বেটা ভার্সন
আজকের পত্রিকাই-পেপার ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২০, ২২ শ্রাবণ ১৪২৭
৩০ °সে

বৈজ্ঞানিক কল্পগল্প

অক্টোম্যান

অক্টোম্যান
অলঙ্করণ : সোহেল আশরাফ

রিরি হলো একটি পঞ্চম মাত্রার রোবট, তার বুদ্ধি এবং সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা বানরের খুব কাছাকাছি। সায়েন্টিস্ট টিংফু ঠিক করলেন তার নিজের তৈরি রিরি’কে নিয়ে তিনি রোবটিক সাবমেরিনে বঙ্গোপসাগরের তলদেশে প্রায় পনের শত ফুট নিচে যাবেন একটা অভিযানে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বিশাল সমুদ্রসীমানা জয় করেছে, আর এই সমুদ্রে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের সম্পদ যা ব্যবহার করে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখা সম্ভব। সাবমেরিনে মানুষ বলতে সায়েন্টিস্ট টিংফু একাই আর তার সঙ্গী থাকবে রিরি আর তৃতীয় মাত্রার দুটি রোবট। সিদ্ধান্ত হলো সমুদ্রে পরিবেশ ভালো থাকলে এই অভিযান তারা চালাবে পুরো তিন দিন। পুরো বিষয়টি কন্ট্রোল করছে রোবট রিরি, সাবমেরিনটি পারমাণবিক জ্বালানি দিয়ে চলে। সমুদ্রের উপরিতল থেকে সাবমেরিনটি এক হাজার ফুট নিচে চলে এল, সায়েন্টিস্ট টিংফু বেশ রোমাঞ্চিত এবং কৌতূহলী, এই পরিবেশে এর আগে সে আসেনি। সাগরের তলদেশের ইকো-সিস্টেম পুরোটাই আলাদা, কত নতুন সব প্রাণী, জলজ উদ্ভিদ, কোরাল, স্পঞ্জ প্রভৃতি। বিভিন্ন ধরনের হাঙর সাবমেরিনের চারপাশে ঘুরছে, দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির রঙ-বেরঙের মাছ। একটা গিরিখাদের ভেতর দিয়ে ক্রমশ নিচে নামছে সাবমেরিন, কফির কাপে চুমুক দিলেন সায়েন্টিস্ট টিংফু। সায়েন্টিস্ট টিংফু নির্দেশ দিলেন প্রচুর ছবি ও ভিডিও তোলার জন্য, রিরি তার চোখের ক্যামেরা অন করল। সাবমেরিনের ভেতরের চাপ ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত আছে, একটু সামান্য কেঁপে উঠল জলের ভেতরে চলমান যন্ত্রযানটি। রিরি কন্ট্রোল প্যানেলের সামনে বসে আছে, তার কমান্ড ফলো করছে বাকি দুটি রোবট। সায়েন্টিস্ট টিংফুর জন্য সাবমেরিনের ভেতরে ইলেক্ট্রোলাইসিস প্রক্রিয়ায় অক্সিজেন তৈরি করা হচ্ছে, যদিও রোবটদের জন্য অক্সিজেন দরকার নাই। একটা গভীর সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়ে নিচে নামছে সাবমেরিন, এটা একটা পাহাড় বোধহয়, নিচে সমতল জায়গা। সায়েন্টিস্ট টিংফুর নির্দেশে রিরি সাবমেরিন এখানে থামাল, চারপাশের পরিবেশটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করা দরকার। কিছু স্ফিরনা আর স্কুইড ঝাঁক বেঁধে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এখানকার বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক শৈবাল এবং কিছু ব্যাকটেরিয়ার নমুনা সংগ্রহ করা দরকার। এত গভীর তলদেশের সামুদ্রিক শৈবালে অবশ্যই কিছু মেডিসিনাল ভেল্যু বা বিশেষ কিছু উপাদান থাকতে পারে, যা মানব কল্যাণে লাগবে। কিছু নমুনা সংগ্রহ করা হলো।

-এখন সময় কত?

-এখন রাত দুটো, স্থলভাগের মানুষরা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, সায়েন্টিস্ট টিংফু তোমার এখন একটু ঘুমিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। কোনো সমস্যা হলে আমরা তোমাকে ডেকে তুলব। যান্ত্রিক গলায় উত্তর দিল রিরি।

এখানে সূর্যের আলো পৌঁছায় না, রাত না দিন বোঝা মুশকিল। সাবমেরিনের আলোয় চারপাশের জলজ পরিবেশ উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। হঠাৎ রিরির চিৎকারে সায়েন্টিস্ট টিংফুর ঘুম ভাঙল।

-কোনো সমস্যা রিরি?

-সায়েন্টিস্ট টিংফু, আমরা একটা আশ্চর্য রকম প্রাণী দেখলাম, এমন প্রাণীর কথা আমার মেমোরিতে নেই, এই প্রাণী সম্পর্কে কোনো তথ্য নেই ইন্টারনেটে।

সায়েন্টিস্ট টিংফু চোখে চশমা পরে ভালো করে সামনের মনিটরে তাকালেন; রিরি তাকে ভিডিও দেখাল। সত্যি অদ্ভুত রকমের প্রাণী, কিছুটা জলপরির মতো, কিন্তু জলপরি নয়, মাথাটা অক্টোপাসের মতো অনেকগুলো শুঁড় রয়েছে, নিচের অংশ অবিকল মানুষের মতো, পায়ের পাতা চ্যাপ্টা, সাঁতারের সুবিধার জন্য। হাতের বদলে শুঁড় আর শুড়েঁর নিচেই মানুষের মতো চোখ, কিন্তু জ্বলজ্বল করছে হায়ানাদের মতো। কিছুক্ষণ পর একঝাঁক সেই অদ্ভুত প্রাণী সাবমেরিনটাকে ঘিরে ধরল। প্রাণীগুলো লম্বায় প্রায় তিন ফুট হবে, ওজন সম্ভবত ত্রিশ থেকে চল্লিশ কেজি। অদ্ভুত প্রাণীগুলো শুধু সাবমেরিনের চারপাশে সাঁতার কাটছে আর ঘুরছে, এখন পর্যন্ত কোনো আঘাত বা অন্য কিছু করেনি। একটু ভয় পেল সায়েন্টিস্ট টিংফু, সে দুঃস্বপ্ন দেখছে না তো। পানির ভেতর প্রাণীগুলো তীব্র বিকট শব্দ করছে এবং তাদের শরীর থেকে একধরনের আলো বের হচ্ছে। রিরি সাবমেরিনের সামনের ফ্ল্যাশ লাইট অফ করে দিল, সাবমেরিনের ভেতরেও অন্ধকার। সমুদ্রের জলে মনে হচ্ছে জ্বলন্ত সব অদ্ভুত প্রাণীগুলো খেলা করছে, মনে হচ্ছে এটা কোনো সিনেমার পর্দার ছবি। কিছুক্ষণের মধ্যে সাবমেরিনের পাওয়ার সাপ্লাই বন্ধ হয়ে গেল; সম্ভবত এই প্রাণীগুলো সেটা করছে। একটা চৌম্বকীয় ক্ষেত্র তৈরি হলো চারপাশে, রিরি তার এনার্জি হারিয়ে ফেলছে, বাকি রোবট দুটো আগেই অকেজো হয়ে গেছে। শুধু রিরি বলল-প্রাণীগুলো আমাদের কপোট্রন নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছে তাদের ম্যাগনেটিক ক্ষমতার বলে। সাবমেরিনের ভেতর আবছা অন্ধকার, প্রাণীগুলো দূরে চলে গেলে ঘুটঘুটে অন্ধকার হলো। সায়েন্টিস্ট টিংফুর মনে হলো সে জ্ঞান হারাচ্ছে, রোবট তিনটি ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে।

রিরি’র ডাকে সায়েন্টিস্ট টিংফু জ্ঞান ফিরল।

-কী হয়েছিল রিরি কিছুই বুঝতে পারছি না।

-প্রাণীগুলো অত্যন্ত বুদ্ধিমান এবং ম্যাগনেটিক পাওয়ারের অধিকারী, তারা চাইলেই আমাদের সাবমেরিন ধ্বংস করতে পারত, কিন্তু তারা সেটা করেনি। তারা শুধু আমাদেরকে তাদের এলাকা থেকে বের করে দিয়েছে, আমরা এখন নিরাপদ স্থানে আছি। আমার কপোট্রন তারা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এই কাজ করেছে, কিন্তু আমার কাছে তাদের কন্ট্রোলিং সিস্টেমটি আননোন।

সায়েন্টিস্ট টিংফু আবার সেই ভিডিওগুলো দেখতে শুরু করলেন, এই প্রাণীর ভিডিও সারা দুনিয়ায় তোলপাড় তুলে দেবে। এদের নিয়ে প্রচুর গবেষণা করতে হবে। প্রাণীগুলোর একটা নাম দেওয়া প্রয়োজন ভার্চুয়াল দুনিয়ায় প্রচারের জন্য। ‘অক্টোম্যান’, কারণ এরা দেখতে একইসঙ্গে মানুষ ও অক্টোপাসের মতো। রির’র নামকরণ সায়েন্টিস্ট টিংফুর পছন্দ হলো।

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত