গল্প

সাইকেল

সাইকেল
অলঙ্করণ : সোহেল আশরাফ

পিয়াসের মনটা ক’দিন থেকে বেশ খারাপ। কোনোকিছুতেই তার মন বসছে না। পড়ার টেবিল, খেলার মাঠ, নদী কোনোকিছুই তাকে টানছে না। উদাস দৃষ্টিতে সারাক্ষণ আকাশপানে চেয়ে থাকে। পাখিদের ওড়াওড়ি দেখে। তার মনে হয়, পাখিদের মতো উড়তে পারলে খুব ভালো হতো। পাখিদের কোনো দুঃখ নেই, ওরা ইচ্ছেমতো মনের আনন্দে ডানা মেলে দিগ্বিদিক উড়ে বেড়ায়। এই পৃথিবীতে তাকে বোঝার মতো কেউ নেই। না বোঝেন বাবা, না বোঝেন মা! ছোট্ট একটি স্বপ্ন তার, ছোট্ট একটি আবদার। তবু কেন যে বাবা-মা সেটি পূরণ করছে না!

এখন মধ্য দুপুর, পিয়াস গাছগাছালির ছায়াঘেরা একটি নির্জন জায়গায় একা বসে আছে। তার উজ্জ্বল মুখটা যেন কালো মেঘে ঢেকে আছে। ঝিরিঝিরি বাতাস বইছে। নানান জাতের পাখপাখালির কলকাকলিতে জায়গাটি একেবারে মুখরিত হয়ে আছে। গাছ, পাখি, আকাশ সবকিছুর কথা ভেবে পিয়াসের চোখ দুটো পানিতে ভরে ওঠে। পিয়াসের ছোট্ট শরীরটা একটি শিশু গাছের সাথে হেলানো রয়েছে আর পা দু’খানা সামনের দিকে ছড়ানো। বনের পাখিরা পিয়াসের দুঃখ অনুভব করে তার দিকে এগিয়ে আসে। পিয়াসকে জিজ্ঞেস করে,

কী হয়েছে তোমার? মন খারাপ করে বসে আছো কেন?

পিয়াস এবার হাইমাউ করে কেঁদে ফেলে। পাখিরা হতচকিত হয়ে যায়। সবাই একে অপরেরর দিকে মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে থাকে।

একটি ফিঙে, পিয়াসের আরো একটু কাছে এসে জিজ্ঞেস করে, কী হয়েছে তোমার?

পিয়াস কিছুটা অভিমানের সুরে ধরা গলায় বলে,

‘কী হবে বলো! এতদিন হলো একটি সাইকেল কিনতে চাচ্ছি, তা-ও দিচ্ছে না। আমার বন্ধুদের সবাই সাইকেল নিয়ে স্কুলে যায়। ওরা মাঝেমাঝে সাইকেল নিয়ে অনেক দূরে ঘুরতে চলে যায়। আমি ওদের সাথে যেতে পারি না। জানো, আমার কত খারাপ লাগে! ওদের বাবা-মা কত ভালো, কতকিছু কিনে দেয়, একটি সাইকেল, সেটিই কিনে দিচ্ছে না আমাক।’

কথাগুলো একনাগাড়ে বলে পিয়াস ফিঙের দিকে ফ্যালফ্যাল করে একদৃষ্টে চেয়ে থাকে।

ফিঙে বিষয়টি বুঝতে পারে এবং একটু মুচকি হাসে যদিও সেটি পিয়াস মোটেও লক্ষ করে না। ফিঙে বলে,

‘আচ্ছা, বুঝতে পেরেছি, এবার শোনো, বাবা-মা’র ওপর রাগ করে না, কেমন! তারা তোমাকে সাইকেল কিনে দেবে না, এমন তো বলেনি! বলেছে কয়টা দিন অপেক্ষা করতে। তুমি তোমার বন্ধুদের কথা বলছো, ঠিক আছে, কিন্তু তুমি এটি জানো না যে, তোমার বন্ধুর বাবারা অনেক বড়োলোক। তোমার বাবার তো অত টাকা নেই ওদের মতো! আর সেজন্যেই তোমাকে কয়টা দিন অপেক্ষা করতে বলেছে। পাগল ছেলে, বাবা-মা’র ওপর রাগ করে এখানে বসে আছে! এখানে কে আছে তোমার? বাবা-মা-ই তো সব। যাও বাড়ি ফিরে যাও, দেখ গিয়ে তোমার বাবা-মা তোমাকে কীভাবে খুঁজে বেড়াচ্ছে!’ ফিঙে আরো বলে,

‘এসো, এবার আমার পিঠে এসে চেপে বসো, আমরা দুজনে কিছুটা সময় ঐ নীলাকাশে উড়ে উড়ে ঘুরে বেড়াবো।’

পিয়াসের মুখটা এবার খুশিতে ডগমগ হয়ে ওঠে।

পিয়াস বাড়ি এসে দেখে, তার মা কান্নাকাটি করে হুলুস্থুল এক অবস্থার সৃষ্টি করেছেন, বাবা তার খোঁজেই এখনো বাড়ির বাইরে। পিয়াসকে দেখেই মা দৌড়ে এসে তাকে দু’হাতে জাপটে ধরে আদর করতে থাকেন আর কাঁদো কাঁদো গলায় বলেন,

‘কোথায় গিয়েছিলিরে পাগল ছেলে! তুই না থাকলে আমার কী হবে রে! আর কখনো এমন করবি না, বল?’

পিয়াস তার মায়ের চোখের পানি মুছে দিয়ে বলে,

‘মা আমার ভুল হয়ে গেছে, আর কখনো এমন করবো না। তোমাদের মনে আর কখনো এভাবে কষ্ট দেবো না।’

Nogod
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত