কিশোর উপন্যাস

দুরন্ত দুখু

মুয়াজ্জিন হিসেবে চাকরির কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে চকচক করে উঠল দুখুর চোখ। তার চোখের দ্যুতি ছড়িয়ে গেল চারপাশে। সেই আলোকতরঙ্গ স্পর্শ করল পাখির ঝাঁককে। সঙ্গে সঙ্গে নিরাপদ আশ্রয় থেকে উড়াল দিলো তারা। আনন্দ ছড়িয়ে ডানা ঝাপটে গাইল সুখের গান
দুরন্ত দুখু
অলংকরণ : সোহেল আশরাফ

॥ নয় ॥

খুদে মাস্টার, খুদে মুয়াজ্জিন

মক্তবে ঢোকার পথে তালগাছের ছায়ায় মন খারাপ করে বসে আছে বিপন্ন আর বিধ্বস্ত দুখু। অনিচ্ছাসত্ত্বেও কবরের খাদেম হিসেবে চাকরি করতে হচ্ছে তাকে। বিষয়টি কেড়ে নিয়েছে তার মনের সুখ। অসুখী মনের হতাশা চেপে ধরছে তাকে। কী করবে বুঝতে না পেরে এসেছে মক্তবে, প্রধান শিক্ষক মৌলবি কাজী ফজলে আহমদের কাছে।

তিনি মক্তবে নেই। ছোটো মৌলবি জানিয়েছেন তাঁর আসতে দেরি হবে। বসে থাকার জন্য ধৈর্যের প্রয়োজন, এতটুকুন জীবনে দুখু বুঝে ফেলেছে ধৈর্যের বিকল্প নেই। যে-কোনোকিছু পাওয়ার জন্য ধৈর্য ধরতে না পারলে কখনো সফলতার মুখ দেখা যাবে না। ভাবতে ভাবতে পেটে খিদে থাকা সত্ত্বেও অটল, অনড় বসে রইল দুখু। কড়া রোদে ছায়ায় থাকা স্বস্তিদায়ক। ছায়ার শান্তি খিদের মধ্যেও টেনে বের করে আনল মনের সৌন্দর্যবোধ। নতুন চোখ খুলে গেল আসল চোখের ভেতর। নতুন চোখে দেখল খরখড়া মাটির উপর বসে আছে নিজের ছায়া। দেহটাকে তার মনে হলো মাটির ঢ্যালার মূর্তি। সেই মূর্তির ছায়ায় কি প্রাণ আছে? নিজের প্রাণ কি দেহছায়ার মধ্যে জায়গা পায়?

মনে হলো পায় না।

ছায়ার কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। একবার ঝুঁকে নিজের ছায়াটা ধরার চেষ্টা করল সে। সঙ্গে সঙ্গে ছায়াটাও সরে গেল সামনে থেকে। হাত বাড়াল ধরতে, পারল না। ছায়ার সঙ্গে খেলতে গিয়ে হো-হো করে দুখু হেসে উঠল আপনমনে। কী আশ্চর্য, ছায়াও হাসছে! ছায়ার হাসি শুনে গাছের মাথায় বসে জিরোতে থাকা বুলবুলিও গেয়ে উঠল নিজের একান্ত সুরে মধুর গান। অবুঝ পাখির মিষ্টি সুর দুখুর বুকের ঘরে লুকিয়ে থাকা বাঁশিতে জাগিয়ে দিলো সুরের ঢেউ। গুনগুন করে গাইতে লাগল গান। কী গান বেরোচ্ছে তার কণ্ঠ থেকে, জানা নেই দুখুর। ঠোঁট থেকে আসছে বুকের ঘরে জমে থাকা ভাঙা ঘরের হাহাকারভরা সুর। সেই সুর থামিয়ে দিলো সে-পথ দিয়ে আসতে থাকা প্রধান মৌলবির পথচলা। নিঃশব্দে পা ফেলে ফেলে তিনি দাঁড়ালেন গাছের উলটো দিকে। দুখু টেরই পেল না কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি দাঁড়িয়ে আছে খুব কাছে।

আপন জগতে ডুবে ছিল দুখু। অনেকক্ষণ খুব কাছে দাঁড়িয়ে দুখুর ভেতর লুকিয়ে থাকা আরেক দুখুকে আবিষ্কার করে খুশিতে চকচক করে উঠল প্রধান মৌলবির চোখ। এবার সামনে এসে দাঁড়ালেন তিনি।

চোখ বন্ধ করে মাথা দোলাতে দোলাতে সুরের মূর্ছনা তুলতে থাকা দুখুর তখনো হুঁশ ফেরেনি। সে আছে তার কল্পজগতে, স্বপ্নজগতে।

প্রধান মৌলবি ডাক দিলেন, ‘দুখু!’

চমকে চোখ খুলে তাকানোর সঙ্গে সঙ্গে একলাফে দাঁড়িয়ে দুখু বলল, ‘আপনার জন্য অপেক্ষা করছিলাম।’

দুখুর মুখের কথা তাঁর কানে ঢুকল কি না কে জানে। তার কথায় সাড়া না দিয়ে একটা কিছু আবিষ্কার করে ফেলে স্তব্ধ হয়ে গেছেন, এমন ভঙ্গিতে মাটির ঢ্যালার স্তূপের মতো নিঃসাড় দাঁড়িয়ে রইলেন তিনি।

‘হুজুর, আপনার কাছে এসেছিলাম। না পেয়ে এখানে বসে অপেক্ষা করছিলাম।’

তার কথার সঙ্গে সঙ্গে তালগাছের মাথার ঝোপের ভেতর থেকে একঝাঁক বুলবুলি উড়াল দিয়ে আবার বসল গাছের মাথায়। উড়ন্ত পাখির ঝাঁকের ছায়াও আচমকা ছায়া হয়ে উড়তে শুরু করেছিল শুকনো মাটিতে। সেই ছায়া অনুসরণ করে দুখু তাকাল উপরে। একবার ওড়ার পর আবার পাখির ঝাঁক আশ্রয় নিয়ে ফেলেছে নিজেদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে। দুখুও পাখিদের মতো উড়তে চায়, আবার আশ্রয়ও পেতে চায়। তার মনে হচ্ছে তার ওড়ার ডানা ভেঙে গেছে, নিরাপদ তো নয়-ই, অনিরাপদ আশ্রয়স্থলও জুটবে না কপালে। এমন বোধ নিয়ে দুখু আবার বলল, ‘হাজি পালোয়ানের মাজারের খাদেম হিসেবে কাজ করব না। কীভাবে চলব, কী করব পথ বাতলে দেন।’

‘কেন, কাজ করবে না কেন?’

স্বপ্নের কথা খুলে বলল দুখু। হাজি পালোয়ানের উপদেশের কথাও বলল।

বড়ো হুজুর বললেন, ‘মাজার ঘিরে যা চলছে, তা আমিও মানতে পারি না। তবুও করার কিছু নেই। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ভুল সামাজিকতার এই চালচিত্র পরিবর্তনের শক্তি নেই আমার।’

দুখু বলল, ‘জানি। এ বয়সে সে-ধারণা হয়েছে আমার। তবে আমার সমস্যা অন্যখানে। খাদেম হিসেবে যে টাকা পাই, তা দিয়ে তিনবেলা খাবার জোটে না সবার। ঘরের টানাটানি আর দেখতে পারি না। সইতে পারি না। কী করব!’

বড়ো হুজুর বললেন, ‘তোমার মধ্যে অন্যরকম একটা আলো দেখেছি। চিন্তা কোরো না। সব সমস্যার সমাধান আছে। নিশ্চয়ই একটা উপায় পেয়ে যাব আমরা।’

দুজনের কথার ফাঁকে ছোটো হুজুরও পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। শুনেছেন দুজনার কথা। আগবাড়িয়ে বড়ো হুজুরের উদ্দেশে তিনি বললেন, ‘পিরপুকুরের মসজিদের জন্য একজন মুয়াজ্জিন খুঁজছিলেন কমিটির লোকজন। আমার কাছে এসেছিলেন। আমাদের দুখুকে কি সেখানে নিয়োগ দেওয়া যায় না, হুজুর?’

‘অবশ্যই। ভালো প্রস্তাব। আমি সুপারিশ করলে নিশ্চয় দুখুর চাকরিটা সেখানে হবে। কিন্তু ওরা তো খুব অল্প মাইনে দেয়। এ টাকায় কি চলবে ওদের সংসার?’

মুয়াজ্জিন হিসেবে চাকরির কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে চকচক করে উঠল দুখুর চোখ। তার চোখের দ্যুতি ছড়িয়ে গেল চারপাশে। সেই আলোকতরঙ্গ স্পর্শ করল পাখির ঝাঁককে। সঙ্গে সঙ্গে নিরাপদ আশ্রয় থেকে উড়াল দিলো তারা। আনন্দ ছড়িয়ে ডানা ঝাপটে গাইল সুখের গান। সেই গান ছুঁয়ে গেল দুখুর অন্তর। উপরের দিকে তাকিয়ে দুখুর মনে ঝটিতি উড়ে এলো একটা প্রশ্ন, ‘ওরা কি বুঝতে পারে আমার মনের কথা? পাখিদের কি বোঝার ক্ষমতা আছে মানুষের আনন্দ-বেদনার কথা?’

উত্তর খুঁজে পেল না। খোঁজার সময়ও হলো না। বড়ো মৌলবি আবার বললেন, ‘আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে। মুয়াজ্জিন হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি এ মক্তবের হাতেখড়ি-শ্রেণির মাস্টার হিসেবেও আমরা তাকে নিয়োগ দিতে পারি। ফজরের নামাজ পড়ে সে চলে আসবে এখানে। জোহরের আগেই চলে যাবে মসজিদে, দুই জায়গার রোজগারে ওদের ভাঙা সংসার বইঠা পাবে, কী বলেন, ছোটো হুজুর?’

এবার ছোটো হুজুরের চোখও খুশিতে হেসে উঠল। দুখুর ভেতরের জমাট দুঃখ গলে তরল হয়ে নেমে যেতে লাগল। আর সঙ্গে সঙ্গে কমে যেতে লাগল তার বুকের চাপও।

বড়ো মৌলবি এবার অন্যরকম একটা কাণ্ড ঘটালেন। দুখুকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, ‘আমি চাই, পড়াশোনাটাও চালিয়ে যাবে তুমি। নিশ্চয় একটা নতুন পথ খুলে যাবে আমাদের সামনে। তোমাকে আরও বড়ো হতে হবে, বাবা।’

চলবে...

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x