কারোনাকালের দিনপঞ্জি-১৭

নাটাই-ছেঁড়া ঘুড়ি

নাটাই-ছেঁড়া ঘুড়ি
নাবিদ রহমান তুর্য্য ও বোন নওশীন তাবাসসুম তৃণা

সকালে ঘুমটা তাড়াতাড়ি ভেঙে গেল, কারণ ১১টায় পৃথিকা, আয়শা, তাহারাত আসবে। ওদের সাথে গল্প হবে আড্ডা হবে মজা হবে। কিন্তু ভেবো না ওরা বাসায় আসবে আমাদের। ওরা আসবে স্টিমইয়ার্ডের লাইভে। সেখানে স্কুলের বই থেকে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আমরা আলোচনা করি, গল্প করি, কুইজ কুইজ খেলি। আমরা বাজি ধরি কে কত জেলার নাম, দেশের নাম, রাজধানীর নাম বলতে পারে। পৃথিকা প্রচুর বই পড়ে, ও মাঝে মধ্যে সেসব বইয়ের গল্প শোনায় আমাদের। আমিও গত সপ্তাহে ওদের গুড্ডু বুড়ার গল্প শোনালাম।

এছাড়া আমি গান শোনাই ওদের।ওরা আমার গাওয়া লালন গান খুব পছন্দ করে। আর প্রতিদিন লাইভের শেষ দিকে আমরা সবাই মজা করে ধাঁধা খেলি। এভাবে কখন যে দুপুর দেড়টা-দুইটা বেজে যায়, বোঝাই যায় না। মাঝে মধ্যে আম্মু যখন বলে, এই শেষ করো, তখন দ্রুত শেষ করি আমাদের আড্ডা। এভাবেই চলছি সেই এপ্রিল মাস থেকে। প্রথমে যখন মার্চ মাসে আমাদের স্কুল সরকারের ঘোষণার সাথে সাথে বন্ধ করে দিল, তখন মনে করেছিলাম হয়তো এক-দু’মাসের মধ্যে সব ঠিক হয়ে যাবে।

কিন্তু না! হলো না। এই করোনার কারণে কতদিন যে দেখা হয় না অস্কার, তাহসীন, ড্যানিয়েলের সাথে। খুব মিস করছি স্কুল, স্কুলের লাইব্রেরি রুম আর আমাদের মনোহর স্যারকে।

জানো, বাসায় আমি বই পড়তে থাকি কিংবা গানের রেওয়াজ অথবা ছবি আঁকতে থাকলেও কীভাবে যেন মনে মনে স্কুলের কথা চলে আসে। আগে তো কখনো এমন হয়নি আমার।

পুরো রমজানে সকালে একটু দেরি করে ঘুম থেকে উঠতাম, কারণ রাতে তিনটায় উঠে তাহাজ্জুত নামাজ পড়ে সেহেরি খেয়ে আবার ফজর নামাজ পড়ে ঘুমাতাম আমরা। দুপুরে খাওয়ার দরকার ছিল না তখন, শুধু নামাজ পড়ে বই পড়তাম। তখন আমাদের ইউটিউব চ্যানেলের জন্য ছবি আঁকার অনেকগুলো ভিডিও বানিয়েছিলাম। প্রথম দিকে টিভি দেখে অনলাইনে পত্রিকা পড়ে করোনা বিষয়ে সচেতনতামূলক কিছু ভিডিও বানিয়েছি।

যা আমাদের ইউটিউব চ্যানেল (TrinaTurjo) আর ফেসবুক (TrinaTurjo) পেজে গেলেই তোমরা দেখতে পাবে। আগে বাসার ছাদে আমাদের খুব একটা ওঠা হতো না। তবে এখন করোনার কারণে প্রতিদিন বিকেলে ছাদে ওঠা নিয়ম হয়ে গেছে। জানো, আশপাশের প্রতিটি ছাদেই অনেক ভাইয়া আপুরা ওঠে বিকেলে। শুধু আমাদের পাশের বাসার আলিফ আর ওর ছোট্ট বোনটা প্রতিদিন ব্যালকনিতে বসে বসে আমাদের সবাইকে দেখে, ওরা ছাদে ওঠে না। কেন ওঠে না তা জানি না।

ওহ একটা মজার বিষয় বলি। গত বছর অনেক চেষ্টা করেও আমি ঘুড়ি ওড়াতে পারিনি। তবে এবার আমি কিন্তু ঘুড়ি ওড়ানো শিখে গেছি। নাটাই ও ঘুড়ি বাঁধায় ছোট মামা আর আম্মু আমাকে প্রথম প্রথম খুব হেল্প করেছে। এখন আমি নিজেই ঘুড়ি উড়াই, অনেক দূর পর্যন্ত ওড়ে আমার ঘুড়ি। মাঝে মধ্যে মেঘের কাছাকাছি চলে যায় আমার ঘুড়ি। তখন মনে হয় আমি নিজেই মেঘের কাছে চলে গেছি। কী যে মজা লাগে, সত্যি বলে বোঝাতে পারব না তোমাদের।

তবে কষ্টের বিষয় কী জানো, এর মধ্যে আমার তিনটা ঘুড়ি সুতা কেটে উড়ে গেছে। একটা ছিল আমার সুতা ঠিকমতো গিঁঠ দিতে না পারার কারণে। নাটাই-ছেঁড়া ঘুড়িটার জন্য সেদিন যে কী কষ্ট লেগেছে, তা তোমাদের বলে বোঝাতে পারব না। প্রচণ্ড কষ্টে সে রাতে ঘুমাতেও পারিনি ঠিকমতো ।

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x