মুক্তিযুদ্ধের কিশোর গল্প

ছোটো মুক্তি

ছোটো মুক্তি
অলংকরণ : সায়মা আহাদ খান, সপ্তম শ্রেণি, মনসিজ আর্ট একাডেমি

চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলের সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া ছাত্রদের মধ্যে হইচই পড়ে গেল। ক্লাসে নোটিশ এসেছে আজ একজন মুক্তিযোদ্ধা আসবেন, মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনাবেন। শ্রেণি-শিক্ষক, গণিত স্যার, ডি এল সাহা বললেন, ‘তোমরা সবাই ওনাকে সম্মান জানাবে, ক্লাস কক্ষে প্রবেশ করার পর সবাই দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে তাঁকে বরণ করবে। তাঁকে সম্মান জানানো মানে নিজেকে সম্মান জানানো, নিজের স্কুলকে সম্মান জানানো, নিজের দেশকে সম্মান জানানো। মনে থাকবে সবার?’

‘থাকবে স্যার, থাকবে।’ একযোগে সবাই সোল্লাসে লাফিয়ে উঠে জবাব দিল।

ক্লাসের সেরা ছাত্র আত্তাহি দাঁড়িয়ে বলল, ‘স্যার আমরা কি ওনাকে প্রশ্ন করতে পারব?’

‘অবশ্যই প্রশ্ন করবে। কে, কী প্রশ্ন করবে, খাতায় লিখে রাখতে পারো। সর্বোচ্চ ছয়জনকে প্রশ্ন করার সুযোগ দেব।’

‘আগে থেকে লিখে রাখব, স্যার? নাকি ওনার কথা শুনে মনে প্রশ্ন এলে প্রশ্ন করব?’

‘ব্রিলিয়ান্ট! ঠিক বলেছে আত্তাহি। কথা শুনে প্রশ্ন করা ভালো। তবে তোমাদের কিছু জানার থাকলে আগে তা লিখে রাখতে পারো। ওই সময়ে প্রশ্নটা তোমাদের মনে না-ও আসতে পারে।’

অনেকে খাতা খুলে কলম হাতে ভাবতে শুরু করেছে কী লেখা যায়। আত্তাহি চুপচাপ বসে আছে। কলম বের করল না, খাতা খুলল না। বিষয়টা খেয়াল করলেন ডি এল সাহা।

‘তুমি কিছু লিখে রাখবে না?’

‘আমার মনে একটা প্রশ্ন জেগেছে আপনার কথা শুনে। আপনাকে প্রশ্নটা করতে চাই, করব স্যার? জবাব দেবেন?’

‘অবশ্যই জবাব দেব। কী প্রশ্ন, তোমার?’

‘আপনি বলেছেন, তিনি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনাবেন। গল্পে তো লেখকের কল্পনা থাকে, লেখকরা অনেক কিছু বানিয়ে বানিয়ে লেখেন, মুক্তিযুদ্ধ কি গল্পের বিষয়, স্যার?’

চেয়ার থেকে দাঁড়িয়ে গেলেন ডি এল সাহা। শ্রেণিকক্ষের মঞ্চ থেকে নেমে এলেন নিচে। আত্তাহির সামনে এসে তার মাথায় হাত রাখলেন।

আদুরে হাতের ছোঁয়া পেয়ে আত্তাহি চুপচাপ অনুভব করল প্রিয় শিক্ষকের আশীর্বাদ। মুখ ফুটে তিনি কোনো কথাই বললেন না। ফিরে গেলেন নিজের চেয়ারে। সবার দিকে নজর দিতে লাগলেন। তারপর প্রশ্ন করলেন, ‘তোমরা কি বুঝেছো কেন আত্তাহির মাথায় হাত রাখলাম, আমি?’

‘জি স্যার, বুঝেছি। ওর প্রশ্ন শুনে আপনি খুশি হয়েছেন। ওকে দোয়া করেছেন। তা-ই না, স্যার?’

এ প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘আর কেউ কিছু বলবে? আর কারো কিছু বলার আছে?’

কেউ দাঁড়াল না। আর কোনো প্রশ্ন এল না। গণিত স্যার তখন প্রশ্ন করলেন আত্তাহিকে ‘তোমার কী মনে হয়েছে?’

‘আমি চোখ বুজে অনুভব করেছি পুরো বাংলাদেশ, স্বাধীন বাংলাদেশ, মুক্ত বাংলাদেশ আমার মাথায় আসন নিয়েছে। নিজেকে গড়ে তুলে সে আসনের মর্যাদা আমাকে দিতে হবে- এ কথাটা আমার মনে হয়েছে, স্যার।’

আত্তাহির জবাব শুনে পুরো ক্লাস চুপ হয়ে গেল। কেউ আর নড়াচড়া করছে না, টু-শব্দ করছে না, সবার চোখ আত্তাহির দিকে।

‘ও কি কোনো অপরাধ করেছে? আমরা চুপ হয়ে গেলাম কেন?’

ছাত্রদের উদ্দেশে কথাটা বলে ডি এল সাহা নিজেই করতালি দেওয়া শুরু করলেন। সঙ্গে সঙ্গে সবাই উঠে দাঁড়িয়ে গেল। করতালিতে মুখর হয়ে উঠল শ্রেণিকক্ষ। একজন মুক্তিযোদ্ধা আসার আগে সবাই দেখে ফেলল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বহনকারী কিশোরটিকে।

‘গণিত স্যার বললেন, এটাই আসল কথা। মুক্তিযুদ্ধ কোনো গল্প নয়। মুক্তিযুদ্ধ সত্য কাহিনি। দেশটির স্বাধীনতার জন্য ৩০ লক্ষ মানুষ জীবন দিয়েছে, দুই লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমহানি ঘটেছে। সবকিছুর বিনিময়ে আমাদের স্বাধীনতা। স্বাধীনতা রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে। এ স্বাধীনতা ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে। এ স্বাধীনতার মূল্য তোমাদের মগজে তুলে রাখতে হবে। এর মর্যাদা তুলে রাখতে হবে মনে। তাহলেই আমাদের জন্য মুক্তিযোদ্ধারা যে অবদান রেখেছেন, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো হবে।’

॥দুই॥

ছোট ছোট পা ফেলে ফেলে ধীরে ধীরে তিনি এলেন। শ্রেণিকক্ষে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে সবাই দাঁড়িয়ে গেল। তালিতে তালিতে মুখর হয়ে উঠল আবার সপ্তম শ্রেণির কক্ষটি। সঙ্গে আসা প্রধান শিক্ষক আব্দুল হাই স্যার বললেন, ‘তোমাদের ভালোবাসা জানাই। আদর জানাই। মুক্তিযোদ্ধাদের এভাবেই সম্মান জানাতে হবে তোমাদের প্রজন্মকে। তোমাদের পরের প্রজন্মকেও উদ্বুদ্ধ করে যেতে হবে সম্মান জানানোর জন্য। আমি খুব খুশি হয়েছি। উনি তোমাদের সঙ্গে কথা বলবেন।’ কথা শেষ করে চলে গেলেন প্রধান শিক্ষক।

অতিথি মঞ্চে উঠলেন। শ্রেণি শিক্ষকের পাশে আরেকটি চেয়ারে বসলেন।

‘আমাকে স্বাগত জানানোর জন্য তোমাদের সবাইকে আদর জানাই। আমার খুব বলতে ইচ্ছে করে যে মুক্তিযুদ্ধকে তোমরা মনে লালন করছো। আমাদের বলার মতো কোনো গল্প নেই। কিছু সত্য কাহিনি আছে। বলব? শুনবে?’

একজন দাঁড়িয়ে বলল, ‘শুনব।’

উঠে দাঁড়ালেন তিনি। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে আবার বসে পড়লেন চেয়ারে। বললেন, ‘আমি কি বসে কথা বলতে পারি?

সবাই একসঙ্গে বলল, ‘জি। জি।’

‘তোমাদের কোনো প্রশ্ন আছে?’

‘আছে। আছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় আপনার বয়স কত ছিল? আপনি কোন ক্লাসে পড়তেন?’

‘আমি তো জানি, আমি সপ্তম শ্রেণির কক্ষে এসেছি। কোনো বিশেষ কারণ আছে সপ্তম শ্রেণিতে আসার পেছনে? আজকে শুধু তোমাদের সঙ্গে কথা বলব। কেন বলতে পারো কেউ?’

চট করে দাঁড়িয়ে গেল আত্তাহি। বলল, ‘নিশ্চয়ই মুক্তিযুদ্ধের সময় আপনি সপ্তম শ্রেণিতে পড়তেন!’

‘বাহ্ বাহ্ বাহ্! ঠিক বলেছো তুমি। তোমাকে অভিনন্দন।’

‘এত ছোট বয়সে কি আপনি মুক্তিযুদ্ধ করতে পেরেছিলেন?’ পালটা প্রশ্ন করল আত্তাহি।

‘শোনো, আমার কথা শোনো, গল্প নয় সত্য কথা :

চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ মসজিদ কলোনিতে ছিল আমাদের বাসা। ২৫ মার্চের রাত্রি, ১৯৭১ সালের কথা। সবাই ঘুমিয়ে পড়েছি। নিদ্রায় আছে পুরো শহর, রাস্তাঘাট, বাড়ির ভেতর-বাহির, সব। হঠাৎ ভেঙে গেছে রাতের স্তব্ধতা। জেগে উঠেছি সবাই। বাইরে বিকট শব্দ হচ্ছে, বিপুল বিস্ফোরণ ঘটছে। মনে হচ্ছে চারপাশের ঘরবাড়ি, গাছপালা সব ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, বাতাসের মতো উড়ে যাচ্ছে সব। কেবল অলৌকিকভাবে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের বাড়ি। উজালা, আমার বড় বোন, লাফিয়ে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে লাফিয়ে উঠি আমিও। সুইচ অন করল আপু, ইলেকট্রিসিটি নেই। জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকালাম আমরা। অন্ধকার। অন্ধকারের ঘনত্ব বোঝা কঠিন। হঠাৎ হঠাৎ অন্ধকারের বুকচিরে ছলকে ওঠে আলোকমালা। শব্দের সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ চমকের মতো চারদিকে ঝলকানি ছড়িয়ে পড়ে। একপলকের জন্য দেখে নিলাম বাইরের ঘরবাড়ি। না। এখনো এলাকার কিছুই ধ্বংস হয়নি। দখিনের জানালার কাছে এসে দাঁড়াল উজালা আপু। আমিও। সঙ্গে সঙ্গে আকাশের দিকে তাকালাম আমরা। আকাশের ওপর দিয়ে ছুটে যাচ্ছে আগুনের গোলা, কামানের গোলা। থর থর করে কেঁপে উঠছে জানালা। সেই সঙ্গে সবার বুক। এই বুঝি ধ্বংস হয়ে যাবে সবকিছু। বড়ো রাস্তার পাশেই আমাদের বাসা। বাইরের শব্দের জন্য এতক্ষণ রাস্তার দিকে খেয়াল করিনি আমরা। রাস্তা দিয়ে গরগর করে ঢুকছে ট্রাক-লরি। পাকিস্তানি হানাদারদের সশস্ত্র গাড়িবহর শহরের ভিতরে ঢুকছে বন্দরের দিক থেকে। উত্তর দিকে যাচ্ছে। বাবা, রউফ চৌধুরী, অন্ধকার হাতড়ে এসে আমাদের ধরে বললেন, ‘এদিকে চলে এসো। পর্দা ছেড়ে দাও।’

‘ভয় নেই বাবা, ওরা বাইরে থেকে দেখতে পাবে না ভেতরের কিছু।’ বলল আপু।

‘বেশি বোঝার চেষ্টা কোরো না।’

আপু তর্ক করল না। জানালা ছেড়ে সরে এলো। আমিও। খাটের এক কোণে জড়সড় হয়ে বসে থাকলাম। আমার এক হাত শক্ত করে ধরে আছে আপু।

‘ভয় পেয়েছিস? ভয় করছে? ভয় পাসনে। কিচ্ছু হবে না।’

‘কিচ্ছু হবে না মানে? ঘরবাড়ি কেমন কাঁপছে, দেখছো না?’

অস্থিরতায় ছটফট করতে থাকায় গলার শব্দ বেরোচ্ছে না ভালো করে। থামছে না উড়ে আসা জ্বলন্ত আগুনের গোলা। ছাদের ওপর দিয়ে ছুটে যাচ্ছে উত্তর দিকে।

‘বাবা, কোত্থেকে কামান দাগানো হচ্ছে, বুঝতে পারছ?’

আপুর প্রশ্ন শুনে বাবা বললেন, ‘মনে হচ্ছে পতেঙ্গা উপকূলের নৌ-সেনা ইউনিট থেকে আক্রমণ করছে হানাদাররা।’

‘লক্ষ্যস্থল বুঝতে পারছ?’

‘পুরোপুরি বোঝা যাচ্ছে না। তবে মনে হচ্ছে সেনানিবাস কিংবা কোর্ট-বিল্ডিংয়ের দিকে যাচ্ছে গোলাগুলো।’

‘নিশ্চয়ই আমাদের সাহসী ছেলেরা কোথাও প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। বর্বর হানাদাররা শেষ করতে পারবে না আমাদের। দেখে নিয়ো, জয় আমাদের হবেই।’ বলল আপু।

আশপাশে ভয়ানক এক শব্দ হলো। আপুকে জড়িয়ে ধরলাম আমি। শঙ্কিত হলেন বাবাও। ফিসফিস করে বললেন, ‘আমাদের এলাকায় বোধহয় কামান দাগানো শুরু হয়েছে।’

‘না বাবা। সৈন্যরা এ পথে যাওয়া আসা করছে। এখানে কোনো অসুবিধা হবে না। ধ্বংসযজ্ঞ কিছু ঘটলে ওদের লোকজনই মারা পড়বে।’ বলল কলেজ পড়ুয়া আপু।

আপুর বুদ্ধিদীপ্ত জবাব পেয়ে ভয় কিছুটা কমে গেল আমার। এ সময় বাইরে কান্নারোল শুনতে পেলাম। বর্বর হানাদাররা কি তবে নেতাকর্মীদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে? তা-ই হবে বোধ হয়। উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা বাড়ছে। মা জমিলা বেগম এগিয়ে এলেন। খাটের তলে টর্চ লাইট জ্বালালেন। পরিষ্কার করছেন তিনি।

‘খাটের তলে ঢুকে যাও। শুয়ে থাকো এখানে।’

‘তোমার কি মাথা খারাপ হলো, মা?’ উজালা আপু প্রশ্ন করল।

‘তর্ক কোরো না, যা বলছি শোনো। ঢুকে যাও।’ প্রতিবাদ করল না আপু। খাটের নিচে ঢুকে গেল আমাকে নিয়ে। বিল্ডিং-এর ছাদে গোলা এসে পড়লে কি খাট রক্ষা করতে পারবে আমাদের? পারবে না। বন্যা-স্রোতে ভেসে যাওয়া মানুষ যেমন খড়কুটো ধরে জীবন বাঁচাতে চায়, এটি ছিল তেমনই একটা চেষ্টা।

‘পাঞ্জাবিরা কি আমাদের মেরে ফেলবে, আপু?’

‘এত সোজা! আমাদের শক্তি জনতা। ওদের জিব টেনে ছিঁড়ে ফেলবে না জনতা? সকালে উঠে দেখবি সব পাকিস্তানি হানাদার মরে ভূত হয়ে গেছে। ইয়াহিয়া আর টিক্কা ভয়ে পালিয়েছে।’

