কিশোর উপন্যাস

দুরন্ত দুখু

দ্রুত লুকানোর চেষ্টা করল দুখু। শেষ পদ্যটা মুছে ফেলতে পারেনি স্লেট থেকে। মুছতে গিয়েও ধরা পড়ে যায়। ওর বুকের সঙ্গে জড়ানো স্লেটটা একঝটকায় ছিনিয়ে নিলেন বিনোদবিহারী স্যার। দ্রুতই পড়ে ফেললেন সাদা চক দিয়ে স্লেটে লেখা কবিতাটি। পড়ে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন তিনি।
দুরন্ত দুখু
প্রচ্ছদ : সোহেল আশরাফ

পূর্বপ্রকাশের পর

॥ তিন ॥

মুখর কবির যাত্রাধ্বনি

পাঠশালার সামনের সারিতে বসার জন্য সবার আগে স্কুলে ছোটে দুখু। জানন্দ সামনের কাতারে বসতে ভয় পায়। তবে দুখুর সঙ্গসুখের জন্য ভয় জয় করে সে-ও চলে আসে সবার আগে। কিন্তু সে বসবে দুখুর ঠিক পেছনের সারিতে।

আজও স্লেট আর বই পেছনের বেঞ্চের উপর রাখার সঙ্গে সঙ্গে দুখু নির্দেশ দিলো, ‘সামনে আয়। এই যে!’ হাতের ইশারায় দেখিয়ে বলল, ‘এটা তোর জায়গা।’

এর আগে এত কড়া কণ্ঠে কখনো আদেশ জারি করেনি দুখু। বুঝতে পেরে নীরবে জানন্দ মেনে নিল তার নির্দেশ। দুখুর ভেতরে লুকিয়ে থাকা খ্যাপাটে আরেকটা ‘দুখু’ বাস করে। জানে জানন্দ। যে-কাজে হাত দেবে, খ্যাপাটে একটা তাড়া থাকে তাতে। সবাই সেই ভেতরের দুখুর নাম দিয়েছে খ্যাপা। জানন্দও। খ্যাপার খ্যাপামি সামাল দেওয়ার জোর নেই তার। বাধ্য ছেলের মতো সে গিয়ে বসে দুখুর পাশে।

জানন্দ অমান্য করেনি তার কথা, এটাই দুখুর সুখ। এর চেয়ে বড়ো সুখ আশাও করে না। ছোটো ছোটো কাজের ভেতর থেকে সুখ খুঁজে নিতে জানে দুখু। কীভাবে সে এ-শিক্ষা পেল, সে-খবর জানা নেই তার। মাঝে মাঝে জানন্দের মনে হয়েছে ওর নাম ‘দুখু’ না হয়ে ‘সুখু’ হওয়া উচিত ছিল। তাকে পাশে ডেকেই কাজ শেষ তার। এখন মন স্লেটের ওপর। কী যেন লিখছে, আর মুছে ফেলছে। বাঁ হাতে একটা বই নিয়ে লেখাজোখা আড়াল করে রেখেছে দুখু। জানন্দকে দেখার সুযোগ দিচ্ছে না। একটা অকথিত অভিমানের নীরব চড় এসে যেন পড়ল তার গালে। পাথরের মতো, কিছুটা দূরে বসে, শরীর শক্ত করে জানন্দ তাকিয়ে রইল পাঠশালার খোলা দরজার দিকে। জানালার গ্রিলের উপর বসে ছিল দুটো চড়ুই পাখি। তাকানোর সঙ্গে সঙ্গে পাখি দুটো জোড় বেঁধে উড়াল দিলো। বসা অবস্থায় জোড় ছিল, উড়ালেও জোড়। বাঃ! ভালো লাগল দৃশ্যটা দেখে। ভালো লাগা মনের কপাট খুলে ফুড়ুত করে উড়ে গেল অভিমানের ডানাভাঙা পাখিটা। আর তখনই অভিমানমুক্ত জানন্দ দুখুর কাছ ঘেঁষে বলল, ‘লুকোচ্ছিস কেন? কী লিখছিস? আমি দেখে ফেললে কি তোর গায়ে ফোসকা পড়বে?’

‘হুঁ। ফোসকা পড়বে। দেহে নয়, চোখে। তোর চোখে।’

হুল ফোটানো কথায় চোট খেলো জানন্দ। ডানাভাঙা উড়ে যাওয়া অভিমানের পাখিটার ডানা আবার জোড়া লেগে গেল। উড়ে এসে আবার বসল মনের জানালার কপাটে। চুপ হয়ে গেল সে। ডুব দিতে চাইল শব্দের ঘরে–বই খুলে পড়ায় মন বসানোর চেষ্টা করল। না, মন বসছে না। ছুটোছুটি করছে মন। অস্থির হয়ে উঠে যেতে চাইল জানন্দ। তখনই টনক নড়ল দুখুর।

‘রাগ করেছিস?’ আপন কাজের একাগ্রতা থেকে বেরিয়ে প্রশ্ন করল দুখু।

চুপ করে অনড় হয়ে রইল জানন্দ।

‘জানিস, হঠাৎ হঠাৎ আমার মধ্যে কী যে হয়, বুঝতে পারি না।’ বলতে বলতে দুখুর গলা ভারী হয়ে এলো।

‘কী হয়?’ জানন্দের অভিমানের চড়ুই পাখি আবার উড়ে গেল দুখুর গলার দুঃখী স্বর শুনে।

‘যা ঘটে, মোটেও তা ভয়ের না যে তোকে ভয় পেতে হবে, চমকে ওঠার মতোও কিছু নয়।’

‘আহা! কথা লম্বা করছিস কেন? কী ঘটে তা বলে ফেল চটজলদি।’

‘ফুটন্ত ভাতের ডেকচি দেখেছিস?’

‘হ্যাঁ, দেখেছি তো!’ অধৈর্য হতে লাগল জানন্দের স্বর।

‘মাঝে মাঝে মনে হয় মাথায় ভাত ফুটছে, খই ফুটছে । শব্দ আর ছন্দ মাথার ভেতর দাপাদাপি করতে থাকে। দিশেহারা লাগে তখন। শব্দের মিছিল থেকে জুতসই শব্দ কুড়িয়ে, লাইনবদ্ধ করে লিখে ফেলতে ইচ্ছা করে পদ্য। ইচ্ছের সেই ঘোড়া এতই দুরন্ত যে তাল সামলাতে পারি না। ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে যাই নিচে। আর তখনই হতাশা জাগে মনে। কথাগুলো তোকে বলতে সংকোচ বোধ করছি, তবুও ভাবলাম জানিয়ে রাখা ভালো। তাহলে যখন-তখন আমার ওপর রাগ করবি না, অভিমান করবি না।’

জানন্দর মন গলে পানি হয়ে গেল। মনে মনে ভেবে দ্রুতই সিদ্ধান্তে এলো, এখন থেকে দুখুকে আর ভুল বুঝবে না। এমন বন্ধু পেয়ে অন্যরকম গৌরবে ফুলে উঠল তার বুকের ছাতি। আপনভোলা দুখুর হাত চেপে ধরে বসে রইল সে। অভিন্নহৃদয় বন্ধুত্বের আলোর ঝলক ছড়িয়ে যেতে লাগল। টের পেল না তারা।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার জামুরিয়া থানার চুরুলিয়া গ্রামের বিনোদবিহারী চট্টোপাধ্যায়ের পাঠশালায় যে অন্যরকম এক জ্যোতির বিকিরণ শুরু হলো, তা দেখে ফেললেন বিনোদবিহারী নিজের চোখে। কিছুটা আগেই এসে দূর থেকে দেখলেন পাঠশালার পশ্চিম ঘর থেকে একটা আলোর রশ্মি উঠে যাচ্ছে উপরে। ভোরের নরম রোদ এখনো কাটেনি। রোদের তেজ কম আর মধুর হলেও সে রোদ ভেদ করে আলাদা আলোর রশ্মিছটা এলো কোত্থেকে? আলোর কণা ছড়িয়ে যাচ্ছে চারপাশে। দূর থেকে দৃশ্যটি দেখে ছুটে এলেন তিনি শ্রেণিকক্ষের দিকে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে দেখলেন দুই ছাত্র ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে আছে সামনের বেঞ্চিতে। তাদের ঘিরে উদ্‌গিরিত হচ্ছে অন্যরকম দ্যুতি। মনে হলো তারা এ জগতে নেই। ঝটিতি তাঁর মনে এরকম একটা প্রশ্নের উদয় হলো, এত আগে এসে কী করছে ওরা এখানে!

হঠাৎ দুখু দেখল স্যারকে।

তিড়িং করে লাফিয়ে উঠল সে। সঙ্গে সঙ্গে জানন্দও।

‘এত আগে এসেছিস কেন রে? কী করছিস এখানে?’

জানন্দ ভাবল তারা বুঝি কোনো অপরাধ করে ফেলেছে। স্যারের কণ্ঠস্বর থেকে সেরকমই আভাস পেয়ে চট করে বলে ফেলল, ‘দুখু পদ্য রচনা করছে, স্যার। ও পাঠশালায় রোজ আগে আসে। নিরিবিলিতে পদ্য রচনা করে নিজেই আবার মুছে ফেলে।’

পদ্যদ্যুতিই কি কুঁড়েঘরের পাঠশালার ছাউনি ফুঁড়ে উড়ে যেতে দেখলেন তিনি?

প্রশ্ন আর বিস্ময় একসঙ্গে তাড়া করল তাঁকে। একটা ঘোরের শিকার হলেন তিনি। আপনভোলা জগৎ থেকে বেরোতে পারলেন না। মগ্নতার ভেতর থেকেই দুখুর উদ্দেশে বললেন, ‘দেখা তো কী রচনা করেছিস।’

দ্রুত লুকানোর চেষ্টা করল দুখু। শেষ পদ্যটা মুছে ফেলতে পারেনি স্লেট থেকে। মুছতে গিয়েও ধরা পড়ে যায়। ওর বুকের সঙ্গে জড়ানো স্লেটটা একঝটকায় ছিনিয়ে নিলেন বিনোদবিহারী স্যার। দ্রুতই পড়ে ফেললেন সাদা চক দিয়ে স্লেটে লেখা কবিতাটি। পড়ে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন তিনি। চোখের আলো হারিয়ে ফেললেন, মুখের ভাষাও হারিয়ে গেল যেন তাঁর। অভিজ্ঞতা আর অন্তরের আলোয় দেখে ফেললেন এই শিশু-কবির ভবিষ্যৎ। নিজের ডান হাত রাখলেন দুখুর মাথায়। মুখ ফুটে কোনো আশীর্বাদ করার ভাষা খুঁজে না পেলেও মনে মনে বললেন, ‘সরব করে দাও হে প্রভু এ মুখর কবিরে...।’

ইতোমধ্যে অন্য ছাত্রছাত্রীরা চলে এসেছে পাঠশালায়। কয়েকজন দেখে ফেলল বিনোদবিহারী স্যারের কাণ্ড। একজন খবরটা বিকৃত করে রটিয়ে দিলো। মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ নয়, বরং দুখু আর জানন্দকে কানে ধরে ওঠবস করিয়েছেন বিনোদ স্যার। পাঠশালা ছুটির আগেই বাতাসের বেগে খবরটা উড়তে লাগল।

সে-খবর পৌঁছে গেল দুখুর বাবা কাজী ফকির আহমদের কানেও। ছেলে পাঠশালায় শাস্তি পেয়েছে, শুনে ক্ষুব্ধ নয়, আহত হলেন তিনি। রাগ করার পরিবর্তে কষ্ট পেয়ে চুপ হয়ে গেলেন। ছেলেকে কোনো কথাই জিজ্ঞেস না করে কঠোর সিদ্ধান্ত নিলেনপাঠশালা থেকে ছাড়িয়ে এনে তাকে ভর্তি করাবেন তাদের বাড়ির পাশের একটি মক্তবে। সে-কথা জানালেন স্ত্রী জাহেদা খাতুনকে।

মায়ের মন হাহাকার করে উঠল। মক্তবে ভর্তি করানো হবে সে-কারণে নয়। দুখুর মতামত নেওয়া হলো না, সে-কারণে। রাশভারী স্বামীর সামনে নিজের মনের কথা তুলে ধরতে না পেরে ভেতরে ভেতরে গুমরে উঠলেন তিনি।

তবুও এই প্রথম, স্বামীর সামনে নিজের অবস্থান মেলে ধরে বললেন, ‘দুখুকে বিষয়টা জানালে ভালো হতো না?’

ঐতিহ্যবাহী কাজী পরিবারে কাজী সাহেবের বংশগৌরব আর কর্তৃত্ববাদ একসঙ্গে জেগে উঠল। তিনি ভাবগম্ভীর স্বরে বললেন, ‘ছেলের মঙ্গলের জন্য মা-বাবার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। মতামত নেওয়ার প্রয়োজন নেই। আমাদের বংশমর্যাদার ইতিহাস সে-কথা বলে না।’

কেবল বাবার মতামত নয়, মায়ের মতামতের কথাও যোগ করেছেন স্বামী, বিষয়টি ভালো লাগলেও, বুঝলেন, এটি স্বামীর মনের কথা নয়, মুখের কথা। মনের কথা হলে পাঠশালা থেকে দুখুকে ছাড়িয়ে এনে মক্তবে ভর্তি করানোর বিষয়ে মায়েরও ইচ্ছা-অনিচ্ছার কথা জানার চেষ্টা করতেন তিনি। সে-আলামত দেখা গেল না। বরং বললেন, ‘আমার বাবা কখনো আমাদের মতামত নেননি। এত ছোটো ছেলের আলাদা কোনো মতামত থাকতে পারে না। সে কি তার ভালোমন্দ বুঝার ক্ষমতা রাখে মাথায়?’

কঠিন প্রশ্ন। বলার ভঙ্গিটাও দৃঢ়। সিদ্ধান্তে অটল স্বামীর বিপক্ষে দাঁড়াবেন সে-ক্ষমতা নেই জাহেদা খাতুনের। নীরব থেকে কেবল স্মরণ করলেন শ্বশুর সাহেব, কাজী আমিন উল্লাহর কথা। একদিন তাদের কুঁড়েঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকার সময় মাথায় ঠুস খেয়েছিলেন তিনি। তা দেখে জাহেদা খাতুন বলেছিলেন, ‘বাপজান, ঘরের মাটির দেয়ালটা আরেকটু উঁচু হলে ভালো হতো, খড়ের চালের বদলে লাল টালির ছাউনি লাগালে দেয়ালও উঁচু করা যেত।’

‘বলেন কী বউমা! এ এলাকার বাড়িঘরের রেওয়াজই এমন। টিনের চালে গরম বেশি ধরে। লাল টালির ছাউনিও রোদের গরম তেমন আটকাতে পারে না। বেশ পুরু করে দেওয়া খড়ের ছাউনিই কেবল শীতল রাখে ঘর। গরমের ছাট ঢুকতে দেয় না ভেতরে। মাটির দেয়ালের সুবিধাও অনেক, অতিবৃষ্টি নেই এ এলাকায়। কখনো অবিরাম বর্ষণ হলেও ছোটো দেয়ালের ক্ষতি হয় না। গ্রীষ্মের দিনে ঘর ঠান্ডা রাখে আবার শীতের দিনেও তেমন ঠান্ডা লাগে না ঘরের ভেতর। বসবাসের জন্য এমন উত্তম ব্যবস্থা কি আর হতে পারে, মা?’

‘না বাপজান, হতে পারে না। আপনি ঠিকই বলেছেন। তবে ওই যে, পুবদিকে রাজা নরোত্তম গড়ের আশপাশের বাড়িগুলোর লাল টালির ছাউনি আর উঁচু দেয়াল, দেখতে বেশ ভালো লাগে। বাড়ির বাইরের দৃশ্যে একটা আভিজাত্যের ছাপ আছে, বাপজান!’

‘আভিজাত্যের কথা বলছেন! শোনেন তাহলে। আমাদের পূর্বপুরুষেরা এসেছিল বঙ্গদেশের বাইরে থেকে। তখন মুঘল আমল চলছে। দিল্লির সিংহাসনে ছিলেন সম্রাট শাহ আলম। সে-সময় বিহারের রাজধানী পাটনার হাজিপুর থেকে এখানে এলো এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবার। এখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার তাগিদে তখন একটা আদালত বসেছিল। সেই আদালতের কাজী নির্বাচিত হয়েছিলেন সেই পরিবারের শিক্ষিত এক গুণী মুসলিম। তখন থেকে সে-পরিবার ‘কাজী পরিবার’ উপাধি পায়। সেই পরিবারেরই বংশধর আমরা। কুঁড়েঘর আর টালিঘর দিয়ে সেই আভিজাত্যের উচ্চতা মাপা উচিত হবে না, বউমা।’

কী বলতে কী প্রসঙ্গ চলে এসেছে দেখে চুপ হয়ে গিয়েছিলেন জাহেদা খাতুন। বুঝলেন বংশমর্যাদা আর আভিজাত্যের অহংকার ছাড়া এ পরিবারে অহংকার করার মতো আর কিছু নেই। কুঁড়েঘরে থেকেও বড়াই করে টালিঘরের সুবিধা খাটো করে দেখেন তাঁরা। তবে নিজের অহংকার হচ্ছে দুখু মিয়াকে নিয়ে । দুঃখের সংসারে তার জন্ম বলেই কি দুখু নাম রেখেছেন তার বাপ-দাদা? নাকি প্রথম পুত্রসন্তান কাজী সাহেবজানের পর চার-চারটি পুত্র একে একে অকালে মায়ের কোল খালি করে চলে যাওয়ার পর দুখু মিয়ার জন্ম হয়েছিল বলেই এই নাম রাখেন পরিবারের সদস্যরা? মা হয়েও ব্যাপারটা খতিয়ে দেখেননি কখনো। সন্তানের পোশাকি নাম কাজী নজরুল ইসলাম শুনতে ভালোই লাগে মায়ের। এ মুহূর্তে শ্বশুরের কথা উড়ে গেল মাথা থেকে। স্বামীর অধিকার খাটিয়ে কাজী ফকির আহমদ আবার বললেন, ‘দুখুকে বলে দিয়ো কাল ওকে মক্তবে ভর্তি করিয়ে দেবো। ও যেন তৈরি থাকে।’

মন খারাপ করে জাহেদা খাতুন কলসি নিয়ে গেলেন বাড়ির দখিনদিকে, পুকুরপাড়ে। পুকুরটার নাম হাজি পুকুর। কাজী বাড়ির পুকুর হাজি পুকুর নামে খ্যাত–বিষয়টি প্রথম থেকেই জাহেদা খাতুনের মনে প্রশ্ন তৈরি করেছিল। স্বামীকে জিজ্ঞেস করায় তিনি বলেছিলেন, ‘হাজি পালোয়ান নামের এক ফকির এই শুকনো মাটির দেশে বসবাসের জন্য পুকুরটি কেটেছিলেন। সেই থেকে এ পুকুরের নাম হয়ে যায় হাজি পুকুর।’

পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে গাছের আড়াল থেকে তিনি পুবদিকে তাকিয়ে দেখে নিতে চাইলেন হাজি পালোয়ানের মাজারে লোকের আনাগোনা। ওপারে তেমন আনাগোনা নেই দেখে খুশি হয়ে এবার তাকালেন পশ্চিমে, মসজিদের দিকে। সেখানেও এখন কেউ নেই। মনে দুশ্চিন্তার ঢেউ থাকলেও সিঁড়ি বেয়ে পানিতে নেমে টলমলে পানির উপরিতলে প্রতিচিত্র দেখে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলেন। এ বাড়ির পুকুর, পুকুরের পুবপাড়ে মাজার আর পশ্চিমের মসজিদটি সত্যিই আভিজাত্যের রেশ রেখে যায় মনেএ শান্তির পাশাপাশি আছে দুখুর সুনাম। শিশুবয়স থেকে ছেলেটা কেমন ছন্দ ধরে কথা বলে, ছন্দ মেপে বাক্য উড়িয়ে দেয়, হো-হো করে প্রাণখোলা হাসি হাসে। ওর নাম দুখু না রেখে সুখু রাখলেই ভালো হতো।

আচমকা কোথা থেকে যেন মাটির একটা ঢ্যালা এসে পড়ল পুকুরে। শান্ত পুকুরে ঢেউ উঠল। চারপাশে ছড়িয়ে ঢেউ আবার মিলিয়ে গেল। এদিক-ওদিক মাথা ঘুরিয়ে চারপাশে দেখতে লাগলেন তিনি। হঠাৎ বুঝলেন কী ঘটেছে। তালগাছের আড়ালে শার্টের একাংশ দেখা যাচ্ছে। ঢিল ছুড়ে সে আড়ালে লুকিয়েছে। লুকোতে পারল না। মায়ের চোখে ধরা খেয়ে গেলেও মা বুঝতে দিলেন না যে টের পেয়েছেন তার উপস্থিতি। কলসিটা ধুয়ে পানি ভরে উপরের দিকে উঠে আসছিলেন তিনি। কিছুদূর এগোনোর পর হালুম করে লাফ দিয়ে মায়ের সামনে এসে দাঁড়াল দুখু।

না, কোনো প্রতিক্রিয়া নেই মায়ের। ছেলেকে কাছে পেলে যেভাবে খুশি হতেন, তার ছিটেফোঁটা দেখল না দুখু। পাথরের মূর্তি যেন হেঁটে যাচ্ছে কলসি কাঁখে। তেমনই মনে হলো দুখুর।

মায়ের প্রতিক্রিয়া না পেয়ে অভিমানী হলো দুখু। মুহূর্তেই খেপে উঠল সে। বাড়ির দিকে না গিয়ে দুমদুম করে পা ফেলে সে গেল মাজারের দিকে। দুপুরে খাওয়ার জন্য এসেছিল বাড়িতে। ঠিক সময়ে না এলে মা প্রায়ই বকতেন। আজ ঠিক সময়ে খেতে এসেও, মায়ের সঙ্গে দুষ্টুমি করার পরও সাড়া না পেয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে চলে যাচ্ছে, অথচ মা তার দিকে তাকালই না। বিষয়টা কিছুক্ষণ পর ভাবিয়ে তুলল তাকে।

এদিকে খিদেয় পেট চিনচিন করছে। বাড়িতেও যেতে পারছে না অভিমানের কারণে। মাজারের এক কোণে বসে ভাবতে গিয়ে আবিষ্কার করল কোথাও একটা সমস্যা হয়েছে। মা তো কখনো এমন আচরণ করেন না। বরং যে-কোনো বিষয়ে ছেলেকে লাই দিতে অভ্যস্ত। মায়ের প্রশ্রয় আর আদর পেয়েই বড়ো হচ্ছে সে। সেই আদরের ছায়ায় কালো মেঘ উড়ে এলো কেন? ভাবতে বসেও চালাতে পারল না ভাবনার চাকা। পেটের উনুন আর মাজারের বিতরণ করা হালুয়ার গন্ধের দাপটে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে, যা কখনো করে না, তাই-ই করল সে। কচুপাতায় করে বিলি করতে থাকা হালুয়ার জন্য মাজারের লাইনে দাঁড়াল। লাইন তত লম্বা নয়। আর মাজারের উত্তর পাশের এ অংশ থেকে বাড়ির অংশ দেখা যায় না। আবার মাজারের খাওয়ার ব্যাপারে কড়া নিষেধাজ্ঞা আছে কাজী ফকির আহমদের। সে-নিষেধ উড়ে গেছে মাথা থেকে। ক্ষুধার কাছে এ মুহূর্তে যত আদেশ-নিষেধ হার মেনে পালিয়ে গেছে।

হালুয়ার জন্য যে-ই না সে হাত বাড়িয়েছে, অমনি পেছন থেকে কে যেন এসে খপ করে চেপে ধরল খ্যাপার হাত।

মাথা ঘুরিয়ে জ্যান্ত ভূত দেখার মতো বাবাকে দেখে চমকে উঠল দুখু। কেঁচোর মতো গুটিয়ে যেতে লাগল তার দেহ।

‘এ-হালুয়া তোমার না। যাঁরা মাজারে এসেছেন, যাঁদের পেটে খাবার দেওয়ার সামর্থ্য নেই, এসব তাঁদের জন্য, জানো না?’

ঢোক গিলে মাথা ঝাঁকিয়ে দুখু জবাব দিলো, ‘জানি।’

‘যাও। বাড়ি যাও। গোসল সেরে বাড়িতে গিয়ে ভাত খাও।’

ভীত ছেলের মুখ দেখে বেশি রেগে ওঠার সুযোগ পেলেন না কাজী ফকির আহমদ। রাগ তাঁর শীতল হয়ে গেল। প্রতিবাদ না করে মাথা নিচু করে লক্ষ্মী ছেলের মতো সুড়সুড় করে বাড়ির দিকে হাঁটা দিলো দুখু। বাবার কাছে ধরা খেয়ে ভুলে গেল মায়ের ওপর অভিমানের কথা।

চলবে...

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x