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৯৯ জন। সেখানকার ১২৫টি পদই শূন্য রয়েছে।

এছাড়াও হাজার বেড অনুযায়ী অন্যান্য পদে জনবল রয়েছে ৪ ভাগের ১ ভাগ। এ তীব্র সংকটের মধ্যেই গত বছর করোনা সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর শেবাচিম হাসপাতালের নির্মাণকাজ অসম্পূর্ণ হওয়া ৫তলা ভবনে চালু করা হয় করোনা ইউনিট এবং সেই ভবনটি করোনা ইউনিট হিসেবেই পরিচিতি পায়।

প্রথমে ১০ বেড, এর পরে ১০০ এবং সর্বশেষ সোমবার এই বেডসংখ্যা ৩০০তে রূপান্তরিত করা হলেও সব বেড পূর্ণ হয়ে রোগী আসতে থাকায় মানবিক বিপর্যয় নেমে এসেছে। হাসপাতাল থেকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এদিন বিকালে করোনা ওয়ার্ডের ৩০০ বেডের অনুকূলে রোগী ভর্তি ছিল ৩২৫ জন। মুমূর্ষু রোগীদের আইসিইউর জন্য হাহাকার চলছে। মাত্র ২২টি আইসিইউর সবগুলোতেই মুমূর্ষু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ৩০০ বেড ছাড়িয়ে যাওয়ায় করোনা ও আইসোলেশন ওয়ার্ডের যত্রতত্র থাকতে হচ্ছে রোগীদের।

হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার সঙ্গে জড়িতরা জানান, করোনা ওয়ার্ডের সর্বত্রই রোগী ও তাদের সঙ্গে থাকা স্বজনরা অবস্থান করায় করোনা আরো বিস্তার হচ্ছে। করোনা ও আইসোলেশন ওয়ার্ডের মুমূর্ষু রোগীদের অনেকেই আইসিইউর অভাবে মারা যাচ্ছে। হাসপাতালের পরিচালক ডা. সাইফুল ইসলাম ইতিমধ্যে বিভাগীয় প্রশাসন, জেলা প্রশাসন, সিটি মেয়রসহ বিভিন্ন সংস্থার সভায় চিকিত্সার অপ্রতুলতার কথা তুলে ধরেছেন। তিনি এ হাসপাতালে জরুরি ভিত্তিতে জনবল নিয়োগ দেওয়াসহ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সরবরাহের জন্য সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দের সহযোগিতা কামনাও করেছেন সেসব জরুরি সভায়। স্থানীয়ভাবে বারবার মন্ত্রণালয়ে তাগিদ দেওয়া হলেও অদৃশ্য কারণে শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সংকট থেকেই যাচ্ছে।

জানা গেছে, বিভাগের বিভিন্ন এলাকা থেকে অসহায় গরিব রোগীরা জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে অল্প টাকায় চিকিৎসার জন্য এ হাসপাতালে ভিড় করে। তাদের এ হাসপাতালের নানা ‘অব্যবস্থাপনার চিত্র’ দেখিয়ে চিকিৎসক-কর্মচারীরা মিলে তাদের মালিকানাধীন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে জটিল রোগ হয়েছে এমন ভয়ভীতি দেখিয়ে নিঃস্ব করে ছেড়ে দেয়। হাসপাতালের সামনেসহ আশপাশে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো দিন-রাত এভাবে রোগীদের জিম্মি করে হাতিয়ে নিচ্ছে সর্বস্ব। শেবাচিম হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের কয়েক জন সিনিয়র চিকিৎসকও এসব ডায়াগনস্টিকের মালিকানায় থেকে চেম্বার বসিয়ে দিন-রাত রোগী দেখা ও অপারেশন করে যাচ্ছেন। বছরের পর বছর এসব শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে এ হাসপাতালের কোটি কোটি টাকার গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষানিরীক্ষা বন্ধ রয়েছে। এমআরআই মেশিন পাঁচ বছর ধরে বন্ধ থাকার পর তা অচল বলে ঘোষণা করেছে ন্যাশনাল ইলেক্ট মেডিক্যাল ওয়ার্কশপ।

এছাড়াও সিটি স্ক্যান, এনজিওগ্রাম, আলট্রাসনোগ্রামসহ গুরুত্বপূর্ণ মেশিনারিজ অকেজো হয়ে পড়ে আছে। অত্যাধুনিক দুটি সিটি স্ক্যান মেশিনের একটি এক বছরেরও বেশি সময় এবং অপরটি প্রায় দুই বছর ধরে বিকল রয়েছে। ২০১৯ সালের মার্চ মাসের শুরুর দিকে বিকল হওয়া অধিক গুরুত্বপূর্ণ আলট্র্রাসনোগ্রামের দুটি মেশিন আর সচল হয়নি। চারটি এক্সরে মেশিনের দুটি সচল থাকলেও রোগীর চাপ সামাল দেওয়া যাচ্ছে না।

হাসপাতালের পরিচালক সাইফুল ইসলাম জানান, কোটি কোটি টাকার মেশিনারিজ এলেও তা পরিচালনার জন্য দক্ষ টেকনিশিয়ান নেই। এসব মেশিনের যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলেও তা মেরামত করতে ন্যাশনাল ইলেক্ট মেডিক্যাল ওয়াকর্শপ (নিমিউ) বরাবর চিঠি দেওয়া হলেও দীর্ঘসূত্রতার সৃষ্টি হয়।

হাসপাতালের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কোটি টাকা মূল্যের একটি মেশিন কিনে তা ফেলে রাখা হয়। অথচ সে টাকা দিয়ে হাসপাতালের সামনের ডায়াগনস্টিক ব্যবসায়ীরা পাঁচটি মেশিন কিনে কোটি টাকার মুনাফা করে থাকেন। কারোর কোনো প্রকার জবাবদিহিতা না থাকার ফলে এ হাসপাতালটির এমন করুণ দশা বলে জানান এ শীর্ষ কর্মকর্তা।

বরিশাল সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) জেলা সভাপতি প্রফেসর শাহ সাজেদা বলেন, সরকারি হাসপাতালে ২৪ ঘণ্টা রোগ পরীক্ষানিরীক্ষার ব্যবস্থা থাকার কথা থাকলেও শেবাচিম হাসপাতালে মাত্র কয়েক ঘণ্টা কয়েক ধরনের পরীক্ষানিরীক্ষা করা হয়। এতে করে রোগীরা বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়ে প্রতারিত হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, হাসপাতালের চিকিত্সকদের বেসরকারি ডায়াগনস্টিক বা হাসপাতালে আগ্রহ নিয়ে চিকিৎসাসেবা দিতে দেখা গেলও সরকারি হাসপাতালের বেলায় তুচ্ছতাচ্ছিল্যের মনোভাব রয়েছে। তাই সরকারিভাবে তা সার্বক্ষণিক মনিটরিং করে চিকিত্সকদের নির্ধারিত দায়িত্ব দিলে রোগীদের দুর্ভোগ কিছুটা হলেও লাঘব হবে।

ইত্তেফাক/বিএএফ

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x