একদিন পর সকালের ঘটনা। আমরা রেডিও শুনছি রেডিওটা রাখা আছে ডাইনিং টেবিলের মাঝখানে। সবাই নাশতা খেতে বসেছি। কারো মুখে কোনো কথা নেই। কেউ খেতে পারছে না। বিভীষিকাময় সময় কেড়ে নিয়েছে আমাদের ক্ষুধা। হঠাৎ সবাই চমকে উঠলাম বেতার যন্ত্র থেকে বিশেষ ঘোষণা হচ্ছে। বাঙালি ঝাঁপিয়ে পড়েছে মুক্তিযুদ্ধে। এলাকার তরুণদের মধ্যেও দারুণ উত্তেজনা বিরাজ করছে। ওরা যাচ্ছে ঘরে ঘরে। কেউ রুটি দিচ্ছে। কেউ বালতি ভরে ডাল দিচ্ছে। উজালা আপুও রুটি বানানো শুরু করেছে। মা ডাল রান্না করছেন। আমাকে দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছে তরুণদের কাছে। কলোনির তিন/চার তলার বাসিন্দাদের দেওয়া রুটি, ডালও আমরা ছোটরা সংগ্রহ করে তুলে দিচ্ছি ওদের হাতে। সব জোগাড় করে তরুণরা নিয়ে যাচ্ছে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সরবরাহ করতে। সাহসী বাঙালি সন্তানেরা ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বেঁচে যাওয়ার বাঙালি সেনাদের সঙ্গে মিলেমিশে বিভিন্ন অবস্থানে প্রতিরোধ যুদ্ধ গড়ে তুলেছে। তাদের জন্য রসদ, খাবার পাঠানো হচ্ছে।

॥তিন॥

শ্রেণিকক্ষের সবাই দেখল অতিথি চুপ করে আছেন। কথা বলছেন না। মনে হচ্ছে তার বুকে ভারী একটা বোঝা চেপে বসেছে। তিনি বোধহয় শান্তি পাচ্ছেন না। স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছেন ছাত্রদের দিকে। আত্তাহির কানের কাছে ফিসফিস করে তৌহিদ বলল, ‘ওনার নামটা তো জানা হলো না। উনি চুপ করে আছে কেন, জিজ্ঞেস কর?’

আত্তাহি বলল, ‘তুই জিজ্ঞেস কর।’

দাঁড়িয়ে গেল তৌহিদ। ‘আপনাকে একটা প্রশ্ন করতে পারি?’

হঠাৎ করে তাঁর চোখে পানি চলে এসেছে। তিনি হাত দিয়ে পানি মুছে বললেন, ‘জিজ্ঞেস করো।’

‘আপনার নাম কী? আর আপনি স্তব্ধ হয়ে গেলেন কেন? আপনার চোখে পানি কেন?’

‘ও! আমার নাম বলা হয়নি? আমার নাম আবির হাসান। আর কষ্টের কথা এসে আমাকে চেপে ধরেছে। এ জন্য আমার জবান বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কষ্টের কথা তোমরা শুনতে চাও? তাহলে আমি বলতে পারি। কষ্ট বইবার শক্তি তোমাদের আছে তো?’

তৌহিদ বলল, ‘আছে। আমরা শুনবো। সব শুনবো।’

‘তাহলে শোনো : এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে আমরা আগ্রাবাদ থেকে পায়ে হেঁটে নদীর পাড় দিয়ে সীতাকুণ্ডের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলাম। গ্রামীণ মেঠোপথ পেরিয়ে আমরা এগোচ্ছিলাম সামনে। আমাদের সঙ্গে ছিল অনেক মানুষ, শহর ছেড়ে গ্রামে যাচ্ছে, ছেলেমেয়ে নাতিপুতি সব একসঙ্গে জীবন বাঁচাতে। হঠাৎ করে দেখলাম মেঠোপথ পেরোনোর পর পাকা সড়কের মতো সরু রাস্তা বরাবর কয়েকটা জিপ গাড়ি ছুটে আসছে। গাড়ি থেকে নেমে গেল অস্ত্রধারী হায়েনার মতো পাকিস্তানি বাহিনী। গুলি চালাল ওরা। প্রত্যেকটা মানুষকে চেক করতে লাগল। হিন্দুদের গুলি করে মেরে ফেলল চোখের সামনে। যারা প্রতিবাদ করল তাদেরও। আমার আপুর মতো বয়সি যারা আছে সবাইকে জোর করে গাড়িতে তুলে নিল। আমাদের পুরো আকাশ, পুরো পৃথিবী, পুরো জীবন আচমকা কবরে শায়িত হয়ে গেল। এই যে আমি এখানে তোমাদের সামনে বসে আছি, এই আমি মনে হয় সেই আমি নই, আমি কবরে শায়িত আবির হাসান। আমরা কুমিরা ঘাটে এলাম। সাম্পানে করে কুমিরা থেকে নদী পেরিয়ে সন্দ্বীপের উদ্দেশে যাত্রা করলাম। আমার দাদার বাড়ি সন্দ্বীপ। নানার বাড়ি সন্দ্বীপ। আমরা গিয়ে উঠলাম নানার বাড়িতে। আমাদের নিজস্ব বাড়ি সাগরে ভেসে গেছে। প্রমত্ত মেঘনা খেয়ে ফেলেছে। আমরা ছিলাম আসলে উদ্বাস্তু।

মে মাসের দিকের ঘটনা বাবা খুব অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তাঁকে নিয়ে যেতে হবে চট্টগ্রাম। সঙ্গে যাওয়ার মতো আমি ছাড়া কেউ নেই। আমি পুরুষ সদস্য, সপ্তম শ্রেণির ছাত্র, বাবাকে নিয়ে যাচ্ছি, মেঠোপথ দিয়ে ধানখেতের আইল দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। হেঁটে হেঁটে যেতে হবে। পথে তখন ধান গাছগুলো বড়ো হয়েছে। আমার সমান উঁচু। দু’পাশে ধানের ছড়াগুলো বাতাসে দুলছে। আমরা হেঁটে যাচ্ছি হঠাৎ করে ধানের শীষ এসে আমার চোখে ঘষা খেলো। চোখ জ্বালা শুরু করল। চিৎকার শুরু করলাম আমি। পানি নাই। ধানখেতের ফাঁকে কিছু পানি জমেছিল। তা দিয়ে চোখ ধুয়ে নিলাম। জ্বালা কিছু কমল। তারপরও আমাদের গন্তব্য স্টিমারঘাট। স্টিমারে করে আমরা চট্টগ্রাম যাব। গিয়ে বাবার চিকিৎসা করাব। এই হচ্ছে টার্গেট। মৃত্যুভয় নেই। আমরা এগিয়ে যাচ্ছি বাবার চিকিৎসা করাতে। সন্দ্বীপে কোনো ভালো হসপিটাল নেই। চট্টগ্রামে না গিয়ে উপায় নেই। অনেক কষ্ট করে আমরা জাহাজঘাটে এসে দাঁড়ালাম।

দেখা যাচ্ছে দূরে এসে দাঁড়িয়েছে স্টিমার। সন্দ্বীপ ঘাট থেকে যাত্রী নিয়ে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হবে। স্টিমারের নাম ‘আব্দুল মতিন’, বরিশাল থেকে ছেড়ে এসেছে। সাম্পানে চড়ে স্টিমারে উঠতে জীবনের ঝুঁকি থাকলেও ভয় নেই এ মুহূর্তে। কিন্তু স্টিমারে ওঠার পর ভয়ে কাঁপতে লাগলাম। চারপাশে অসংখ্য হায়েনা পাকিস্তানি সেনারা ঘুরে বেড়াচ্ছে। প্রত্যেকের কাঁধে অত্যাধুনিক অস্ত্র। নাম জানা ছিল না তখন। রাইফেল, স্টেনগান, পরে শুনেছি। প্রত্যেক পুরুষ যাত্রীর কাপড় খুলে দেখছে। হিন্দু-মুসলমান বোঝার চেষ্টা করছে।

হঠাৎ খেয়াল করলাম এক সেনা শকুনের মতো চেয়ে আছে আমার লাল চোখের দিকে। ভেতরে ঢোকার পর ভয় কিছুটা কেটে যায়। স্টিমারের কর্মচারীদের পদবিগুলো বেশ সুন্দর। কর্মচারীদের পদবী হলো মাস্টার, সুকানি, খালাসি এসব। দেশের অভ্যন্তরীণ রুটে চলাচলকারী যানগুলোকে বলা হয় স্টিমার। সুকানি ছিলেন আমার এক দাদা। স্টিমারে ওঠার পর বসার জায়গা হলো দাদার কেবিনে। কেবিনগুলো বর্গক্ষেত্রের মতো। পূর্ব দিকে দরজা। উত্তর দক্ষিণ-পশ্চিমে রয়েছে শোবার ব্যবস্থা, বেড। একটার ওপর রয়েছে আরেকটা বেড। চারটি বেড এক কেবিনে। চোখের জ্বালা বাড়ছে। অস্বস্তি বাড়ছে। বাতি জ্বালিয়ে দোতলায় উঠে শুয়ে পড়লাম আমি। ঘুম আসছে না। ছটফট করছি। বাবা শুয়ে আছেন নিচের বেডে।

ইঞ্জিনের গুড়গুড় শব্দ হচ্ছে। স্টিমার থর থর করে কাঁপছে। কেবিনে রয়েছে গোলাকার মোটা গ্লাসের জানালা। বাইরে তাকিয়ে বুঝলাম জলের ঢেউ কেটে কেটে স্টিমার এগিয়ে যাচ্ছে।

হঠাৎ ঠাস ঠাস শব্দ হলো দরজায়। লক করা ছিল না। খুলে গেল দরজা। একজন পাকিস্তানি সেনা চিৎকার করে কী যেন বলল। আকস্মিক ঘটনায় হকচকিয়ে কাঁপতে লাগলাম আমি। পাকিস্তানি সেনা আবার গর্জে উঠল। গর্জন শুনে বোঝা গেল নামতে বলছে আমাকে। নামতে পারছি না আমি। ভয়ে কাঁপছি। আচমকা আমার হাত ধরে হ্যাঁচকা টান দিল। ছিটকে পড়ে গেলাম নিচে। রডের সঙ্গে মাথায় বাড়ি খাওয়ায় ঝিমঝিম করে উঠল মাথা। অসুস্থ বাবা চিৎকার করে ভাঙা ভাঙা উর্দুতে বললেন, ‘উসকো নাম আবির। মুসলিম’। ধাক্কা দিল ওরা বাবাকে। আর আমাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে এল স্টিমারের ডেকে। ওদের কমান্ডারের সামনে হাজির করা হয়েছে। আর আমাকে নিয়ে কী যেন বলাবলি করছে ওরা। কথা শুনে পুরোপুরি বোঝার উপায় নেই কী বলছে ওরা। তবে বুঝলাম ওরা ধরে নিয়েছে আমি ছোটো মুক্তি, বিচ্ছু মুক্তিবাহিনীর বিচ্ছুগ্রুপের ছোটো সদস্য।

কমান্ডার উর্দুতে বলল, ‘ছোটা মুক্তিকো সাগরমে ছোড় দো। অর্থাৎ মুক্তিবাহিনীর ছোটোটাকে সাগরে ফেলে দাও।’

একজন খপ করে ধরল আমার বাঁ হাত। আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল স্টিমারের রেলিংয়ের দিকে। কমান্ডার আবার বলল, ‘উসকো পা ভাঙ দো। ইসকোবাদ সাগরমে ঢাল দো। অর্থাৎ আগে ওর পা ভেঙে দাও, তারপরে সাগরে ফেলে দাও।’

‘একজন রাইফেলের বাট দিয়ে সজোরে বাড়ি দিল ডান পায়ে। জ্ঞান হারানোর আগে দেখলাম আমার সুকানি দাদা ছুটে এসে উর্দুতে কথা বলছেন ওদের সঙ্গে। তারপর জ্ঞান হারিয়ে যায় আমার। আর কিছু মনে নেই।’

এইটুকু কথা বলে উনি চুপ করে আছেন। আর কিছু বলছেন না। তার চোখে স্তব্ধতা। শূন্যতা। মনোযোগ দিয়ে খেয়াল করল সপ্তম শ্রেণির ছাত্ররা।

এবার আত্তাহি দাঁড়িয়ে বলল, ‘তারপর কী হলো, জানতে চাই।’

উত্তর দিলেন না ছোটো মুক্তি। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। মঞ্চ থেকে নেমে এলেন নিচে। ডান পায়ের ঢোলা পাজামাটা ওপর দিকে তুলে ধরলেন।

সবাই অবাক হয়ে দেখল ডান পা-টা আসল পা নয়। কাঠের পা। হাঁটু থেকে নিচের অংশ কাঠ দিয়ে গড়া। ছাত্রদের দমবন্ধ হয়ে আসলো। তাদের মুখের ভাষা হারিয়ে গেল।

ডি এল সাহা স্যার বললেন, ‘তোমাদের আর কারো কোনো প্রশ্ন আছে? কেউ কি লিখিত প্রশ্ন থেকে কিছু জিজ্ঞেস করবে?’

উঠে দাঁড়াল না কেউ।

আত্তাহি দাঁড়িয়ে বলল, ‘আমার দুটো প্রশ্ন আছে, স্যার। প্রথম প্রশ্ন আপনি তো মুক্তিযুদ্ধ করেননি। তবু মুক্তিযোদ্ধা হলেন কীভাবে? এ প্রশ্নের উত্তর পেলে আমি দ্বিতীয় প্রশ্ন করব।’

আবির হাসান আবার গিয়ে মঞ্চের চেয়ারে বসলেন। তারপর বললেন, ‘ভালো প্রশ্ন করেছো তুমি। যৌক্তিক প্রশ্ন। যুদ্ধক্ষেত্রে আমি যুদ্ধ করিনি। আমি মুক্তিযোদ্ধা নই। তবু সেই ছোটবেলা থেকে সবাই আমাকে ছোটোমুক্তি বলে ডাকে। আর তোমরা জেনে রেখো, কিছু আল-বদর আল-শামস, রাজাকার আর জামাতের লোকজন ছাড়া সবাই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিল। সবাই লড়েছে কোনো না কোনোভাবে। সে অর্থে সবাই মুক্তিযোদ্ধা। আমিও। তবে রণক্ষেত্রে যারা যুদ্ধ করেছেন তাঁরা হচ্ছেন তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা। তালিকায় আমার নাম নেই। তবে ছোট্ট মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমি মানুষের মুখে মুখে স্বীকৃতি পেয়েছি ছেলেবেলা থেকেই। মুক্তিযুদ্ধের কথা উত্তরপ্রজন্মকে শোনাতে চাই। জানাতে চাই। এজন্য আমাকে অনেকে মুক্তিযোদ্ধা বলেন। তোমাদের স্যাররা হয়তো সে কারণেই আমাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। আমি যুদ্ধক্ষেত্রের মুক্তিযোদ্ধা না হলেও মনেপ্রাণে মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্মের কিশোর। নানাভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেছি। পাকিস্তানি হানাদারদের অত্যাচারের কারণে পা হারিয়েছি।’

গণিত স্যার বললেন, ‘তুমি খুশি, আত্তাহি? উত্তর পেয়েছ?’

‘জি স্যার, পেয়েছি।’

‘তোমার দ্বিতীয় প্রশ্নটা করো।’

‘আপনার উজালা আপুর কী হয়েছে? তার কাহিনি তো শেষ করেননি। আমরা শুনতে চাই।’

আবির হাসান আবারও শূন্য হয়ে গেলেন। তাঁর চোখ শূন্য হয়ে গেল। তাঁর মুখ শুকিয়ে গেল। তাঁর বুকটা শূন্য হয়ে গেল। বুকের ভেতর থেকে হাহাকার জেগে উঠল। তিনি চুপচাপ বসে আছেন। কিছুই বলছেন না। পুরো ক্লাসে স্তব্ধ। নিঃশ্বাস পড়ছে না। কেউ নড়াচড়া করছে না। সবাই উত্তরের আশায় তাকিয়ে আছে। একসময় একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ছোটো মুক্তি বললেন, ‘আমরা আর কোনোদিন পাইনি আপুকে। ওই যে পাকিস্তানিরা ধরে নিয়ে গেছে, মুক্তিযুদ্ধের পর এখনো আমরা তাঁকে খুঁজে ফিরি। এখনো পাইনি। তোমরা তোমাদের ভেতরের চোখ দিয়ে খুঁজো। মুক্তিযোদ্ধাদের মনে রেখো। মুক্তিযুদ্ধকে মাথায় ভরে রেখো। তাহলে আমার উজালা’পুর জীবন আবার ফিরে পাবো আমরা।

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x