পাঁচ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিত্র

যন্ত্রপাতি বাক্সবন্দি, নষ্ট অ্যাম্বুলেন্স

যন্ত্রপাতি বাক্সবন্দি, নষ্ট অ্যাম্বুলেন্স
রামগড় (খাগড়াছড়ি) :জরুরি চিকিত্সার মূল্যবান সরঞ্জাম দীর্ঘদিন ধরে কক্ষে বাক্সবন্দি অবস্থায় পড়ে আছে —ইত্তেফাক

সারাদেশের উপজেলায় সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা সেবার সার্বিক ব্যবস্থা রয়েছে। অপারেশন থিয়েটার ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা আছে। তবে সবধরনের ব্যবস্থা থাকলেও জনবল না থাকায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে যন্ত্রপাতি বাক্সবন্দী অবস্থায় পড়ে আছে। লোকবলের অভাবে চলে না পরীক্ষা-নিরীক্ষা। বেশির ভাগ হাসপাতালেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, টেকনিশিয়ান, ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট ও আয়াসহ বিভিন্ন পদে পর্যাপ্ত জনবল নেই। ফলে বন্ধ রয়েছে অপারেশন থিয়েটার। অকেজো হয়ে পড়ে আছে এক্স-রে, আলট্রাসনোগ্রাম ও ইসিজিসহ বিভিন্ন মেডিকেল যন্ত্রপাতি। অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও সেগুলো প্রায়ই নষ্ট থাকে। ফলে রোগী পরিবহনেও সংকট দেখা দিচ্ছে।

অভিযোগ আছে, প্রাইভেট অ্যাম্বুলেন্সগুলোর সুবিধা দিতে অধিকাংশ সময় সরকারি হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স নষ্ট বলে সার্ভিস বন্ধ রাখা হয়। আবার অধিকাংশ সময় দালালদের যোগসাজশে অ্যাম্বুলেন্স নষ্ট করে ফেলে রাখা হয়। এক্ষেত্রে এক শ্রেণীর কর্মকর্তারা প্রাইভেট অ্যাম্বুলেন্সগুলোকে সুবিধা দিয়ে কমিশন নেন। আবার অনেক সময় ডাক্তারসহ এক শ্রেণীর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অ্যাম্বুলেন্স ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করেন। দেশের পাঁচটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ইত্তেফাকের প্রতিনিধিরা সরেজমিন পরিদর্শন করে চিকিত্সা সেবার চরম অব্যবস্থাপনার চিত্র দেখতে পেয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে যখন যা প্রয়োজন তা বরাদ্দ দিচ্ছেন। মন্ত্রণালয় থেকে সিভিল সার্জন পর্যন্ত দায়িত্বপ্রাপ্তরা দায়িত্ব পালনে যে চরম অবহেলা ও অদক্ষতার পরিচয় দিচ্ছেন তা স্পষ্ট বোঝা যায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্বাস্থ্য সেবার বেহাল দশা দেখে।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তারা বলেন, একটি উপজেলায় স্বাস্থ্য সেবার সার্বিক অবকাঠামো আছে। তবে জনবল সংকটের কারণে তা সচল রাখা সম্ভব হচ্ছে না। অথচ এগুলো সচল থাকলে করোনাসহ অন্যান্য চিকিত্সা উপজেলার মানুষ উপজেলার হাসপাতালেই পেতেন। জনবল দেওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে বারবার লিখিতভাবে জানিয়েও কোন লাভ হয় না। জরুরি সেবার এই ফাইল কেরানীর কাছেই ফাইলবন্দী হয়ে পড়ে থাকে। বর্তমানে করোনা রোগীদের সামাল দিতে গিয়ে রাজধানীর হাসপাতালগুলোকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। করোনা রোগীর চাপে অনেক হাসপাতালকে কোভিড হাসপাতাল ঘোষণা করা হচ্ছে। এতে অন্যান্য রোগীরা চিকিত্সা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সাধারণ চিকিত্সা সেবা ভয়াবহ সংকটে পড়েছে।

শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডের শয্যা পূর্ণ। তাই বারান্দায় মেঝেতে দেওয়া হচ্ছে রোগীদের চিকিৎসাসেবা

পীরগঞ্জ (ঠাকুরগাঁও) সংবাদদাতা মো. মেহের এলাহী জানান, পীরগঞ্জ উপজেলা হাসপাতালে এক্সরে মেশিন নষ্ট একযুগ ধরে। ৬টি চিকিত্সকের পদসহ তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর ২৯টি পদে জনবল নেই। ইসিজি মেশিনের টেকনোলজিস্ট এবং আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিনের প্রিন্টার ও সোনোলোজিস্ট নেই। ডাক্তার থাকলেও নেই ডেন্টাল চেয়ার, অ্যাম্বুলেন্সটি সংস্কারের অভাবে বেশিরভাগ সময় অচল পড়ে থাকে। এনেসথেওলজিস্ট না থাকায় সিজারিয়ানসহ সকল অপারেশন বন্ধ আছে ৫ বছর ধরে। শূন্য রয়েছে জুনিয়র কনসালটেন্ট (সার্জারি), জুনিয়র কনসালটেন্ট (মেডিসিন), জুনিয়র কনসালটেন্ট (এনেসথেসিয়া), জুনিয়র কনসালটেন্ট (শিশু), অ্যাসিস্ট্যান্ট সার্জন পদ। এতে চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন উপজেলার প্রায় ৪ লাখ মানুষ।

পীরগঞ্জ হাসপাতালে সেন্ট্রাল অক্সিজেন সরবরাহ না থাকায় কোভিড-১৯ আক্রান্তদের সিলিন্ডার অক্সিজেনের উপর নির্ভর থাকতে হয়। এসব সিলিন্ডারে নিদিষ্ট পরিমাণ অক্সিজেন থাকে। শেষ হয়ে গেলে খালি সিলিন্ডারগুলো পাঠাতে হয় রংপুর। সেখান থেকে অক্সিজেন ভরে সিলিন্ডারগুলো আনতে ২/৩ দিন সময় লেগে যায়। এ অবস্থায় মাঝে মধ্যে অক্সিজেন সংকটে পড়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ আব্দুল জব্বার বলেন, নতুন অ্যাম্বুলেন্স বরাদ্দ হওয়ার পড়েও কোভিড এর কারণে আটকে আছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট চিকিত্সক ও জনবল সংকটের কথা জানিয়েছি। নতুন ডিজিটাল এক্স-রে মেশিনের জন্য আবেদন জানানো হয়েছে।

মির্জাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অধিকাংশ শয্যা ফাঁকা। এতে পোষা প্রাণীরা করছে আরাম-আয়েশ

রামগড় প্রতিনিধি নিজাম উদ্দিন লাভলু জানান, খাগড়াছড়ি জেলার ভারত সীমান্তবর্তী রামগড় উপজেলার ৫০ শয্যার হাসপাতালে মাত্র একজন মেডিক্যাল অফিসার (এমও) পোষ্টিং রয়েছে। পার্শ্ববর্তী একটি উপজেলা হাসপাতাল থেকে আরেকজন মেডিক্যাল অফিসারকে সংযুক্তি আদেশে এখানে দেওয়া হয়েছে। এই দুই জন মেডিক্যাল অফিসার সপ্তাহে তিন দিন করে রোস্টারে দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে প্রতিদিন একজন মেডিক্যাল অফিসারই থাকেন হাসপাতালে। ৩১ শয্যা হতে ৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ প্রকল্পের অধীনে রামগড় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৫ কোটি সাত লক্ষ টাকা ব্যয়ে সাড়ে তিন তলা বিশিষ্ট ১৯ শয্যার বর্ধিত মূল ভবন, দ্বিতল বিশিষ্ট চার ইউনিটের বিশেষজ্ঞ ডক্টরস কোয়ার্টার, দ্বিতল বিশিষ্ট নার্সিং ও ৪র্থ শ্রেণী কর্মচারির আবাসিক কোয়াটার নির্মাণ করা হয়।

২০১৩ সালের নভেম্বরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৫০ শয্যার এ হাসপাতালের উদ্বোধন করেন। ভবন উদ্বোধন হলেও এখনও পর্যন্ত ডাক্তারসহ কোন জনবল পোষ্টিং দেওয়া হয়নি এখানে। সূত্র জানায়, ৫০ শয্যার হাসপাতালে একজন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচ এন্ড এফপিও), আবাসিক মেডিক্যাল অফিসারসহ ৯ জন মেডিক্যাল অফিসার ও একজন ডেন্টাল সার্জন, ১০ জন জুনিয়র কনসালট্যান্ট ও এনেসথেসিয়ওলজিস্ট নেই। ইউএইচ এন্ড এফপিও এবং একজন মেডিক্যাল অফিসার রয়েছেন। এছাড়া উপ-সহকারি মেডিক্যাল অফিসারের ৫টি পদের মধ্যে পোস্টিং-এ আছে দুজন। এছাড়া সিনিয়র স্টাফ নার্সের ১৪ টি পদের মধ্যে ৬টি শূন্য, অ্যাসিস্টেন্ট নার্সের একমাত্র পদ। মিডওয়াইফের ৫টি পদ শূন্য। মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টের (ল্যাব) ৩টি পদের মধ্যে ২টি শূন্য, মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট (রেডিও), মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট (পিজিও) ল্যাব অ্যাটেন্ডেন্ট, প্যাথলজিষ্ট ও কম্পাউন্ডারের পদগুলো শূন্য।

২০০৭ সালে অপারেশন থিয়েটারে স্থাপন করা হয় অটো ক্লেব মেশিন। এসব জনবল না থাকায় একদিনের জন্যও অপারেশন থিয়েটার চালু করা হয়নি। ব্যবহার করা হয়নি কোন মেশিন বা সরঞ্জাম। ২০১৩ সালে ৫০ শয্যায় উন্নীত করার পর বর্ধিত ভবনে আরও দুটি অপারেশন থিয়েটার রুম নির্মাণ করা হয়। এখানেও অপারেশনের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, আসবাবপত্রসহ যাবতীয় সরঞ্জাম সরবরাহ করা হলেও তা বাক্সবন্দী অবস্থায় পড়ে আছে। এ কারণে নতুন অপারেশন থিয়েটার এখনও চালু হয়নি। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. প্রতীক সেন হাসপাতালে ডাক্তার শূণ্যতায় নাজুক অবস্থার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘ এখন আমরা যারা কর্মরত আছি সবাইকে চরম হিমশিম খেতে হচ্ছে।’

মোংলা (বাগেরহাট) সংবাদদাতা এইচ এম দুলাল জানান, মোংলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দীর্ঘদিন থেকেই নেই ডাক্তার, নষ্ট রয়েছে সরকারি দুইটি অ্যাম্বুলেন্স। ল্যাব টেকনিশিয়ান ও সহকারী ল্যাব টেকনিশিয়ানের পদগুলো শূন্য। দেশব্যাপী করোনা মহামারীর মধ্যে মোংলা বন্দর ও উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় আক্রান্ত রুগীদের চাপ বেড়েই চলছে। ২৭ জন ডাক্তারের অনুকূলে আছে মাত্র ৮ জন, তাও প্রায় সময়ই অনুপস্থিত থাকেন। তারা থাকেন বিভিন্ন জায়গায় প্রশিক্ষণে। দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট সরকারি দুটি অ্যাম্বুলেন্স। ল্যাব টেকনিশিয়ান ও সহকারী ল্যাব টেকনিশিয়ানের পদগুলো শূন্য। অন্য হাসপাতাল থেকে ল্যাব টেকনিশিয়ান এনে মোংলায় হচ্ছে করোনা নমুনা পরীক্ষা। নেই এক্স-রে টেকনিশিয়ানও।

সিলিন্ডারের অক্সিজেন দিয়ে করোনায় আক্রান্ত রোগীদের অধিক চাপের অক্সিজেন দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এই উপজেলায় করোনা শনাক্তের হার প্রায় ৫০ শতাংশ। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ জীবিতোষ বিশ্বাস বলেন, এখানে বড় সমস্যা হলো লোকবল সংকট। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৬টি শয্যা আছে করোনা রোগীদের জন্য। তবে অক্সিজেনের পর্যাপ্ত সরবরাহ নেই। একজন কোভিড ১৯ রোগীর জন্য ২-৩ ঘণ্টায় একটি সিলিন্ডার শেষ হয়ে যায়। তাছাড়া হাই ফ্লো নাজাল ক্যানুলা নেই। ফলে বেশি মাত্রার অক্সিজেন যাদের লাগে, তাঁদের আমরা এই সেবা দিতে পারি না।

চাটমোহর (পাবনা) প্রতিনিধি জানান, পাবনার চাটমোহর উপজেলার ৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার (অস্ত্রোপচার কক্ষ) তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। গত এক যুগেও এখানে কোন অপারেশন হয়নি। ফলে এ হাসপাতালে প্রসূতির সিজার, অ্যাপেন্ডিসাইটিসসহ অন্যান্য অস্ত্রোপচার না হওয়ায় রোগীরা মোটা অংকের টাকা ব্যয় করে বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকে অপারেশন করতে বাধ্য হচ্ছেন। অপারেশন থিয়েটার বন্ধ থাকায় অস্ত্রোপচারের কাজে ব্যবহৃত মূল্যবান যন্ত্রপাতি অকেজো হয়ে পড়েছে। অথচ উপজেলার ৪ লক্ষাধিক মানুষের উপজেলা পর্যায়ে চিকিত্সার ভরসাস্থল চাটমোহরের এই সরকারি হাসপাতাল। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ ওমর ফারুক বুলবুল অপারেশন থিয়েটার তালাবদ্ধের বিষয়টি স্বীকার করে বলেছেন, অপারেশন থিয়েটারটি চালু করার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবর চাহিদাপত্র প্রেরণ করা হয়েছে, তারা ব্যবস্থা নেবেন।

শিবগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সবচেয়ে বড় শিবগঞ্জ উপজেলায় প্রায় ৯ লাখ জনগনের জন্য মাত্র ১টি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থাকলেও সেটি নানা সমস্যায় জর্জরিত। জনবল সংকট। কর্মরত চিকিত্সকরা জানান, অর্ধেক জনবল দিয়ে এই হাসপাতালটি কোন রকমে চলছে। অপারেশনসহ পরীক্ষা-নিরীক্ষা বন্ধ। এখানে অনুমোদিত পদে ২১ জন চিকিত্সকের স্থলে আছেন ১২ জন। শূন্য রয়েছে ৯টি পদ। মাঠকর্মীর ক্ষেত্রে ৮০ জনের স্থলে রয়েছে ৫৪ জন। শূন্য রয়েছে ২৬ জন। অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে মাত্র ১টি। তাও আবার চালক অন্যান্য কাজে ব্যস্ত থাকায় রোগীরা হয়রানীর শিকার হচ্ছে। আরো একটি অ্যাম্বুলেন্স দীর্ঘদিন যাবত অকেজো হয়ে পড়ে আছে। বর্তমানে অক্সিজেন সিলিন্ডার রয়েছে মাত্র ৩২টি, যা চাহিদার তুলনায় অনেক কম। ডিজিটাল এক্সরে মেশিন নেই। সাধারণ এক্সরে মেশিনও জনবল সংকটের কারণে বন্ধ।

ইত্তেফাক/এসআই

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x