কিশোর উপন্যাস

দুরন্ত দুখু

আচমকা দুখুর মন উতলা করে কাব্যধ্বনি বেরিয়ে আসতে চাইল, ‘হিন্দু না ওরা মুসলিম ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?’ ধ্বনিটি বাইরে প্রকাশ করল না, ঠেলে ঢুকিয়ে দিলো নিজের অন্তর্জগতে
দুরন্ত দুখু
অলংকরণ : সোহেল আশরাফ

॥ চার ॥

মুক্ত আকাশের নিচে শুরু হলো মক্তবজীবন

দুখুকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হলো না। পাঠশালা থেকে ছাড়িয়ে এনে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হলো বাড়ির পাশের এক মক্তবে। মাটির দেয়াল আর খড়ের পুরু ছাউনির ভেতর পড়তে ভালো লাগে না। একদিন ছোটো হুজুরকে বলেই ফেলল মনের কথা।

ছোটো হুজুর অন্য ছাত্রদের মতামত জানতে চাইলেন।

কেউ ঘরের ভেতরের পাটিতে বসে পড়তে রাজি না। বাড়ির বাইরে যে তালগাছ আছে তার নিচে পাটি বিছিয়ে পড়ার ইচ্ছা প্রকাশ করল সবাই। ছোটো হুজুর তাদের ইচ্ছার মূল্য দিলেন। বদ্ধঘরের ভেতর থেকে মুক্ত আকাশের তলে শুরু হলো মক্তবজীবন।

এক সহপাঠী বলল, ‘দুখু, তোর সাহসের জন্য আজ মুক্তি ঘটল আমাদের।’

‘এই যে, আমরা সবাই যা ভেবেছি, বলতে পারিনি আমাদের মনের কথা, তুই বলে ফেললি, বলার জন্য যে-সাহস আর তেজ লাগে, তা আছে তোর মধ্যে। আমাদের কারো মধ্যে সে-সাহস নেই। দেখিয়ে দিলি তুই।’

‘না, কিছু দেখানোর জন্য কোনো কথা বলিনি। মনের কথাটা কেবল ভদ্রভাবে হুজুরকে জানিয়েছি। এখানে সাহস আর তেজের কিছু নেই।’

সহপাঠীকে অপমান না করে, নিজের মনের কথা স্পষ্ট করে বলে পড়তে বসে গেল সে। আশ্চর্য! মন বসছে না পড়ায়। মন কেবলই চারদিকে ছুটোছুটি করছে। বিশেষ করে মন ছুটে যাচ্ছে বারবার ছেড়ে আসা পাঠশালায়। জানন্দের জন্য মায়া হচ্ছে। হঠাৎ ওর কথা মনে হওয়ায় বুকের ভেতর থেকে একটা চাপা কষ্ট বেরিয়ে এল। সঙ্গে সঙ্গে চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল লোনাজল।

সবাই পড়ায় মন দিয়েছে। সুর করে সামনে-পেছনে দুলে দুলে পড়ছে। কেবল দুখুর মন নেই পড়ায়। আচমকা তার মনে হলো বিনোদবিহারী স্যার মাথায় হাত রেখেছেন। আশীর্বাদের ভঙ্গিতে বলছেন, ‘দুখু, কাব্যরচনা করো তুমি। কেঁদো না।’

হাতের ছোঁয়া পেয়ে কষ্টের ঘোর থেকে বেরিয়ে পেছনে তাকিয়ে দুখু দেখল, ছোটো হুজুর মাথায় হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছেন।

হুজুরকে দেখে চমকে উঠল। লজ্জা পেয়ে চোখের পানি মুছে পড়ায় মন দেওয়ার চেষ্টা করল।

হুজুর বললেন, ‘থাক। আজ আর তোমাকে পড়তে হবে না। ওঠো। যাও, ওই যে ওই হিজলগাছের তলে, দেখো কে এসেছে তোমার সঙ্গে দেখা করতে।’

‘কে?’

‘তা তো জানি না। দেখলাম একটা ছেলে কাঁদছে। কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করায় সে জানাল তোমার সঙ্গে দেখা করতে চায়।’

‘জানন্দ? বিনোদবিহারী পাঠশালার জানন্দ, হুজুর?’

‘নাম তো জিজ্ঞেস করিনি। তুমি যাও। দেখা করো।’

একলাফে উঠে দাঁড়াল দুখু। ছুটে গেল হিজলগাছের দিকে। কাছে গিয়ে দেখল গাছের উলটোদিকে হেলান দিয়ে বসে আছে জানন্দ।

হঠাৎ দুখুকে দেখে হুহু করে কেঁদে উঠল সে। জানন্দের কান্না দুখুর হৃদয়েও জাগিয়ে তুলল কান্নার ঢেউ। গাছের সঙ্গে হেলান দিয়ে সে বসে পড়ল মাটিতে।

কাঁদতে কাঁদতে জানন্দ বলল, ‘তোকে ছাড়া আর পাঠশালায় যেতে ইচ্ছে করে না আমার।’

‘আমারও এখানে ভালো লাগে না,’ চোখের পানি মুছতে মুছতে জবাব দিলো দুখু।

অনেকক্ষণ দুই বন্ধু কথা বলতে পারল না।

হিজলগাছের পাতার উপর তখন নরম রোদ স্পর্শ করছে। গাছের রোদ বেয়ে প্রকৃতির উষ্ণতা নেমে যাচ্ছে নিচে। আর গাছের সঙ্গে হেলান দিয়ে বসা দুই বন্ধুর দেহের মধ্যে ছড়িয়ে যাচ্ছে সে উষ্ণতা। নীরবতা ভেঙে জানন্দ বলল, ‘যদি আমি মুসলমান ঘরের সন্তান হতাম তোর সঙ্গে চলে আসতাম এ মক্তবে। একসঙ্গে পড়তাম। পাঠশালায় আমার আর যেতে ইচ্ছে করে না, দুখু।’

আচমকা দুখুর মন উতলা করে কাব্যধ্বনি বেরিয়ে আসতে চাইল, ‘হিন্দু না ওরা মুসলিম ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?’ ধ্বনিটি বাইরে প্রকাশ করল না, ঠেলে ঢুকিয়ে দিলো নিজের অন্তর্জগতে। কণ্ঠের ভেতর থেকে, গলায় বেদনার রঙে মিলেমিশে বেরোল নিজের আর্তচিৎকার‘পাঠশালা আর তোকে ছেড়ে আসতে আমারও কষ্ট হচ্ছে। কী করব? বাপজানের কথা অমান্য করার শিক্ষা তো আমার নেই। তোরও নেই। তুই তোর জায়গায় পড়, আমি পড়ব আমার জন্য নির্ধারিত জায়গায়। তারপর মক্তব ছুটি হলে আমি চলে যাব পাঠশালায়। দুজনকে কেউ আলাদা করতে পারবে না।’

দুখুর প্রাণের কথা শুনে জানন্দের ভেতর থেকে জেগে উঠল আরেক প্রাণ। জেগে ওঠা প্রাণস্পন্দনে হিজলগাছের ডালে বসা বুলবুলির দল গান গেয়ে উঠল, ডালে দোলা দিয়ে উড়তে লাগল ওদের মাথার উপর দিয়ে।

চলবে...

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x