গল্প

নদীর কান্না

নদীর কান্না
অলঙ্করণ : মাহরুস ইরম, দ্বিতীয় শ্রেণি, বি.এ.এফ শাহীন কলেজ, ঢাকা

অবশেষে ঘুমিয়ে পড়ে নদী। এতক্ষণে একটু যা শান্তি। সেই সকাল থেকে একটানা কেঁদেই চলেছে। বৃষ্টিতে বন্ধু গাছের সাথে খেলবে সে, কথা বলবেই। গোঁ ধরে বসে আছে। বাবা অফিসে যাওয়ার আগে সেই সকাল থেকেই ঝুম বৃষ্টি। থামবার নাম নেই। বৃষ্টির ধারা অঝোরে ঝরছেই।

অফিসে যাওয়ার সময় নদীকে আদর করেই তবে বাবা বেরোয়।

নদী কোথায়? কই নদী? বাবা খোঁজেন। মা খোঁজেন। ঠাম্মা খোঁজেন। না, নদী ঘরের কোথাও নেই। ঠাদ্দা দেখেন, নদী বাসার সামনের বারান্দার সিঁড়িতে নেমে জবা গাছের ডাল পাতা ফুল ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছে। অঝোর বৃষ্টিধারার ঝাটকা এসে নদীর চোখে মুখে শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে। ইতোমধ্যে নদী কাকভেজা হয়ে গেছে।

ভিজে একেবারে একাকার হয়ে গেল যে মেয়েটা! হায় হায় করে ওঠেন ঠাম্মা। মা দৌড়ে গিয়ে কোলে করে ঘরের ভেতর নিয়ে আসেন নদীকে। ভেজা মাথা হাত মুখ মুছে দেন। পরনের জামা-কাপড় পালটে দেন তাড়াতাড়ি।

সেই থেকেই কাঁদছে নদী।

না আমি সিঁড়িতে খেলব। আমি বৃষ্টিতে খেলব। আমার বন্ধু গাছের সাথে খেলববলে বলে কাঁদছে তো কাঁদছেই। থামানোর কোনো উপায় নেই।

বাবা অফিসে যাওয়ার সময় প্রতিদিনের মতো অনেক আদর করেন। বললেন, নদী মা, তোমার জন্যে তোমার প্রিয় চকলেট, নুডুলস আনব অফিস থেকে আসার সময়। বৃষ্টিতে ভিজতে নেই মা! সিঁড়িতে খেলতে গিয়ে ভিজলে যে তোমার আবার অসুখ করবে মামনি। কে শোনে কার কথা! সেই একই সুরে কান্নার ধারা।

না আমি খেলব। সিঁড়িতে খেলব। বন্ধু গাছের সাথে খেলব।

ঠাম্মা কোলে নিয়ে অনেক আদর করেন। কিছুতেই কিছু হয় না। সেই একই সুর নদীর। মা শোকেস থেকে ছোটমামার কিনে দেওয়া নদীর প্রিয় লাল পুতুল হাতে দিলেন। না, তাতেও তার কান্নার গতি সেই একই ধারায় প্রবহমান।

সকালে অফিসে যাওয়ার আগে, বাবার সাথে নাস্তার টেবিলে অর্ধেক ডিম আর এক পিস পাউরুটির খানিকটা ছিঁড়ে খেয়েছে নদী। সেই থেকে এ যাবৎ কিচ্ছু খায়নি সে। বাবা অফিসে চলে গেলেন। মা নদীকে খাওয়ানোর অনেক চেষ্টা করেন। সব চেষ্টা বিফলে। না কিচ্ছু খাবে না সে। সিঁড়িতে নেমে তার বন্ধু গাছের সাথে খেলবেই, কথা বলবেই।

নদীর বন্ধু গাছ। জবা ফুল গাছ। প্রতিদিন অনেক লাল ফুল ফোটে এ গাছে। জবা ফুল গাছটা বাসার সামনে ছোট্ট উঠোনে সিঁড়ির পাশেই। ওপর থেকে দুই সিঁড়ি নিচ বরাবর দাঁড়িয়ে নদী কথা বলে। প্রতিদিন নদী স্কুল থেকে ফিরে বিকেলে ওর বন্ধু গাছের সাথে কথা বলে। নানান কথা। অনেক কথা। ওর বন্ধু গাছ জবা ফুল গাছের ছোট্ট ডাল-শাখা ছুঁয়ে ছুঁয়ে, আদর করে কথা বলে নদী। তার সবুজ পাতা, লাল ফুলকে আদর করতে করতে নানান আলাপ জমায়। তার বন্ধু গাছের লাল জবা ফুল কাউকে ছিঁড়তে দেয় না নদী। সে ভাবে, বন্ধু গাছের ফুল ছিঁড়লে বন্ধু গাছ তো ব্যথা পাবে। কান্না করবে।

নদীর প্রথম শ্রেণির ক্লাস টেস্ট পরীক্ষা শেষ হলো গতকাল। বাবা অফিসে যাওয়ার পরপরই প্রতিদিন নদীকে স্কুলে সাথে করে নিয়ে যান মা। আজও ক্লাস ছিল। খুব সকাল থেকে অঝোরে একটানা বৃষ্টি হচ্ছে বলে আজ স্কুলে নেননি নদীকে।

দুপুর গড়াতে বাকি নেই আর। সেই থেকে বিছানায় কেঁদে কেঁদে একপর্যায়ে নিজে থেকেই ঘুমিয়ে পড়ে নদী।

সপ্তাহের শেষের দিন দু টা পর্যন্ত বাবার অফিস। বাবা বাসায় ফিরেন। মা বলেন, সকাল থেকে একটানা কেঁদে কেঁদে খানিক আগে ঘুমিয়ে পড়েছে। খায়ও নি কিচ্ছু মেয়েটি। ওকে ঘুম থেকে ডেকো না। বৃষ্টিরও যে মাথা খারাপ হয়েছে। সেই সকাল থেকে একটানা ঝরছেই। এখনো থামবার নামখানি পর্যন্ত নেই।

বাবা বললেন, না, ঠিক আছে। তাহলে ঘুমাক। বৃষ্টিতে ভিজে অসুখ বাঁধানোর চেয়ে ঘুমানো অনেক ভালো।

আমি বৃষ্টিতে ভিজব না বাবা। বৃষ্টিতে সিঁড়িতে নেমে বন্ধু গাছের সাথে কথা বলব না বাবা, বলতে বলতে নদী বিছানায় শোয়া থেকে উঠে বসে। বাবা ম’র কথার ফাঁকে কখন যে নদী জেগে উঠেছে খেয়ালই করেননি।

এইতো আমার লক্ষ্মী মা নদী আমারবলে বাবা অফিসের ব্যাগ হাত থেকে রেখে নদীকে কোলে তুলে বুকে জড়িয়ে নেন।

বাবা, আমার গাছ বন্ধু বলেছে, বৃষ্টিতে ভিজে তার সাথে কথা বললে আমার অসুখ করবে। আমার অসুখ করলে বন্ধু গাছের অনেক কষ্ট হবে। আমি বৃষ্টিতে ভিজে বন্ধু গাছের সাথে কথা বলার জন্য আর কান্না করব না বাবা।

ওমা! তোমার গাছ বন্ধু তোমাকে একথা বলেছে! কখন বলল! বাবা আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করেন। মা, বাবার কথা শেষ হতে না হতেই বললেন, হুঁ, বুঝেছি নদী মামনি। স্বপ্নে তোমার বন্ধু গাছ তোমাকে এ কথা বলেছে, তা-ই তো?

নদী মুখে তেমন কিছু না বলে খানিকটা উদাস চেয়ে থেকে মাথা কাত করে সায় দেয়হুম! ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে ভালো একটা স্বপ্ন দেখেছে তাহলে আমার মেয়েবলতে বলতে মা নদীর ডান গালে দু আঙুলের মিষ্টি চিমটির আদররেখা এঁকে দেন।

মা, আমার ক্ষিধা পেয়েছে তো! আমি খাব।

বাবা বললেন, ও হো! আমার নদী মামনির ক্ষিধা পেয়েছে। চলো, চলো আমরা আজ বাবা-মেয়ে একসাথে খাব, চলো চলোবলতে বলতে বাবা মা’র সাথে হেসে হেসে নদী ডাইনিং রুমের দিকে এগিয়ে যায়।

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত