কিশোর উপন্যাস

দুরন্ত দুখু

দুখুর কাহিনি শুনে গলে গেল দারোগার মন। কিশোরটির ব্যাপারে কৌতূহল নিবৃত্ত হওয়ায় শামসুন্নেসা খানম বললেন, ‘একরত্তি বাচ্চার এত কষ্ট সয়! বাছা, তুমি বরং আমাদের সঙ্গেই থেকে যাও।’
দুরন্ত দুখু
অলংকরণ : সোহেল আশরাফ

॥ ষোলো ॥

সিঁড়ির তলে রাত্রিযাপন

ডিউটি শেষে রাতে বাসায় ঢোকার সময় সিঁড়ির দিকে চোখ গেল সাব-ইনস্পেকটর কাজী রফিজউল্লাহ্র।

অচেনা বালকটিকে ঘুমোতে দেখে এগিয়ে গেলেন। ডাকতে গিয়েও থেমে গেলেন। ঘুমন্ত ছেলেটির মুখের ওপর আছড়ে পড়ল তাঁর চোখ। ভেতরের ক্ষুব্ধতা মুহূর্তে উড়াল দিয়ে পালিয়ে গেল। পুলিশের চোখে স্পষ্টতই ধরা পড়ল নিরপরাধ নিরীহ বালকের মুখ। মায়ার সঞ্চার হলো তাঁর বোধের সমুদ্রে। সেই সমুদ্রের ছোটো ঢেউ সামাল দিয়ে বালকটিকে না জাগিয়ে তিনি উঠে গেলেন নিজের ঘরে।

ঘরে ঢোকার আগে দারোগা সাহেব নিশ্চিত হয়েছেন যে-ই হোক এ ছোকরা চোরছ্যাঁচড় নয়। বখাটে বা বেয়াড়াও নয়। ঘুমন্ত কিশোরকে পুলিশের চোখ দিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে জরিপ করে বুঝেছেন সে অবশ্যই দুস্থ, জামাকাপড়ে তার ছাপ রয়েছে। একরত্তি বাচ্চাটির ঘুমানোর ভঙ্গি হঠাৎ করেই হাহাকার তুলল সন্তানহীন দারোগার মনেও। ঘরে ঢোকার পরও ভুলতে পারলেন না দারিদ্র্যের ভারে ম্লান কিশোরটির মুখ।

বেশ কয়েক দিন সকালে ডিউটি থাকায় সন্ধ্যার আগেই ফিরে আসতে হয় দারোগা কাজী রফিজউল্লাহ্‌কে। সিঁড়ি বেয়ে নামা-ওঠার পথে প্রায় চোখ যেত সিঁড়ির গোড়ায়, যেখানে কিশোরটিকে শুয়ে থাকতে দেখেছেন তিনি। দেখতে দেখতে ভুলেই গিয়েছিলেন রফিজউল্লাহ্। একদিন বিশেষ কারণে রাত করে বাড়ি ফিরে আসেন। অভ্যাসবশত সিঁড়ি বেয়ে উঠে যাচ্ছিলেন উপরে। আচমকা তাঁর চোখ গেল সিঁড়ির তলে। কিশোরটিকে আজও দেখলেন। উঠতে গিয়ে উঠলেন না। নেমে এসে হাঁটু গেড়ে বসলেন তার পাশে। ধমক বা তাড়া না দিয়ে, না চেঁচিয়ে বাঁ হাতে তিনি দুখুর ঝাঁকড়া চুলের ভেতর আঙুল ঢুকিয়ে মুঠি করে ধরে বারকয়েক নরম করে টান দিলেন। চুলের ধুলোময়লা তাঁর হাতে লেগে গেলেও বিরক্ত হলেন না। বরং মিঠে স্বরে ডাকলেন, ‘এই ছেলে, ওঠো!’

ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত গভীর ঘুমে মগ্ন দুখুর ঘুম ভাঙল না। দেহটা মোচড়ও খেলো না। আরামে ঘুমাচ্ছে সে। এই আরামের ঘুম ভেঙে যাক চাইছিলেন না দারোগা সাহেব। উপায় নেই। তুলতেই হবে। রোজ রাত করে এসে এখানে ঘুমায় সে। পুলিশের কর্তা তিনি। তার পরিচয় না জেনে তাকে ছাড় দিতে পারেন না। কী করবেন বুঝতে পারছেন না, সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। হাঁটু গেড়ে বসে কী যেন এক ভাবনা এলো মাথায়। চুপ করে বসে রইলেন তিনি।

রেল ছুটছে। দুখুও ছুটছে রেলের পেছন পেছন। কোথায় যায় ট্রেন দেখার বড়োই শখ দুখুর। বুকের মধ্যে জড়িয়ে রেখেছিল স্কুলের বইপত্র। ‘মাথরুন স্কুলের’ গন্ধ লেগে আছে বইয়ের মধ্যে। জড়িয়ে ধরা বইয়ের গন্ধ শুঁকল সে একবার। ছুটতে গিয়ে উড়ে গেল একটি বই। কী আশ্চর্য, উলটোদিকে উড়ে যাচ্ছে বই। ট্রেন ছুটছে সামনে, বই উড়ে যাচ্ছে পেছনে। কোন দিকে যাবে সে! দিশেহারা হয়ে থমকে দাঁড়াল। তারপর ছুটতে লাগল বইয়ের দিকেই। ট্রেন যাচ্ছে যাক। কিছুতেই সে হারাতে চায় না বুকের ধনবই। প্রবল বেগে দৌড়াচ্ছে দুখু। আশ্চর্য, তবুও উড়তে থাকা বই ধরতে পারছে না। বইয়ের গতির কাছে হেরে যাচ্ছে পায়ের গতি। হাঁপাতে হাঁপাতে থেমে গেল সে। উড়ে যাওয়া বইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে, উড়ন্ত বই দেখতে দেখতে একসময় ধপাস করে পড়ে গেল নিচে। ব্যথা পেল না। ব্যথা না পেলেও হাহাকার জেগে উঠল। কী আশ্চর্য! এ অচেনা জায়গায় কে ধরল তার হাত? কে ছুঁয়ে দিলো তার মাথা? কে তাকে টেনে তুলতে চেষ্টা করছে? প্রশ্নের দাপটে সিঁড়ির নিচে ঘুমন্ত দুখুর ঘুম ভেঙে গেল। ভেঙে গেল স্বপ্ন। খোলা চোখে বিস্ময় নিয়ে সে দেখল পুলিশ অফিসার তার মাথায় হাত দিয়ে চুল টেনে দিচ্ছেন। ধড়ফড় করে এবার জেগে উঠল দুখু। কাপড়চোপড় গুছিয়ে সম্ভ্রমের সঙ্গে দাঁড়িয়ে রইল দারোগার সামনে।

বিস্ময়সূচক প্রশ্ন নিয়ে দারোগা সাহেবও তাকিয়ে রইলেন তার দিকে। হতবিহ্বল অবস্থা কাটিয়ে দুখু বলল, ‘মাফ করে দেন, হুজুর। আমার ঘুমানোর জায়গা নেই। টানা প্রায় ষোলো ঘণ্টা ওই পাশের চা-রুটির দোকানে কাজ করি। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত। রাতে দোকান বন্ধ হলে এখানে এসে ঘুমাই, ভোরেই উঠে চলে যাই। এই বড়ো পৃথিবীতে ছোট্ট এ জায়গায় নিরাপদে ঘুমাতে পারি। কারো কোনো ক্ষতি করিনি। কাউকে বিরক্তও করিনি, হুজুর।’

কোনো অসহায় বালকের জবানবন্দি নয়, দারোগা রফিজউল্লাহ্ যেন শুনলেন কালবোশেখির মতো উড়ে আসা কোনো বিধ্বস্ত পাখির কণ্ঠস্বর। এ স্বর ক্ষণকালের জন্যও কোনো ঝড় তুলল না। এ ঝড়ে কেবলই উড়ে গেল না তাঁর অন্তরের ধূলি-জঞ্জাল, চিরকালের জন্য যেন তার বোধের জগতে জ্বলে উঠল নতুন সূর্য। নতুন আলোয় বুক ভরে গেল দারোগার।

কোনো প্রশ্ন করলেন না। কৈফিয়ত চাইলেন না। নরম স্বরে বললেন, ‘ঘরে এসো আমার সঙ্গে।’

দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে সাহেবের সঙ্গে দুখুকে দেখে চমকে উঠলেন শামসুন্নেসা খানম। বুকের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা বিপুল নিশ্বাসে ঊর্ধ্ববেগে উড়ে এলো চিরন্তন নারীর মাতৃসত্তা। মায়ার খোলস ঝেড়ে, যেন কতকালের পরিচিত, তেমন ভঙ্গিতে প্রশ্ন করলেন, ‘কেমন আছ, কাজী নজরুল ইসলাম, দুখু?’

স্ত্রীর মুখে ছেলেটির নাম শুনে বুকের পুরো গগনে আবারও উঠল কালবোশেখি। ঝড় মিলিয়ে গেল না, প্রকৃতির দোর্দণ্ড প্রতাপের চিহ্ন রেখে, স্থায়ী বিদ্যুতের আলোর মতো আলো ফেলল দারোগার মুখে।

‘চেনো, ওকে? তোমার অনুমতি নিয়েই তাহলে ও ঘুমায় রোজ সিঁড়িঘরে?’

‘সিঁড়িঘরে ঘুমায় ও? রোজ? না, আমি জানি না তো!’

‘ওর নাম জানো কীভাবে? চিনলে কীভাবে?’

‘একদিন চা-রুটির দোকান থেকে ঘরের খাবার সাপ্লাই দিতে এসেছিল। হোটেলের বয় সে। এটুকু জানি। আর নামটাও জেনেছিলাম তখন,’ বললেন শামসুন্নেসা খানম।

মিলে গেছে তথ্য। মিথ্যে বলেনি দুখু। বুঝে ফেললেন ঝানু দারোগা। বললেন, ‘আমার একটা পুরোনো কাপড় দাও। বাথরুমটা দেখিয়ে দাও। এখন থেকে ও থাকবে আমাদের ওই খালি রুমটায়, কী বলো, দুখু মিয়া?’

দুখু মাথা চুলকাতে লাগল।

দুখুকে নিয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে দারোগা জিজ্ঞেস করলেন, ‘চা-রুটির দোকানে কত মাইনে পাও?’

মাসে এক টাকা দেবেন বলেছেন মালিক। তিন বেলা খাওয়া। মাত্র কয়েকদিন চাকরি করেছি। এখনো মাইনে পাইনি।’

‘এত কমে পোষাবে তোমার?’

‘তিনবেলা খাবার ব্যবস্থা হয়েছে, কম কীসে, হুজুর?’

‘তিনবেলা খাবার জোটানোই কি সব, আর কিছু নেই জীবনে?’

‘আছে,’ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কিছুক্ষণ থেমে দুখু আবার বলল। ‘পড়াশোনার ইচ্ছেটা প্রবল, পেটে ভাতই জোটে না, ঘরে চলছে না-খেতে পাওয়ার জীবন, তার তুলনায়...।’

‘কোথায় তোমার বাড়ি? কে আছে সংসারে?’

গরগর করে সব বলে গেল দুখু। দুখুর কাহিনি শুনে গলে গেল দারোগার মন। কিশোরটির ব্যাপারে কৌতূহল নিবৃত্ত হওয়ায় শামসুন্নেসা খানম বললেন, ‘একরত্তি বাচ্চার এত কষ্ট সয়! বাছা, তুমি বরং আমাদের সঙ্গেই থেকে যাও।’

দারোগাও সায় দিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ। থেকে যাও।’

‘কাজ কী, হুজুর?’

‘কাজ আর কী, ঘরের ফাইফরমাশ খাটা, গৃহকর্ত্রী একা থাকেন, তাঁকে সঙ্গ দেওয়া। আর আমাকে তামাক সাজিয়ে দেওয়া।’

দুখুর মনে উদয় হলোচাকরের কাজ! তা-ই সই। চাকর হতেও আপত্তি নেই। বেঁচে থাকাই যেখানে সমস্যা, সেখানে অহংকার কেন ধুলোয় মিশিয়ে দেবে না? অহংকার ধুয়েমুছে কঠিন জীবনকে কেন মোকাবিলা করবে না? গৃহভৃত্য হলে দোষ কী? গার্ড সাহেবের কি গৃহভৃত্য হইনি? নিজেকে প্রশ্ন করল মনে মনে, উত্তরও পেয়ে গেল। ভাবনা থামিয়ে মুখ ফুটে বলল, ‘আচ্ছা। আপনাদের সঙ্গেই থাকব আজ থেকে, বাবুর্চি, খানসামা বা হোটেল বয় হিসেবে কাজ ছেড়ে দেবো।’

দারোগা এবার বললেন, ‘থাকা, খাওয়াদাওয়া ফ্রি। আর মাস গেলে মাইনে পাবে পাঁচ টাকা।’

শুনে নিজেকে বাহবা দিলো দুখু, নাঃ, ভাগ্য ভালোই। রুটির দোকানে হাড়ভাঙা খাটুনির চেয়ে হাজারগুণ ভালো কাজ পেয়ে ভালো লাগল মসজিদের মুয়াজ্জিন, মক্তবের মাস্টার, মাজারের খাদেম আর লেটো দলের কবিয়াল খুদে ওস্তাদ দুখুর।

চলবে...

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x