শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিতের পরামর্শ চিকিৎসকদের

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিতের পরামর্শ চিকিৎসকদের
ছবি : সংগৃহীত

দেড় বছরেরও বেশি সময় পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলেছে আজ। প্রথমদিনে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। রাজধানীর কয়েকটি স্কুলের নির্দিষ্ট শ্রেণিতে শতভাগ উপস্থিতির খবরও জানা গেছে।

রাজধানীর একাধিক এলাকায় দেখা গেছে, সকালে শিক্ষার্থীরা স্বাস্থ্যবিধি মেনেই শ্রেণিকক্ষে ঢুকেছে। এসময় তাদের প্রায় সবার মুখেই মাস্ক ছিল। অভিভাবকরাও ছিলেন সচেতন। স্কুল খোলা প্রসঙ্গে চিকিৎসকরা বলছেন, শিক্ষা কার্যক্রম সচল রাখতে স্কুল-কলেজ খোলার পর শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্ট সবাই মাস্ক পরাসব স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। না হলে সংক্রমণ আবারও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনলাইন ক্লাসের সময়ই স্বাস্থ্যবিধি মানাতে শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে। বিশেষ করে নিচু ক্লাসের শিক্ষার্থীদের জন্য ছড়া আকারে স্বাস্থ্যবিধির কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি যেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের দৈনন্দিন অভ্যাসের অংশ হয়ে যায়, সেই চেষ্টা করা হয়েছে। এই মুহূর্তে পরীক্ষার্থী ছাড়া বাকিদের ওপর পড়াশোনার চাপ দিচ্ছেন না শিক্ষকরা। তবে, দীর্ঘদিন পর ক্লাসে ফেরায় এক ধরনের জড়তাও আছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে। তাই বর্তমানে তাদের মানসিক প্রফুল্লতাকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

No description available.

শিক্ষার্থীদের শরীরের তাপমাত্রা পরীক্ষা করা হচ্ছে। ছবি: বাদশা

সকাল থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করেছেন শিক্ষা কর্মকর্তারা। স্বয়ং শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনিও কয়েকটি স্কুল পরিদর্শন করেছেন। এরমধ্যে আজিমপুর গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের একটি শ্রেণিকক্ষে ময়লা পাওয়া যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ হাছিবুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্তের নির্দেশ দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। এছাড়া, তদারকির দায়িত্বে থাকা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) কর্মকর্তা সেলিনা হোসেনকেও সাময়িকভাবে বরখাস্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

শিক্ষামন্ত্রী গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘এখন থেকে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সারপ্রাইজ ভিজিট চলবে।’ শিক্ষাবিদদের পরামর্শ অনুযায়ী চলতি শিক্ষাবর্ষ দুই-এক মাস বাড়ানো হবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এখন কী কী ঘাটতি রয়েছে বা কতটুকু হয়েছে, তা মূল্যায়ন করে এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

দীর্ঘদিন পর সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে পেরে আনন্দিত অভিভাবকরাও। তারা বলছেন, করোনা কবে নির্মূল হবে, তার নিশ্চয়তা নেই। শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ঘরবন্দি থেকে হাঁপিয়ে উঠেছিল। স্বাস্থ্যবিধি মেনে সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে পেরে তারাও খুশি।

No description available.

বিদ্যালয়ের সামনে অভিভাবক-শিক্ষার্থীদের ভিড়। ছবি: বাদশা

উজ্জ্বল কুমারসহ একাধিক অভিভাবক ইত্তেফাক অনলাইনকে বলেন, ‘আমাদের মেয়ে দীর্ঘদিন পর স্কুলে যেতে পেরে খুবই খুশি। সকাল উঠে নিজেই সব গুছিয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়াকে স্বাগত জানাই।’

এদিকে, চিকিৎসকরাও শিক্ষার্থীদের স্কুলে পাঠানোর পক্ষে। তারা জানিয়েছেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিয়মিত ক্লাস নেওয়াই উচিত। তবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে করোনা ছড়ানোর সব আশঙ্কা এখনই উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তবে, মাউশির নির্দেশনা সঠিকভাবে অনুসরণ করলে সংক্রমণ প্রতিরোধের সম্ভাবনাই শক্তিশালী।

রাজধানীর মোহাম্মদপুর কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ রহমত উল্লাহ ইত্তেফাক অনলাইনকে বলেছেন, ‘সকালে আমরা চকলেট দিয়ে শিক্ষার্থীদের স্বাগত জানিয়েছি। প্রায় শতভাগ শিক্ষার্থীই মাস্ক পরেই এসেছিল। তবে, যে দুই-একজনের মাস্ক ছিল না, তাদের মাস্ক দিয়েছি। অনেকের স্কুলড্রেস ছোট হয়ে গেছে। কেউ কেউ ইউনিফর্ম ছাড়াই এসেছে। আমরা তাদেরও অ্যালাউ করেছি। পড়ার চাপ এখনই আমরা দিচ্ছি না। শিক্ষার্থীদের মানসিক প্রফুল্লতাকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। গড় উপস্থিতি ছিল ৮২ শতাংশ।’ তিনি আরও বলেন, ‘‘অনলাইন ক্লাস চলার সময় আমরা নিচু ক্লাসের শিক্ষার্থীদের জন্য স্বাস্থ্যবিধি সংক্রান্ত কিছু ছড়া তৈরি করেছি। যেন তাদের মধ্যে স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিয়ম মানার একটা অভ্যাস তৈরি হয়ে যায়। আমরা শিখিয়েছি, ‘দূরে বসি দূরে দাঁড়াই, করোনাকে দূরে তাড়াই’, ‘হাত ধুই বারে বারে, হত্যা করি করোনারে’ ইত্যাদি। অভিভাবক ও সরকারি কর্মকর্তারাও আমাদের ব্যবস্থাপনায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।’’

No description available.

শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীরা। ছবি: বাদশা

ধানমন্ডির গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক আবু সাঈদ ভূঁইয়া ইত্তেফাক অনলাইনকে বলেন, ‘আমরা তাপমাত্রা মেপে এবং সাবান দিয়ে হাত ধুইয়ে শিক্ষার্থীদের স্কুলে প্রবেশ করিয়েছি। আজকে গড় উপস্থিতি ৯০ শতাংশের বেশি। এমনকি একটি শ্রেণিতে শতভাগ উপস্থিতিও হয়েছে। শিক্ষার্থীরা স্কুলে ফিরতে পেরে খুবই আনন্দিত। এক বেঞ্চে একজন করে জেড আকৃতির আসনবিন্যাস করা হয়েছে। কিভাবে স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে, তা নিয়ে মাউশি বিস্তারিত নির্দেশনা দিয়েছে। আমরা সেগুলো মেনে চলছি।’

নবাবপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আবদুস সালাম ইত্তেফাক অনলাইনকে বলেন, ‘প্রথম দিন সব মিলিয়ে ভালো গেছে। শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও ভালো ছিল। বেশিরভাগ শিক্ষার্থী স্বাস্থ্যবিধি মেনেই এসেছি। এছাড়া আমরাও পদক্ষেপ নিয়েছি। অল্প যাদের মাস্ক ছিল না তাদের মাস্ক দিয়েছি।’

গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালের সিনিয়র রেজিস্ট্রার ডা. তনিমা তাজি আঁখি ইত্তেফাক অনলাইনকে বলেন, ‘অনির্দিষ্ট কাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা সম্ভব নয়। করোনা তো দশবছরও থাকতে পারে। কিন্তু স্কুল না খুললে শিক্ষার্থীদের অনেক ক্ষতি হয়ে যেতো। স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালানো ইতিবাচক পদক্ষেপ। এখান থেকে করোনা একেবারেই ছড়াবে না, সে নিশ্চয়তা দেওয়া যাবে না। তবে সংক্রমণ না ছড়ানোর আশঙ্কা বেশি।’

No description available.

বিদ্যালয়ে যাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। ছবি: বাদশা

ঢাকা ডেন্টাল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মো. তারিক-উল-হাসান ইত্তেফাক অনলাইনকে বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকাল বন্ধ রাখা কোনো সমাধান নয়। স্বাস্থ্যবিধি মেনে ক্লাস শুরু করা ভালো সিদ্ধান্ত। যেহেতু কমবয়সী শিক্ষার্থীদের টিকা দেওয়া যাচ্ছে না, সেহেতু তাদের স্বাস্থ্যবিধি মানাটা নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে অভিভাবকদের সচেতনতা সবচেয়ে জরুরি।’

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার মো. ইফতিয়ার ইরফান ইত্তেফাক অনলাইনকে বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তো খুলতেই হতো। সপ্তাহে তো প্রতিদিন সব শ্রেণির ক্লাস হচ্ছে না। তাই প্রতিদিন সব শিক্ষার্থী আসছেও না। সুতরাং, সচেতন হলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা সম্ভব। পরীক্ষামূলকভাবে এখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালিয়ে দেখা যাক, পরিস্থিতি কোনদিকে যায়।’

মাউশির মাধ্যমিক উইংয়ের পরিচালক মো. বেলাল হোসাইন ইত্তেফাক অনলাইনকে বলেন, ‘সকাল থেকেই রাজধানীর কিছু স্কুল পরিদর্শন করেছি। সব মিলিয়ে স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনা সন্তোষজনক। ঢাকার বাইরের শাখা অফিসগুলোর রিপোর্টও আমরা নিচ্ছি।’ মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা ইতিবাচক তথ্য দিয়েছেন বলেও তিনি জানান।

ইত্তেফাক/এনই/ইউবি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x