নাচগান ঝাড়ফুঁক দিয়ে প্যারালাইসিস চিকিৎসা

নাচগান ঝাড়ফুঁক দিয়ে প্যারালাইসিস চিকিৎসা
গাইবান্ধার সদর উপজেলায় বোয়ালি ইউনিয়নের নশরতপুর গ্রামে এভাবে নাচগান ও ঝাড়ফুঁক করে প্যারালাইসিস রোগীর চিকিৎসা চলছে—ইত্তেফাক

চারদিকে বাঁশ দিয়ে ঘেরা। চার কোনায় চারটি কলাগাছ। ওপরে শামিয়ানা টানানো। ভেতরের অংশ ১০ বর্গফুট হবে। শামিয়ানার নিচে সত্তরোর্ধ্ব এক বৃদ্ধা। তিনি মাঝামাঝি বসা। পাশে ঝাড়ু হাতে এক কবিরাজ। তিনি নেচে নেচে গান গাইছেন। নাচগানের তালে বৃদ্ধার চারদিকে ঘুরছেন। তারপর বৃদ্ধাকে ঝাড়ু দিয়ে ছুঁয়ে দিচ্ছেন। মাথা থেকে পা পর্যন্ত। আবার নাচগান করে ঘুরছেন। তার সঙ্গে ঘুরছে কয়েক জন কিশোরী। তাদের পরনে হলুদ শাড়ি। তারাও কবিরাজের সঙ্গে সুর মিলিয়ে নাচগান করছে। কিশোরীরাও বৃদ্ধার মুখমণ্ডল মুছে দিচ্ছে তাদের শাড়ির আঁচল দিয়ে। পাড়াপড়শিরা তা উপভোগ করছে। এভাবে নিজের বাড়ির আঙিনায় অপচিকিৎসা দিয়ে হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন ঐ কবিরাজ। কবিরাজের নাম ফুল মিয়া (৫০)। গাইবান্ধা সদর উপজেলার বোয়ালী ইউনিয়নের নশরতপুর গ্রামে তার বাড়ি। গত রবিবার দুপুরে নশরতপুর গ্রামে গিয়ে এমন দৃশ্য দেখা গেছে।

এলাকাবাসী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, ফুল মিয়ার তেমন লেখাপড়া নেই। একসময় তিনি গাইবান্ধা শহরের গালামালের দোকানে কুলিশ্রমিকের কাজ করতেন। এরপর দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে তিনি নিজের বাড়িতে কবিরাজি করছেন। বিশেষত তিনি প্যারালাইসিস রোগীদের অপচিকিত্সা দিয়ে আসছেন। প্রত্যেক রোগীকে ৩০ থেকে ৫০ মিনিট ঝাড়ফুঁক দেন। এর জন্য একজন রোগীর কাছ থেকে ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ফি নেন। ঝাড়ফুঁকের সময় তার সঙ্গে পাঁচ-ছয় জন কিশোরী কাজ করে। তারা সবাই ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী। তাদেরও কিছু সম্মানী দেন কবিরাজ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কিশোরী জানায়, তাদের আনন্দ লাগে, রোগীরা ভালো হয়। তাই তারা এ কাজে সহায়তা করছে। এ পর্যন্ত কতজন রোগীর চিকিত্সা দিয়েছেন তার কোনো হিসাব কবিরাজের কাছে নেই। কুসংস্কারকে বিশ্বাস করে দূরদূরান্ত থেকে রোগীরা এখানে আসছে। তারা সুস্থ হয় কি না, এলাকাবাসী জানে না।

তবে কবিরাজ ফুল মিয়া দাবি করেন, তার কাছে আসা সব রোগীই সুস্থ হয়। কিন্তু প্যারালাইসিস রোগে আক্রান্ত হওয়ার ১০-১৫ দিনের মধ্যে তার কাছে আসতে হবে। সেই সব রোগীকে তিনি গ্যারান্টি দিয়ে সুস্থ করে তোলেন। তার মতে, ঝাড়ফুঁক করতে অনেক সময় লাগে। এ সময় রোগীরা বিরক্ত হয়। ধৈর্য হারিয়ে ফেলে। তাই বিনোদনের মাধ্যমে ঝাড়ফুঁক করা হয়। ঝাড়ু ব্যবহারের কারণ কী, জানতে চাইলে কবিরাজ বলেন, ঝাড়ুটি বন (দোয়া-তাবিজ) করা। এটি রোগীর শরীরে ছুঁয়ে দিলে রক্তসঞ্চালন বাড়ে। কবিরাজের কাছে আসা ঐ বৃদ্ধার এক আত্মীয় জানান, এই কবিরাজের কাছে ঝাড়ফুঁক নিয়ে অনেকে সুস্থ হয়েছে শুনে তারা এখানে এসেছেন। তার এই অপচিকিত্সায় অনেকে সুস্থ হয়েছে বলে কেউ কেউ দাবি করেন। নশরতপুর গ্রামের স্কুলশিক্ষক আবদুস সোবহান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে কবিরাজ ফুল মিয়া এভাবে অপচিকিৎসা দিচ্ছেন। তার খপ্পরে পড়ে নিরীহ মানুষ প্রতারিত হচ্ছে। প্যারালাইসিস রোগ তো ভালোই হচ্ছে না, বরং তারা টাকাপয়সা নষ্ট করছে। একই গ্রামের বাসিন্দা ফরিদ উদ্দিন বলেন, কুসংস্কারকে বিশ্বাস করে সাধারণ মানুষ ঐ কবিরাজের শরণাপন্ন হচ্ছে। এই সুযোগে কবিরাজ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। এ বিষয়ে প্রশাসনের নজর দেওয়া দরকার।

গাইবান্ধার সিভিল সার্জন আ ক ম আখতারুজ্জামান বলেন, গ্রামাঞ্চলে এসব কুসংস্কার এখনো আছে বলে শোনা যায়। এ ধরনের অপচিকিৎসার কোনো ভিত্তি নেই। এটা সম্পূর্ণ কুসংস্কার ও প্রতারণা। রোগব্যাধি ভালো হওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই নেই। যে কোনো রোগই হোক, সে জন্য সরকারি হাসপাতাল রয়েছে। তিনি আরো বলেন, ঝাড়ফুঁকে তেমন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া না হলেও রোগী মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে এসব কবিরাজের কাছ থেকে ওষুধজাতীয় কিছু সেবন করলে নানা ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে। এদের কাছে যাওয়া থেকে বিরত থাকাই ভালো।

ইত্তেফাক/কেকে

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x