কিশোর উপন্যাস

দুরন্ত দুখু

হাতের ছোঁয়া পেয়ে এবার হুহু করে কেঁদে উঠল দুখু। দুখুকে কান্নার সুযোগ দিলেন প্রধান শিক্ষক। তারপর ছোটো মৌলবিকে ডেকে আদেশ দিলেন, ‘মক্তবের বাকি পরীক্ষার বিষয়গুলো তিনদিন পর থেকে শুরু হবে। এ তিনদিন পরীক্ষা স্থগিত করা হলো।’
দুরন্ত দুখু
অলংকরণ : সোহেল আশরাফ

॥ ছয় ॥

বইঠাবিহীন সংসার-নৌকো

মক্তবে নিম্নপ্রাথমিক পরীক্ষা চলছে। খাতা জমা দেবে দুখু। এমন সময় জানালা দিয়ে চোখ গেল বাইরে। তার ছোটো ভাই কাজী আলী হোসেন দাঁড়িয়ে আছে। তাকে এলোমেলো লাগছে। দূর থেকেই বুঝা যাচ্ছে তার চোখ ফোলা। চোখ বেয়ে ঝরছে জল। কোনো দুর্ঘটনা কি ঘটেছে? মনে হঠাৎ উদয় হওয়া প্রশ্নটা উড়িয়ে দিয়ে পরীক্ষার খাতায় আবার একবার চোখ বোলাতে লাগল দুখু। চোখ বসছে না। বারবার সরে যাচ্ছে বাইরে। আলী হোসেনের মুখের দিকে। কেউ কি তাকে মেরেছে? সুবোধ ছেলে আলী হোসেন। কে মারবে তাকে? কিছুই ঢুকছে না মাথায়। ধীরেসুস্থে রিভিশনের পরিবর্তে কোনোরকমে দেখে খাতা জমা দিয়ে বাইরে আসার সঙ্গে সঙ্গে আলী হোসেন ঝাঁপিয়ে পড়ল বড়ো ভাই দুখুর বুকে। নিজেও ছোটো, নিম্নপ্রাথমিকের ফাইনাল দেওয়া একটা শিশুর বোধই-বা কতটুকু হতে পারে? কিন্তু এ মুহূর্তে দুখুকে দেখে মনে হচ্ছে বেশ বড়োসড় সে। বড়ো ভাইয়ের বুকে আশ্রয় নিয়েছে ছোটো ভাই।

একসময় কান্না থামিয়ে আলী হোসেন বলল, ‘আব্বাজান নেই! আব্বাজান নেই!’

আকাশ ভেঙে পড়ল বলা যায় না। দুখুর মনে হলো বিস্তৃত সীমাহীন আকাশসীমা আরও সরে গেল দূরে। সেই সীমায় আর কখনো পৌঁছাতে পারবে না সে। আকাশে ঠিকানাবিহীন শূন্যতার মধ্য দিয়ে বড়ো হতে হবে তাদের। বইঠাবিহীন সংসার-নৌকোর হাল ধরতে হবে তাকেই। সংসার টিকিয়ে রাখতে হলে আর উপায় নেই।

দুখুর দুঃখ উড়ে গেল। দুঃখবিহীন শূন্য বুকে কোনো আলোড়ন উঠল না। আলী হোসেনকে বুকে ধরে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। একবার ছোটো ভাইয়ের মাথায় হাত রাখল সে, যেন বড়ো কোনো অভিভাবক হাত রেখেছেন বাবা হারানো শোকগ্রস্ত সন্তানের মাথায়।

দূর থেকে দুই ভাইকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এগিয়ে এলেন মক্তবের প্রধান শিক্ষক কাজী ফজলে আহমদ। তিনি দুহাত রাখলেন দুই ভাইয়ের মাথার উপর। ইতোমধ্যে তিনিও শুনেছেন দীর্ঘদিনের সুহৃদ বন্ধু কাজী ফকির আহমদের মৃত্যুসংবাদ।

হাতের ছোঁয়া পেয়ে এবার হুহু করে কেঁদে উঠল দুখু। দুখুকে কান্নার সুযোগ দিলেন প্রধান শিক্ষক। তারপর ছোটো মৌলবিকে ডেকে আদেশ দিলেন, ‘মক্তবের বাকি পরীক্ষার বিষয়গুলো তিনদিন পর থেকে শুরু হবে। এ তিনদিন পরীক্ষা স্থগিত করা হলো।’

প্রধান শিক্ষক চলে যাওয়ার পর ছোটো মৌলবি কাছে এসে বললেন, ‘যাও। বাড়ি যাও দুই ভাই। আমরাও আসছি। কাজ গুছিয়ে গোসল, দাফনের ব্যবস্থা করব আমি।’

আকাশে তখন কড়া রোদ। শুষ্ক সড়কের উত্তাপও অনেক বেশি। জগতের তাপে বিগলিত হলো না দুখু। ছোটো ভাইকে নিয়ে চলল বাবার দাফনকাজে অংশগ্রহণের জন্য।

বাড়ির উঠোনে পৌঁছানোর পর মাটির দেয়ালঘরের খিড়কি দিয়ে ছোটো বোন, এখনো তেমন বুঝ হয়নি, উম্মে কুলসুম, দেখল দুই ভাইকেছুটে এলো তাদের কাছে। দুখুর কোলে উঠে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল বাড়ির বাইরে ভিড় জমানো গাঁয়ের লোকদের দিকে। কুলসুমকে কোলে নিয়ে ঘরে এসে দুখু দেখল, নির্বাক বসে আছেন মা। কান্না নেই। প্রতিক্রিয়াহীন।

আচমকা জাহেদা খাতুন উপস্থিত তিন সন্তানকে জড়িয়ে ধরলেন। তারপর হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। একসময় কাঁদতে কাঁদতেই বললেন, ‘কে দেখবে আমাদের? কী হবে আমাদের?’

দুখুর বোধে মায়ের কথা নাড়া দিলো অন্যভাবে। দিশেহারা হওয়ার পরিবর্তে নতুন আশার আলোয় বুক ভরে গেল তার। কোত্থেকে এলো আলোর এই জোয়ার, না-বুঝে মাকে সান্ত্বনা দেওয়ার উদ্দেশ্যে আপন বোধের ভেতর থেকে জেগে উঠে শান্ত আর দৃঢ়কণ্ঠে বলল, ‘আমি আছি না, মাজান? উপরে আল্লাহ আছে। আর আমি তো আছি নিচে। নিশ্চয় পথে ভেসে যাব না আমরা।’

ছেলের কণ্ঠে আত্মবিশ্বাসের জোর দেখে, কান্না থেমে গেল মায়ের। তিন সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরে চেয়ে রইলেন অচেনা, অদেখা ভবিষ্যতের দিকে।

॥ সাত ॥

দুর্দমনীয় তেজ

খর রোদেও ঘাম বেরোচ্ছে না। জীবনের কঠিন সময় পার করতে গিয়ে দেহের ঘামও যেন শুকিয়ে গেছে। হাজি পালোয়ানের কবরে খাদেম হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর কাজ করতে গিয়ে, রোদে পুড়ে, যা আয় হচ্ছে সংসার চলছে না তাতে। বাড়ছে যাতনা। রোজ দেখে, শুধু নিজেদের গাঁ-গেরাম না, দূর গেরাম থেকেও মানুষ আসছে কবরে। কবরকে ঘিরে মানুষের আনাগোনা ও অন্যরকম উন্মাদনা দেখে মনটা তেতো হতে থাকে। কবরে কেন মানুষ টাকাপয়সা দেয়? কবরকে উদ্দেশ করে কেন মানত করে? বিষয়টা বুঝে উঠতে পারে না দুখু। অথচ মক্তবে পড়া ধর্মের জ্ঞানের আলোয় জেনেছে যা-কিছু চাওয়ার, চাইতে হবে আল্লাহর কাছে। অর্জিত জ্ঞান আর প্রচলিত রীতিনীতির মধ্যে কাজ-কারবারের এ বিপরীত জীবনাচার খেদমতকাজে তার আগ্রহে ভাটির টান তৈরি করে। বেঁচে থাকার তাগিদে কাজে এলেও নানা ধরনের অনৈতিক বিষয় চোখে পড়তে পড়তে ভেতরের প্রতিবাদী মন মুচড়ে যেতে থাকে, প্রতিবাদ করে মনে মনে। ওপরে ওপরে মানলেও ভেতরে ভেতরে মানতে পারে না মাজার ঘিরে গড়ে ওঠা কীসব ব্যাবসা-প্রতারণা। হঠাৎ দেখল কবরের বড়ো খাদেম নজরানার বাক্সে জমা বেশ কিছু টাকা সরিয়ে অবশিষ্টাংশের হিসাব করছেন। সোজা কথায় চুরি করছেন। ব্যাপারটা চুপ করে দেখলেও বুকের মধ্যে ঘটে গেল বারুদের বিস্ফোরণ।

‘এটা কী করছেন, হুজুর?’

‘কী করছি?’

‘ওই যে, টাকা সরিয়ে ফেললেন? খাতায় যে-হিসাব তুললেন, আর যা পেলেন, তা তো এক হলো না! এটা তো একধরনের চুরি!’

চট করে একটা চড় উড়ে এসে বসে গেল দুখুর গালে।

চড় খেয়ে হতভম্ব হয়ে গেল দুখু। দীর্ঘদিনের চেনা লোকটাকে তার অচেনা লাগতে শুরু করল। লোকটির অচেনা চেহারার ভেতর থেকে ফেনিয়ে ফেনিয়ে বেরোতে লাগল কঠিন সব কথা, ‘আর কোনোদিন বেয়াদবি করলে, মিথ্যা রটনা করলে পুকুরে ছুড়ে মারব তোকে।’

কঠিন কথায় ভয় পেল না দুখু। নির্বাক মুহূর্তটি কাটিয়ে দৃঢ়ভাবে বলল, ‘বেয়াদবি কী করলাম? মিথ্যা বললাম কোথায়?’ বড়ো খাদেমের চোখের দিকে তাকিয়ে মাথা উঁচু করে দৃঢ়ভাবে জানান দিলো সে আপন বোধের কথা। অনিয়মের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছে তার মন। দুর্দমনীয় এ তেজের বিকিরণ ঘটল আপন মহিমায়। কোত্থেকে এলো এ সাহস, নিজেই জানে না দুখু।

দুখুর প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর শুনে নত হয়ে গেল বড়ো খাদেমের উদ্যত বিষধর ফণা। মিনমিন করে বলতে চাইলেন, ‘সব টাকা হিসাবের খাতায় ওঠালে আমাদের পেটে ভাত জুটবে? সংসার চলবে? তোকে ভাগ দেবো। চুপ থাক এখন।’

চুপ থাকল না দুখু। অনিয়মের বিরুদ্ধে যেভাবে তেতে উঠেছে তার বুক, তাকে পোষ মানানোর জন্য বড়ো খাদেমের বলা কথা আর প্রস্তাবের মুখে একইভাবে রুখে দাঁড়িয়ে বলল, ‘চোরের সঙ্গে কাজ করব না আমি। পেটে ভাত জোটানোর জন্য চুরি করব না। আমার ন্যায্য মাইনের বাইরে এক পয়সার দিকেও তাকাব না, লোভ করব না। বরং বলে রাখছি, যদি নিজের এই অকাজ শুধরে না নেন কমিটির কাছে প্রমাণ-সহ সব বলে দেবো আমি।’

ধরা খেয়ে বড়ো খাদেম একদম নত হয়ে বললেন, ‘কী করব বল, এখানে যে টাকা বেতন হিসেবে দেয়, তা দিয়ে সংসার চলে না। না খেয়ে থাকতে হয়। অভাবে স্বভাব নষ্ট হয়ে গেছে। আর কোনোদিন এ কাজ করব না! দেখ, এই যে, সরানো বিশ টাকা খাতায় তুলে দিলাম।’

‘অভাবে স্বভাব নষ্ট’কথাটা তিরের মতো গেঁথে গেল বুকে। তিরের আক্রমণ থেকে নতুন প্রেরণা জেগে উঠল। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, শত অভাবেও নষ্ট হতে দেবে না সে নিজের স্বভাব। অভাব দূর করার জন্যই নিজের শক্তি কাজে লাগাতে হবে, নিজেকে যোগ্য করে তুলতে হবে। নিজের লোভ সামাল দিতে হবেএ বোধের ভেতর থেকে সে-ই-ই যেন হয়ে উঠল কমিটির চেয়ারম্যান। বড়ো খাদেমের উদ্দেশে বলল, ‘যেসব হালুয়া-রুটি মাজারে আসে, যারা পাওয়ার, সেসব অভুক্ত দর্শনার্থীকে খাওয়াতে হবে। মাজারের হালুয়া-রুটিও সরানো যাবে না। বহু অনিয়ম করেছেন আপনি, দেখেছি আমি। আমার সামনে কোনো অনিয়ম সইব না আমি।’

দুখুর কথা যৌক্তিক, বুঝেছেন বড়ো খাদেম। তা ছাড়া মাথা তুলে জোরালো ভাষায় কথা বললেও অশ্রদ্ধা জানাচ্ছে না, বেয়াদবি করছে না এ খুদে খাদেম, খুদে হুজুর। বুঝতে অসুবিধা হলো না বড়ো খাদেমের। বললেন, ‘চোখে আঙুল দিয়ে আমার দোষ ধরিয়ে দিয়েছ তুমি। মানুষ নিজের দোষ ধরতে পারে না নিজে। তোমার কথায় নিজের তলিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা ধরতে পেরেছি। আশা করি, সেই সড়কের বাঁক ঘুরিয়ে নেব আমি। তোমাকে ধন্যবাদ।’ প্রথমে তুচ্ছার্থে তুই করে বললেও, বড়ো খাদেমের কণ্ঠ তুই থেকে তুমিতে নেমে এসেছে এখন। বিষয়টা খেয়াল করল না দুখু। বড়ো খাদেমও না।

হাজি পালোয়ানের কবরের উপর একটা চাদর বিছানো আছে। অনেকটা কচুপাতার রঙের চাদরটিতে বেশ ময়লা জমেছে। আগে লাল রঙের গিলাপ পরানো হতো। লালের পরিবর্তে সবুজ কেন এলো, জানে না দুখু। চাদরটা ধোয়া দরকার। ছোপ ছোপ ময়লা জমেছে। অনেক দর্শনার্থী হাত দিয়ে ধরে দেখে। আবেগে ঘাঁটাঘাঁটি করে। খামচে ধরে কান্নাকাটি করেবিষয়টা বিব্রত করে দুখুকে। চাদর ময়লা হয় মানুষের আচরণে। এটা বিরক্তির একটা বড়ো কারণ হলেও ভাগ্য ফেরাতে আসা, রোগশোক থেকে মুক্তি পেতে আসা অসুস্থদের কবরের বাক্সে টাকা ঢেলে দেওয়া ব্যবসায়িক স্বার্থে কবরের খাদেমদের জন্য আনন্দের বিষয় হলেও এতটুকুন বয়সেও বুঝতে বাকি থাকে নাবিষয়টা মোটেই ভালো নয়। কাছ থেকে সে দেখেছে কারো ভাগ্য ফেরে না, এখানে এসে কোনো লাভ হয় না তাদের। প্রতারিত হয় মানুষ। কে এই কবরের মাহাত্ম্যের কথা ছড়িয়েছে, জানা না থাকলেও বুঝতে পারে, তাদের উদ্দেশ্য মহৎ ছিল না, মহৎ নয়। এমন একটি জায়গায় পেটের দায়ে কাজ করতে হচ্ছে ভেবে মন আরও খারাপ হয়ে যায়। ক্ষুধার্ত দেহের ক্লান্তিতে একসময় দু-চোখ বুজে এলো তার। কবরের পাশের শক্ত মাটির দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে রইল সে।

চলবে...

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x