গল্প

সেরা বাবা

সেরা বাবা
অলঙ্করণ : সায়মা আহাদ খান, সপ্তম শ্রেণি, তেজগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, ঢাকা

গেইমস খেলতে খেলতে খুকি কখন যে পড়ার টেবিলে ঘুমিয়ে পড়ল তার মা জানে না।

আর এদিকে খুকির বাবা এখনো অফিস থেকে ফেরেনি। মা সবসময় চিন্তিত থাকে। চারদিকে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। হঠাৎ কলিং বেল বেজে উঠল

মা দরজা খুলে দিলো। জানতে চাইলতোমার অফিসে সবাই সুস্থ আছে তো?

হ্যাঁ, আল্লাহর রহমতে সবাই ভালো আছে। খুকি কই? ওকে দেখছি না যে।

ও তা-ই তো, আমি তো ওর কথা ভুলেই গেছি কাজের চাপে । মা তাড়াতাড়ি রুমে গিয়ে দেখেখুকি গেইমস অন রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে।

ওকে ডাকো, ও ভাত খাবে না?

এর মধ্যে খুকির বাবাওয়াশরুমে গিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে খাওয়ার টেবিলে আসলো। খুকি ততক্ষণে খাবার টেবিলে এসে বসেছে। খুকিকে দেখে বাবা তাকে আদর করে বুকে টেনে নেয়।

আচ্ছা, খুকি, তুমি এত তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েছো কেন?

কোনো উত্তর নেইমুখ ফুলিয়ে বসে আছে।

খুকির মা’র কাছে জানতে চাইলখুকির মন খারাপ কেন? মা বলল, ও কিছু না। হয়তো ঘুম থেকে উঠেছে তাই।

তারপর খাওয়া শেষ করে সবাই রুমে ঘুমাতে গেল। খুকিও ঘুমিয়ে পড়েছে।

সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে খুকির বাবা অফিসে চলে গেল। খুকি ঘুম থেকে উঠে নাস্তা সেরে পড়তে বসল। খুকির বয়স মাত্র সাত বছর। গতরাতে চমৎকার একটি কাজ করেছে সে। ওটা নিয়েই এখন ভাবছে। বাবার বালিশের নিচে একটি চিঠি লিখে ভাঁজ করে রেখে দিয়েছিল। চিঠিতে লিখেছেআগামীকাল আমার জন্মদিন। আমার জন্য উপহার ও চকলেট নিয়ে এসো।

পড়ার টেবিলে বসলেও মন তার মায়ের দিকে। মনে মনে ভাবতে লাগলআমার দেওয়া চিঠিটা কি বাবা-মা’র হাতে পড়েনি? তারা কি জানে না, আজ আমার জন্মদিন? এ কথা ভেবে ভেবে সে মন খারাপ করে বসে আছে আর ভাবছেআচ্ছা, বাবা-মা প্রতি বছর আমার জন্মদিন ধুমধামে পালন করে। কিন্ত এবছর তো আমার জন্মদিন পালন করার কথা তাদের মনেই নেই। মন খারাপ করে বাইরে গিয়ে বারান্দার গ্রিল ধরে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।

সন্ধ্যা প্রায় ঘনিয়ে আসছে। মনে মনে আকাশকে বলল, আকাশ, তুমি কি জানো আজ আমার জন্মদিন? আজ আমার খুব মন খারাপ। আকাশ বলল, কেন? কারণ প্রতিবার জন্মদিন এলে বাবা-মা কতকিছু গিফট নিয়ে আসে। বেলুন দিয়ে ঘর সাজিয়ে কেক কেটে জন্মদিন পালন করে। এবার বাবা-মা দুজনেই আমার জন্মদিনের কথা ভুলে গেছে। কিছুই ভালো লাগছে না আমার। আমার আর কোনো ভাইবোন নেই। বন্ধুদের কাছে যাওয়াও এখন বারণ। আমি একা একা খেলি আর বাইরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে তোমাকে দেখি। তুমি কি আমার বন্ধু হয়ে একটি ইচ্ছে পূরণ করবে? চলো আজ দুজনে মিলে একসাথে পাখির মতো ওড়ে বেড়াই। ঐ যে দেখছো নদীর ধারেহিজলবন। ওখানে আমার নানাবাড়ি। চলো, একসাথে ঘুরে আসি।

আকাশ বলল, আমি বন্ধু হতে পারি, তবে তোমাকে তো এই মুহূর্তে খুশি করতে পারবো না। ওপরের আকাশের দিকে তাকাও, দেখচারদিকে মেঘ জমেছে। একটু পর বৃষ্টি হবে। এটা শোনার পর খুকির মনটা আরো খারাপ হয়ে গেল। হঠাৎ ঘরের ভেতর থেকে তার মা’র গলা শোনা গেল

খুকি, এদিকে এসো। সে খুশি মনে মায়ের কাছে গেল। ভেবেছিল মা তাকে হয়তো জন্মদিনের কথা বলবে, কিন্তু মা তা না করে তাকে মুড়িমাখা খাইয়ে বলল, এখন বিকেলবেলা, একটু ঘুমাও। ওর মন আরো খারাপ হয়ে যায়। সে সিদ্ধান্ত নেয়, ঘুমাবে না। মনে মনে বলে, মা কি আমার জন্মদিনের কথা একেবারেই ভুলে গেছে? ওর উত্তর মেলে না। মন খারাপ করে পড়ার টেবিলে বই নিয়ে নাড়াচাড়া করতে থাকে, কিন্ত পড়ায় মন নেই। একসময় বইয়ের ওপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ে খুকি। মা সব কাজ শেষ করে কোরান পড়তে বসল। খুকির মা সত্যি সত্যি মেয়ের জন্মদিনের কথা ভুলে গেছে। করোনাকালে ঘরবন্দি থাকতে থাকতে সব আনন্দ, খুশি ভুলে গেছে। সন্ধ্যার আগে হঠাৎ কলিং বেল বেজে উঠল

কলিং বেলের শব্দে খুকির ঘুম ভেঙে গেল। মা তাকে ডেকে দরজা খুলে দিতে বলল।

খুকি দরজা খুলে তো মহাখুশি! যেন চারদিকে ফুলের বাগান। দরজার মুখে লাগানো অনেকগুলো বেলুন ও ফুলের তোড়া দেখে খুশিতে তার মাকে ডাকবে এমন সময় বাবা বলে উঠল

হ্যাপি বার্থডে,

হ্যাপি বার্থডে টু ইউ

হ্যাপি হ্যাপি... হ্যাপি বার্থডে ডিয়ার খুকি

হ্যাপি বার্থডে টু ইউ...

বাবা খুকিকে জড়িয়ে ধরে আদর করতে করতে বললআমার জানপাখি, কলিজার টুকরো, গতরাতে বালিশের নিচে রাখা তোমার সেই আমি চিঠি পেয়েছি। তোমার মাকেও বলিনি। তবে মনে মনে ভাবছিলাম যে অফিস থেকে ফেরার পথে তোমার কেক, চকলেট বেলুন ও গিফট নিয়ে আসবো। এই নাও তোমার গিফট...

বাবার কণ্ঠ শুনে খুকির মা বেরিয়ে এলেন। হায় আল্লাহ, আমি তো ভুলেই গেছিলামআজ আমার মেয়ের জন্মদিন।

অবশেষে সবাই মিলে কেক কেটে জন্মদিন পালন করল। কত আনন্দ, কত খুশিতে ঘরটা যেন অনেকদিন পর প্রাণ ফিরে পেল। হঠাৎ খুকি মনে মনে বলতে লাগল, পৃথিবীর সেরা আপনজন হলো বাবা-মা। তারপর বাবাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে খেতে বলল, আমার বাবাই পৃথিবীর সেরা বাবা। আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি বাবা...

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত