বৈজ্ঞানিক কল্পগল্প

ফেরা

ফেরা
অলঙ্করণ : সাফিয়া হক রাইসা, চতুর্থ শ্রেণি, ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজ, ঢাকা

বারান্দায় গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আছে আশা। প্রকৃতিতে চলছে বৃষ্টি আসার প্রস্তুতি। ইতোমধ্যে ঠান্ডা বাতাস শুরু হয়েছে। বারান্দায় দক্ষিণ দিক বরাবর বাঁশঝাড়ের দিকে তাকিয়ে আছে সে। ঝড়ো বাতাসের বেগে বাঁশের ঝাড়টির অগ্রভাগ এদিক থেকে ওদিক হেলে পড়ছে। আশার দৃষ্টি আটকে আছে সেদিকে।

হ্যাঁ, ঠিক এমন একটা দিনেই তার সাথে দেখা হয়েছিল আশার। তার স্পষ্ট মনে আছেসেদিনও ছিল এমন এক ঝড়ের রাত। সে তার বিছানায় ঘুমিয়ে ছিল। হঠাৎ সে শুনতে পেল কেউ যেন দরজায় টোকা দিচ্ছে। ঘুম ভেঙে গেল তার। আশাদের বাড়িটা মধ্যম সাইজের একটি দোতলা বাড়ি। ওপর তলায় কয়েকজন ভাড়াটে তাদের পরিবার নিয়ে থাকে। নিচের তলায় সে ও তার পারিবার থাকে। রাতে এরকম দরজায় টোকা পড়ায় সে কিছুটা অবাক হয়। কারণ বাবা-মা পাশের ঘরে ঘুমিয়েছে অনেক আগেই। তাছাড়া তাদের কোনো প্রয়োজন হলে আশাকে ডেকেই তুলত তারা। পুনরায় টোকা দেওয়ার শব্দে তার ভাবনাভঙ্গ হলো। ভাবল ‘কেবলে একবার ডাকবে কি না! কিন্তু পরক্ষণেই ভাবল, আচ্ছা দরজাটা খুলেই দেখা যাক!

দরজা খুলতেই আশার বুক ধক করে উঠল। চোখের সামনে একটা প্রাণী দাঁড়িয়ে আছেযার শরীরটা দেখতে অনেকটা বিড়ালের মতো। শুধু অতিরিক্ত মানুষের মতো দুটি হাত ও দুটি পা রয়েছে। আবার কিছুটা মানুষের মতোও। তার শরীরটা বৃষ্টিতে ভিজে গেছে। আশা খানিকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল। সে ভাবতেও পারেনি এরকম একটি পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে তাকে। সে এবং একটি অদ্ভুত প্রাণী মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেযার কোনো পরিচয় তার জানা নেই। তাদের মাঝে রয়েছে শুধু একটি খোলা দরজা। দরজার এপাশে সে এবং দরজার ওপাশে সেই চির অচেনা প্রাণীটি।

প্রাণীটি যেন আশার মনের অবস্থা বুঝতে পারল। যান্ত্রিক গলায় সে বলে উঠল, ‘ভয় পেয়ো না আশা। তোমাদের কাছে আমি একটি এলিয়েন। আমি তোমার কোনো ক্ষতি করব না।

আশা আবারও একটি ধাক্কা খেল। প্রাণিটা মানুষের মতো কথা বলছে! কথাবলার সময় সে স্পষ্ট দেখল, বিড়ালের মতো ছোট ছোট কয়েকটি দাঁতও তার রয়েছে। বিদ্যুৎহীন অন্ধকারেও দাঁতগুলো জ্বলছে। আশার একটু ভয় ভয় করতে লাগল। সে ভয়ে ভয়েই বলল, ‘আপনি আমার নাম জানলেন কী করে?’

আবারও প্রাণীটির যান্ত্রিক গলা শোনা গেল, ‘তোমাদের এই সৌরজগতের ৫ নম্বর গ্রহ ইউরেনাস-এ আমরা থাকি। আমার কাছে একটি ছোটখাটো যন্ত্র আছে যা দিয়ে আমরা কোনো প্রাণির দিকে তাকালেই তাদের ‘বায়োডাটাবুঝতে পারি। এই যন্ত্র দ্বারাই আমরা নিম্নশ্রেণির জীব থেকে শুরু করে সকল প্রাণির সাথে তথ্য আদান-প্রদান ও কথা বলতে পারি। এই যেমন এখন আমি তোমার সাথে কথা বলছি।

আশা হয়তো কিছুটা বুঝল। সে ক্লাস সেভেনে পড়ে। তার ক্লাসের বিজ্ঞান বইতে সে সৌরজগৎ ও ইউরেনাস সম্পর্কে পড়েছে। প্রাণীটির প্রতি যেন সে আগ্রহ বোধ করল এবং ভয়ও কমে গেল। বোধহয় সেই আগ্রহ থেকেই আশা প্রাণীটিকে বলল, ‘আপনি ভেতরে আসুন

প্রাণীটা ছোট ছোট লাফ দিয়ে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করল। আশা তার উদ্দেশে বলল, ‘আপনি বসুন

প্রাণীটি বসল না। টেবিলের ড্রয়ার থেকে দেশলাইয়ের বাক্সটা বের করে একটি মোমবাতি জ্বালিয়ে টেবিলের ওপর রাখল আশা। মোমবাতির হালকা হলুদ আলোয় প্রাণিটাকে খুবই অদ্ভুত লাগছে। একটি ছোট বাক্স তার বাম ঊরুর সাথে সেঁটে আছে। তার দিকে তাকিয়ে আশা বেশ কৌতূহল নিয়েই বলল, ‘আপনারা কি মাঝে মাঝেই পৃথিবীতে আসেন?

আবারও যান্ত্রিক গলা কথা বলে ওঠে, ‘আমরা বিভিন্ন গ্রহ, নক্ষত্র, ছায়াপথ, পরিদর্শন করে বেড়াই। আজ আমরা এসেছিলাম পৃথিবীর বৃষ্টি দেখার জন্য। পৃথিবীর বৃষ্টি অনেক সুন্দর। আমরা ১৭ জনের একটি দল আমাদের নভোযান নিয়ে তোমাদের বাসার দক্ষিণ দিকের বাঁশঝাড়টায় নামি। নভোযান থেকে সবাই নামার কিছুক্ষণ পর বেশ ঝড়ো বাতাস শুরু হলো। এর মধ্যেই আমরা সেখানে এক অদ্ভুত প্রাণীর উপস্থিতি টের পেলাম। আমাদের সাথে থাকা স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র বলল, এটি ফক্স বা খোঁকশিয়াল। প্রাণীগুলো দলবেঁধে আমাদের দিকে আসতেই আমরা ভীষণ ভয় পেয়ে যাই। আমাদের সবাই যে যেদিকে পারে ছুটে পালাল। আমি একটু বেশিই ভয় পেয়েছিলামযার কারণে আমি দলচ্যুত হয়ে পড়ি। ভয় কমার পর সেখানে গিয়ে দেখি, আমাদের নভোযানটি নেই। সঙ্গীরা সবাই আমাকে ফেলে পালিয়েছে। এরই মধ্যে শুরু হলো বৃষ্টি। উপায় না দেখে আমি এখানে চলে এলাম।

আশার খুব মায়া হলো প্রাণিটার কথা শুনে। সে নিজেও শেয়ালকে অনেক ভয় পায়। রাতে ঘুমানোর সময় সে বাঁশবাগান থেকে শেয়ালের ডাক শুনতে পায়। তার নিজেরই ভীষণ ভয় করে আর সেখানে এ তো ভিনগ্রহের একটি প্রাণী। ভাবতে ভাবতে আশার মনে হলো, আরে তার নামটাই তো শোনা হলো না! সে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনার নাম কী?’ প্রাণীটি এক শব্দে জবাব দিল, ‘টিনি

ধীরে ধীরে আশা প্রাণীটির সাথে সাবলীল হয়ে যায়। অনেক কথা, অনেক প্রশ্ন, অনেক জানা-অজানা তথ্য জানল আশা। টিনি আশাকে তাদের গ্রহের ছবি আঁকানো শেখাল, ম্যাজিক শেখাল, আশা বহু তথ্য জানতে পারল তাদের জীবনধারা সম্পর্কে। একসময় ভোরের আলো ফুটতে শুরু করে। এমন সময় টিনির ঊরুর ওপর বাক্সটা কথা বলে উঠল, ‘মি. টিনি কাল রাতে আপনাকে ফেলে আসার জন্য আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত। আমাদের সাথে থাকা স্যাটেলাইট সর্বদা আপনার প্রতি লক্ষ রেখেছে। আপনি যেখানে আছেন সেখান থেকে পূর্বদিকে ৬০ মিটার দূরের পুকুরপাড়ে আপনার জন্য আমরা অপেক্ষা করছি। ভোর হয়ে আসছে আর বেশিক্ষণ থাকা আমাদের উচিত হবে না।

বাক্সটার কথা বলা শেষে হলো। ঘর জুড়ে নিস্তব্ধতা। নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করল টিনি। সে বলল, ‘আমাকে এখন যেতে হবে আশা। তুমি খুব বুদ্ধিমতী এবং ভালো মেয়ে। আমি আবারও আসব তোমাকে দেখতে।

‘কবে আসবেন’, আশা বলল।

‘সেটা বলা অসম্ভব। আমাদের বিভিন্ন জায়গা পরিদর্শনে যেতে হয় এবং এভাবেই আমরা শিখি। আমাদের এই পড়াশোনা শেষ না হলে আমরা ইচ্ছামতো যেখানে খুশি সেখানে যেতে পারি না। আমাদের শিক্ষাপদ্ধতি মেধানির্ভর তাই আগে থেকে বলা সম্ভব নয় যে কবে আমাদের এই শিক্ষা সমাপ্ত হবে। তুমি ভালো থেকো। আমি আবারও আসব।বলেই প্রাণীটা সামনের দিকে অগ্রসর হলো। ততক্ষণে ভোর হয়ে এসেছে।

তখন থেকে সুযোগ পেলেই বারান্দায় এসে টিনির অপেক্ষায় থাকে আশা। কবে আসবে টিনি? গভীর মমতায় চোখ বড়ো বড়ো করে বাঁশবাগানের দিকে তাকিয়ে থাকে সে।

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত