বেটা ভার্সন
আজকের পত্রিকাই-পেপার ঢাকা বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২০, ২৮ শ্রাবণ ১৪২৭
৩০ °সে

করোনাকালের দিনপঞ্জি-১১

ওমেরার প্রতিদিন

ওমেরার প্রতিদিন
ওমেরা ফাতিমা ইব্রাহিম

ওমেরা মনির পুরো নাম ওমেরা ফাতিমা ইব্রাহিম। ওর মা সালমা বিনতে রহমান সুম্মি হলো ডাক্তার। বর্তমানে করোনা রোগীদের সেবা দিচ্ছেন সরকারি হাসপাতালে। বাবা মোহাম্মদ ইব্রাহিম খলিল (FCA) হলেন ব্যাংকার। দুজনেই দুটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন। ওমেরা মনির বয়স এখন তিন বছর এক মাস। যখন থেকে হামাগুড়ি দেয় তখন থেকেই প্রতিদিন বিকেল হলেই খেলতে যায় ওদের চার নাম্বার সেক্টরের পার্কে। বাসায় যখন যে যায় তাকেও সাথে নিয়ে যায় ওমেরা পার্কে। সবুজ ঘাসে হামাগুড়ি থেকেই পার্কের সাথে ওর বন্ধুত্ব। পার্কের দোলনায় কিছুক্ষণ দোল খাবে। খেলনা হরিণে একটু উঠবে। কিছুক্ষণ থাকার পর মামনি যখন নামতে বলে ও নেমে যায়, অন্যরা ওঠে।

প্রায় পনেরো-বিশ দিন পরেই ওদের বাসায় যাই আমি আর অভ্র (আমার ছোট মেয়ে)। বিকেলে ওর সাথে সেই পার্কে। পার্কের পাশে বড়ো বড়ো রাজহাঁস, পুকুরে অনেক ধরনের মাছের খেলা, অনেক ধরনের ফুল। দেখে দেখে একটু একটু করে ওমেরা খেলনা, ফুল এসবের নাম শিখছে। এই শহরে থেকেও ওমেরা এসব দেখে বড়ো হচ্ছে, খুবই ভালো লাগে। এক বিকেলে আমি অভ্র সুম্মি ওমেরাকে নিয়ে পার্কে যাই। ও আমার হাত ধরেই হাঁটছে। হঠাৎ সে দাঁড়াল। দেখছে দুটো ছেলে ব্যাডমিন্টন খেলছে। ওমেরা খেলতে চাইল। আমি একটা ব্যাট ওর হাতে দিলাম, ও ঘুরাচ্ছে। পরের দিন ইব্রাহিম ওমেরাকে ব্যাট কিনে দেয়। অফিস শেষে সুম্মি বিকেলে বাসায় এসে কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়ে ওমেরাকে নিয়ে পার্কে যায়। এটাই একটা রুটিন হয়ে যায় ওদের। কোনোদিন একটু দেরি হলে ওমেরাই বলবে-

‘মাম্মি মাম্মি, পার্ক যাবো, পার্ক যাবো’

একেকদিন একেক খেলনা নিয়ে যায়, কিছুক্ষণ খেলে সন্ধ্যার আগে বাসায় ফেরে। ছোট ছোট করে ওমেরা মনি অনেক কথা শিখেছে। দাদা, বুইজা (দাদি), বড়ো ফুপি সাভারে থাকে, ছোট ফুপি আর আপুরা ফার্মগেটে থাকে। নান্না (নানী) কুমিল্লা থাকে। ওমেরা মনি সব রং চেনে। আধো আধো কণ্ঠে ‘আমার সোনার বাংলা’ গাইতে পারে। ফলের নাম ফুলের নাম শিখেছে। শিখেছে ছড়া (বাংলা ইংরেজিতে)। আরবিও শিখছে। ওর বাবা-মা ওকে একটু একটু করে সব শিখাচ্ছে। ছুটির দিনে সাভারে যায়, দাদা, বুইজা আর বড়ো ফুপির সাথে অনেক খেলা করে। লুকোচুরি খেলে। সন্ধ্যার পর বাবা অফিস থেকে এলেই বাবার সাথে ডেলিসপ-এ যায়, পছন্দের কিছু খাবার বা খেলনা কিনে ঘরে ফেরে।

লকডাউন শুরু হবার পর থেকে ওমেরা বাসায়, কোথাও যেতে পারে না। কেউ বাসায় আসে না। পার্কে যাওয়ার বায়না করে। বাবা-মা বলে দিয়েছে, ‘পুলিশ আংকেল বলেছে, এখন পার্কে যাওয়া যাবে না।’ ওমেরা মনি তা-ই শুনে আছে। বারান্দায় গিয়ে পুলিশ আংকেলকে ডাকে-

‘ও পুলিশ আংকেল, ও পুলিশ আংকেল, আমি পার্ক যাবো।’

পুলিশ আংকেলকে না পেয়ে মন খারাপ করে রুমে আসে। তখন বাবা-মা বুঝিয়ে বলে। ওমেরা ভিডিওকলে কথা বলে সবার সাথে। সাভারে কথা হলেই বলবে, ‘আমি ছোট ফুপির সাথে কুথা বলব।’

ঘরে থেকে কী কী শিখেছে তা-ও শোনায়। হাসপাতাল থেকে ডিউটি সেরে ওর আম্মু পাশের রুমে থাকে। ওমেরা মনিকে জিজ্ঞেস করলে বলে-

‘মাম্মি হাসপাতালে গেসে ওষুধ খাওয়াতে।’

বাবা-মাকে দেখে ওমেরাও পুডিং বানাতে চায়, শরবত বানাতে চায়। আর ওরা ভিডিও করে আমাদের দেখায়। কত্ত দিন ওমেরা মনিকে দেখি না। খুব খুব মিস করি ওকে। বাসা থেকে যখনই কেউ বের হবে ওমেরা মনি বলে- ‘মাস্ক পরো, মাস্ক পরো। বাবাকে বলে, বাবা স্টে হোম, হ্যান্ড ওয়াশ করো।’

জরুরি প্রয়োজনে নিজেদের গাড়িতে করে ওমেরা বাবা-মায়ের সাথে বাসা থেকে বের হয় জুলাই মাসের ২ তারিখে। বাইরে বের হয়ে ওমেরা আকাশ দেখে বলে-

‘বাবা, বাবা, আকাশ কত বড়ো।’ অনেকদিন বারান্দা দিয়ে ছোট আকাশ দেখেছে বলে বড়ো আকাশের কথা সে ভুলেই যায়। অনেক খুশি হয় বাইরে থেকে বড়ো আকাশ দেখে। ওমেরা বাবা-মায়ের মতো নিজেও মাস্ক পরে বাইরে গেছে।

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত