সাপে কাটা রোগীর চিকিৎসা সংকটের নেপথ্যে

দেশে অ্যান্টিভেনম তৈরির চেষ্টা
সাপে কাটা রোগীর চিকিৎসা সংকটের নেপথ্যে
[সংগৃহীত প্রতীকী ছবি]

খুব ভোরে সাপে কাটে সাথীকে। ব্যথায় কাতর হয়ে পড়লে বাবা সাইদুল মেয়েকে নিয়ে দুর্গাপুরের নাগরাজ মুতালিবের বাড়ি যান। ঘণ্টা দুই ঝাড়ার পর মুতালিব বিষমুক্ত করতে অপারগতা জানান। বানরগাছির সর্পবিশারদ আবুল হোসেনের দ্বারস্থ হতে বলেন। তিনিও ঘণ্টা দুয়েক ঝাড়ার পর রসুলপুরের বিষনাশি ওঝা হাফিজুলের শরণাপন্ন হতে বলেন। হাফিজুল ঘরে পালা গোখরা বিষ নামাতে ব্যর্থ হয়। সবশেষে সর্পরাজ আজিজ। তিনিও বিষ নামাতে অসমর্থ হয়ে ডাক্তার দেখাতে বলেন। তখন বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যা। সাথীর অচেতন শরীর কালচে নীল। মধুপুর উপজেলা হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিত্সক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

এভাবে দিনভর অপচিকিৎসা আর টানাহ্যাঁচড়ায় প্রাণ যায় মধুপুর উপজেলার জাঙ্গালিয়া গ্রামের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী সাথীর। মধুপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও প প কর্মকর্তা ডা. রুবিনা ইয়াসমিন জানান, মারা যাওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর বাচ্চাটিকে হাসপাতালে আনা হয়। তখন আর কিছুই করার ছিল না।

গত ১৮ জুলাই ধনবাড়ী উপজেলার ফুলবাড়ীর সেকান্দরকে সাপে কামড়ালে প্রথমে ধনবাড়ী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে গজব্যান্ডেজ লাগিয়ে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। পথিমধ্যেই মারা যায় সে। একইভাবে গত ২৯ জুলাই মধুপুর উপজেলার সিংহচালার সাপে কাটা নুরুল ইসলামকে উপজেলা হাসপাতাল হয়ে ময়মনসিংহ নেওয়ার পথে তিনি মারা যান। বিগত ছয় মাসে উত্তর টাঙ্গাইলের ছয় উপজেলা হাসপাতাল থেকে ময়মনসিংহে রেফার্ড করা ৯ রোগী মারা যায়।

দুই সাপের অনন্য ভালোবাসা

মধুপুর উপজেলা হাসপাতালের মেডিক্যাল অফিসার ডা. হেলাল উদ্দীন জানান, বিষাক্ত সাপে কাটা রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া জরুরি। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে ওঝায় ঝাড়িয়ে সংকটাপন্ন অবস্থায় রোগীকে উপজেলা হাসপাতালে আনা হয়।

উপজেলা হাসপাতালে এন্টিভেনম না থাকায় শুধু প্রাথমিক পরিচর্যা দিয়ে রেফার্ড করা হয়। মধুপুর হাসপাতালের আরএমও ডা. তারিক জানান, ৯৫ ভাগ সাপ বিষধর নয়। বিষধর সাপে কামড়ালে ডাক্তারি চিকিত্সার বিকল্প নেই। উপজেলা হাসপাতালে এন্টিভেনম থাকে না। চাহিদা দিলে পাওয়া যায়। কিন্তু কনসালট্যান্ট বা অ্যানেশথেসিওলজিস্ট না থাকায় এন্টিভেনম প্রয়োগ করা সম্ভব হয় না।

মধুপুর উপজেলার জলছত্র খ্রিস্টমিশন হাসপাতালের সাবেক মেডিক্যাল অফিসার ডা. মুহাম্মদ মুজিবুর রহমান জানান, সাপ থাকে গ্রামে, ওষুধ থাকে শহরে, রোগীরা মরে বেঘোরে। গ্রামের মানুষের সাপে কাটায় প্রাণ হারানোর কথা মাথায় রেখে জলছত্র খ্রিস্ট হাসপাতাল ১৯৫৮ সাল থেকে এন্টিভেনম দেওয়া শুরু করে। বৃহত্তর ময়মনসিংহে টানা ৬ দশক এটিই ছিল সাপে কাটার একমাত্র নির্ভরযোগ্য হাসপাতাল। ২০১৪ সালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জেলা সদর ও মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে সাপে কাটা রোগীর চিকিত্সার ব্যবস্থা করালে জলছত্র হাসপাতালে ঐ চিকিত্সা বন্ধ হয়।

ঐ হাসপাতালের পরিচালক ডা. মিহির কান্তি জানান, মার্চ থেকে নভেম্বর সর্পদংশনের ঘটনা ঘটে। ২০১০-১৪ পাঁচ বছরে ১০ হাজার ৫৬৮ রোগী এখানে চিকিত্সা নেন। গত সেপ্টেম্বরে টাঙ্গাইলের ১২ উপজেলার ২৪ জন ডাক্তারকে হাতেকলমে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন তিনি। সরকার প্রচুর এন্টিভেনম আমদানিও করছে। তাহলে কেন উপজেলা হাসপাতালের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ডাক্তাররা সাপে কাটার এন্টিভেনম পুশ না করে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে রোগীকে মৃত্যুর ঝুঁকিতে ফেলেন তা বোধগম্য নয়।

এদিকে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগে সাপে কাটার কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও ইনসেপ্টার স্থানীয় ডিপোপ্রধান নেসারউদ্দীন জানান, মাসে ৩০/৪০ জন রোগীকে তারা এন্টিভেনম সরবরাহ করেন। গোপালপুর উপজেলা হাসপাতালের আরএমও ডা. তাপস চন্দ্র সাহা জানান, আমদানি করা এন্টিভেনমে মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়। রোগী মারা গেলে চিকিত্সকরা হামলার আতঙ্কে থাকেন। তাই ঝুঁকি এড়াতে উপজেলা হাসপাতালে এন্টিভেনম দেওয়া হয় না।

অবসরপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. সেলিম হোসেন জানান, ভারত ও ইউরোপের সাপ থেকে বাংলাদেশের সাপের ধরন কিছুটা আলাদা। তাই সেখান থেকে আমদানি করা এন্টিভেনম অনেক সময় কাজ করে না। এজন্য দেশি সাপের এন্টিভেনম জরুরি।

টাঙ্গাইলের সিভিল সার্জন ডা. আবুল ফজল মো. শাহাবুদ্দীন জানান, শিগিগরই উপজেলা হাসপাতালে চিকিত্সা শুরু হবে। ডাক্তারদের অনলাইনে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক জন উপপরিচালক জানান, ২০১৮ সাল থেকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ভেনম রিসার্চ সেন্টারে দেশি সাপের বিষে এন্টিভেনম তৈরির চেষ্টা চলছে। তাড়াতাড়িই এর সুফল মিলবে বলে আশা করা হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা জানায়, দেশে প্রতিবছর প্রায় ৬ লাখ মানুষকে সাপে কাটে। ৬ থেকে ৭ হাজার মারা যায়। এন্টিভেনমের কোনো সংকট নেই।

ইত্তেফাক/এমআর

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x