কিশোর উপন্যাস

দুরন্ত দুখু

নীরব দুখুর উদ্দেশে বাসুদেব আবার বললেন, ‘শুনেছি, কবিগান বা তোমার প্রিয় নিমশাহ লেটো দলের সঙ্গে আর থাকছ না তুমি, পড়াশোনায় ডুব দিয়েছ। ভালো, বেশ ভালো। তবুও যখন হাতের কাছে পেয়েই গেলাম, একটু যদি বসো, খুশি হব আমরা। তোমার দু-চারটা গান শুনে নিজেরা ধন্য হব।’
দুরন্ত দুখু
অলংকরণ : সোহেল আশরাফ

॥ বারো ॥

জীবনযুদ্ধে পিছু না-হটা

কাশিমবাজারে মহারাজাদের মাথরুন স্কুলে পড়াশোনার তেমন খরচ লাগে না। শুনে নিজে এবং স্বজনরা উৎসাহিত হলেও তার পড়াশোনার অর্থ জোগাতে হিমশিম খেতে লাগল কাজী পরিবার। গ্রামে এমন কোনো বিত্তশালী নেই যে তার কাছে হাত পাতা যায়। তবুও ঘরে ঘরে ঘুরতে লাগলেন মা জাহেদা খাতুন। কোনো লাভ হলো না। পরিবারের সদস্যদের পেটে জ্বলে ক্ষুধার আগুন। আর সে-আগুনের ছাট লাগল দুখুর গায়েও। মাথরুন স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। শুভানুধ্যায়ীরাও খোঁজ নিল না আর। রাস্তায় নেমে এলো দুখু আবার। পড়াশোনা নেই। চাকরি নেই। পুরোনো লেটো দলের প্রতিও আর টান বোধ করল না দুখু। তারাও চেয়েছিল পড়াশোনায় ব্যস্ত মেধাবী দুখু পড়ুক, গাঁয়ের নাম উজ্জ্বল করুক। তারাও আর খোঁজ নিল না। আত্মসম্মানবোধে টনটনে দুখুও আর গেল না নিজের গরজে। যত্রতত্র ঘুরে বেড়াতে থাকা ভবঘুরে দুখু শীতের ভোরে হাঁটতে হাঁটতে চলে এসেছে একটা রেল স্টেশনে। কয়লা কুঠির এ অঞ্চলে ধোঁয়া আর কয়লার মাখামাখি। এসব দেখে দেখে অভ্যস্ত দুখুর মনে মোটেও বিরক্তি জাগল না। কয়লাভরতি গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে জংশনের সাইডিং লাইনের উপর। তারই পাশ দিয়ে এগিয়ে গিয়ে সে দেখল লাইনের ধারে একটা আম-কাঁঠালের বাগান। বাগানের মাঝামাঝি জায়গায় বড়ো একটা আমগাছের নিচে চট বিছিয়ে অনেক লোক আসর জমিয়েছেহারমোনিয়াম বাজছে, ঢোল বাজছে, ঝুমুরের সুরে কবিগান হচ্ছে। আসরের তিন দিকে টিমটিম করে জ্বলছে তিনটি লণ্ঠন। আর একদিকে দুটো কাঁচা কয়লার গাদায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। হাড়কাঁপুনে শীত না হলেও মোটামুটি শীতে পুরো বাগানের মধ্যে ওম দেওয়া তাপের বিকিরণ ঘটছে। উষ্ণতার ছাট এসে লাগল পাশ দিয়ে হেঁটে চলা দুখুর দেহেও। শীতের চাদরটা গুছিয়ে নেওয়ার জন্য যে-ই সে আলগা করল মাথা থেকে, তাকে দূর থেকে দেখে ফেললেন আসরে বসে থাকা বাসুদেব। তাদের গাঁয়ের লোক বাসুদেব গানের দল করেছেন, এখানে-ওখানে আসর বসান। তিনি চিনে ফেললেন দুখুকে। ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে প্রশ্ন করলেন, ‘দুখু, কেমন আছ? পড়াশোনা কেমন চলছে?’

দুটো প্রশ্ন করেছে বাসুদেব। দুটোর উত্তরই প্রশ্নকারীকে কষ্ট দেবে, জানে দুখু। তাই কৌশলে এড়িয়ে গেল প্রশ্ন। প্রশংসার সুরে বলল, ‘আপনি তো ভালোই আছেন দেখছি। এমন ভালো পরিবেশে দল নিয়ে আসর জমিয়েছেন!’

‘না দুখু। ভালো নেই। বেঁচে থাকার লড়াই চলছে। শখও আছে। তবু বাঁচতে হলে যুদ্ধ করতে হবে। এ যুদ্ধে কি পিছু হটা যায়?’

‘লড়াই’, ‘যুদ্ধ’ শব্দ দুটি ঢুকে গেল দুখুর মস্তিষ্কে। ভেতরে প্রেরণা বোধ করললড়াইয়ের ময়দান থেকে পেছনে হটা যাবে নানিজের মধ্যে জ্বলে উঠল এই চেতনাসিক্ত বোধ।

বাসুদেব অনুনয় করে বলল, ‘বসবে আমাদের সঙ্গে? কিছুটা সময় দেবে? কয়েকটা গান গাইলে তো বটেই, তোমার উপস্থিতিতেও সবাই ধন্য হয়ে যাবে।’

কিছুক্ষণ চুপ করে কী যেন ভাবল দুখু।

নীরব দুখুর উদ্দেশে বাসুদেব আবার বললেন, ‘শুনেছি, কবিগান বা তোমার প্রিয় নিমশাহ লেটো দলের সঙ্গে আর থাকছ না তুমি, পড়াশোনায় ডুব দিয়েছ। ভালো, বেশ ভালো। তবুও যখন হাতের কাছে পেয়েই গেলাম, একটু যদি বসো, খুশি হব আমরা। তোমার দু-চারটা গান শুনে নিজেরা ধন্য হব।’

‘পড়াশোনায় ডুব দিয়েছ’ কথাটা বুকটা কাঁপিয়ে দিলো তার। বুক খালি করে বেরিয়ে গেল বিরাট এক শ্বাস। পড়াশোনার প্রতি নিজের টান, আগ্রহ, উৎসাহের ঘাটতি নেই। অথচ পেটের ক্ষুধা মেটানো যাচ্ছে না, পড়বে কীভাবে? এসব কথা বলতে পারল না বাসুদেবকে। বলল, ‘পাশাপাশি একটা চাকরিও খুঁজছি বাসুদা।’

পাশাপাশি শব্দের আগে ব্যবহার করতে চাইছিল, ‘পড়াশোনার’ শব্দটি। কিন্তু ‘পড়াশোনার পাশাপাশি’ না বলে ‘পড়াশোনা’কে বাদ দিয়ে কথা বলতে গিয়েও নিজের বুকে নিজেই যে একটা ধারালো কোপ বসিয়ে দিয়েছে, টের পেয়ে গেল দুখু। কষ্টের রেণু বেরোতে লাগল বুকের ভেতর থেকে।

বাসুদেব উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন, ‘সেকি!, চাকরি করলে পড়বে কীভাবে!’

‘জানি না, দাদা। চাকরি লাগবে, এটা জানি।’

বাসুদেব ধরে ফেললেন দুখুর কষ্টের কথা। কোনো সহানুভূতি না জানিয়ে বললেন, ‘বোসো আমাদের সঙ্গে, মনে হচ্ছে তোমার মন ভালো নেই, আমাদের সঙ্গে বসলে ভালো হয়ে যাবে তোমার মন।’ এ দাবি উপেক্ষা করতে পারল না দুখু। এগিয়ে গেল আম-কাঁঠালের বাগানের ভেতরে। প্রথমে দুটো কবিগান রচনা করে ফেলল। তারপর অংশ নিল দলের সঙ্গে।

গাড়ি নিয়ে রোজকার মতো ডিউটিতে বেরিয়েছেন আসানসোল স্টেশনের ব্রাঞ্চ লাইনের গার্ড সাহেব। কয়লাভরতি যে-বগিগুলো সাইডিং লাইনের উপর দাঁড়িয়ে আছে সেগুলো টেনে এনে জুড়তে হবে মূল গাড়ির সঙ্গে। তারপর গাড়ি ছাড়বে। অনেকক্ষণ চুপচাপ গাড়িতে বসে থাকতে হবে ভেবে গাড়িতে বসেই তাকালেন ডানে। বাগানের ভেতর গানের আসরটা তাঁর চোখে পড়ে গেল। গার্ড সাহেব তাঁর কামরা থেকে নেমে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলেন সেই দিকে। একটা অর্জুনগাছের সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে গান শুনতে লাগলেন তিনি। তাঁর গায়ের রংটা কালো। শীতের কাপড় জড়ানো থাকায় দূর থেকে টের পেল না কেউ তাঁর উপস্থিতি। নিজের গায়ের কালো রংটার জন্য তাঁর আফসোসের সীমা নেই। গার্ড সাহেবরা চারপুরুষ ধরে ক্রিশ্চান। কিন্তু তাঁদের বংশের কেউ এর আগে একটা ইংরেজ মেয়ে বিয়ে করে ঘরে আনেনি। খাস ইংরেজ না হোক, অন্ততপক্ষে ফরসা একটা অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান মেয়েও যদি আসত বংশে, তো তাদের গায়ের চামড়াটা এত কালো হতো না। যুবক বয়সে যদিও রেল কোম্পানির ইউরোপিয়ান কোয়ার্টারের আশপাশে ঘুরে বেড়াতেন, অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান বখাটে ছেলেমেয়েদের সঙ্গে আড্ডা মারতেন, তারপরও কালো রঙের আফসোস যায়নি মন থেকে। অনেক সমস্যা ভোগ করে তিনি বিয়ে করেছেন এক পরমাসুন্দরী বাঙালি ক্রিশ্চান মেয়ে হিরণপ্রভা ঘোষকে। প্রাসাদপুরের বাংলোতেই থাকেন বউ-সহ। তাই বাঙালি কালচারের অনেক বিষয়-আশয় সয়ে গেছে তাঁর। এ মুহূর্তে গান শুনতে শুনতে তরজাতা দুখুকে দেখলেন তিনি। পরিচিত হলেন। হিরণপ্রভাকে গান শোনানোর প্রস্তাব দিলেন পরিচয়পর্বের এক পর্যায়ে। রাজি হয়ে গেল দুখু। কাজ পেয়ে গেল সে গার্ড সাহেবের বাসায়।

চলবে...

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x