করোনাতেও থেমে নেই দেশের উন্নয়ন

করোনাতেও থেমে নেই দেশের উন্নয়ন
স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল। ছবি : সংগৃহীত

মহামারি করোনা ভাইরাসের প্রকোপে ২০২০ সালের পুরোটাই ছিল বিধ্বংসী এক বছর। এখনও করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলা করছে বিশ্ব। সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশকেও বিপর্যস্ত করেছে এই ভাইরাস। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নেতিবাচক প্রভাব পরলেও বাংলাদেশের উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে চলছে।

দৃশ্যমান হলো স্বপ্নের পদ্মা সেতু

নানা বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে পূর্ণ অবয়ব পেয়েছে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের স্বপ্নের সেতুর মূল কাঠামো। যুক্ত হয়েছে পদ্মার দুই তীর। ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার এই সেতুই রাজধানীর সঙ্গে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলাকে সরাসরি সড়কপথে যুক্ত করবে। নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে ৩ বছর দুই মাস দশ দিনে শেষ হয়েছে সেতুর ৪১টি স্প্যান বসানোর কাজ। এ বছরের ১১ ডিসেম্বর বেলা ১২টা ২ মিনিটে পদ্মা সেতুর টু-এফ নম্বর স্প্যানটি বসানো হয় মাওয়া প্রান্তের ১২ ও ১৩ নম্বর খুঁটির ওপর। এই স্প্যানটি বসানোর মধ্য দিয়েই সেতুর মূল কাঠামোর পুরোটা দৃশ্যমান হয়েছে। ৪১তম স্প্যান স্থাপনের পর মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম আশা প্রকাশ করেন, দক্ষিণ জনপদের মানুষের স্বপ্নের পদ্মাসেতু ২০২২ সালের জুন মাসের মধ্যে যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া সম্ভব হবে।

২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পদ্মা সেতুর জাজিরা প্রান্তের ৩৭ ও ৩৮ নম্বর খুঁটির উপরে বসানো হয়েছিল প্রথম স্প্যান। দ্বিতল এই সেতুতে স্প্যানের ওপর কংক্রিটের স্ল্যাব বসানোর কাজ শেষ হলেই পিচ ঢালাই হবে। ২২ মিটার প্রশস্ত এই সেতুতে চারটি লেইনে যানবাহন চলতে পারবে।৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সেতু চালু হলে রাজধানীর সঙ্গে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপন হবে।

মাতারবাড়ি জেটিতে ভিড়েছে প্রথম জাহাজ

মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দরের সক্ষমতা যাচাইয়ে প্রথম বারের মতো কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ি জেটিতে ভিড়েছে মালবাহী জাহাজ মাদার ভেসেল।মঙ্গলবার (২৯ ডিসেম্বর) বেলা সাড়ে ১০ টায় জাহাজটি মাতারবাড়ি জেটিতে নোঙর করে।

দৃশ্যমান হচ্ছে মেট্রোরেল

মেট্রোরেলের জন্য নির্মিত উড়ালপথে রেললাইন বসানো শুরু হচ্ছে। আগামী জুনে ইঞ্জিন-কোচ চলে আসার কথা। সেগুলো ঠিকঠাকমতো বসানোর পর শুরু হবে পরীক্ষামূলক চলাচল। সবকিছু পরিকল্পনা মতো এগোলে ২০২১ সালের শেষে, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে রাজধানীবাসী বহুল প্রতীক্ষিত মেট্রোরেলে চড়তে পারবেন বলে আশা করা যাচ্ছে। ঢাকার যানজট নিরসনে সরকার ছয়টি মেট্রোরেল নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে।

করোনা মোকাবেলায় এশিয়ার শীর্ষে বাংলাদেশ

বিশ্বজুড়ে মহামারি আকার ধারণ করা করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদ মাধ্যম ব্লুমবার্গ প্রকাশিত ‘কোভিড রেজিলিয়েন্স র্যাং কিং’-এ তথ্য উঠে এসেছে। এছাড়া বিশ্বের মধ্যে ২০তম অবস্থানে রয়েছে দেশটি।ভারত-পাকিস্তানের ঠাঁই হয়েছে র‌্যাং কিংয়ের নিচের সারিতে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইতালি, সৌদি আরবের মতো দেশগুলোর চেয়েও এগিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ।

ইতিবাচক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি

করোনা ভাইরাসের কারণে সব খাতে নেতিবাচক প্রভাব পরলেও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল ইতিবাচক। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বিগত ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ২৪ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। স্থির মূল্যে এই জিডিপির আকার দাঁড়িয়েছে ২৭ লাখ ৯৬ হাজার ৩৭৮ কোটি টাকা। আর মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পেয়ে ২ হাজার ৬৪ ডলারে উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রাথমিক এই তথ্য প্রকাশ করেছে।

স্বস্তি রিজার্ভ ও রেমিট্যান্স

করোনা ভাইরাস মহামারির মধ্যেও প্রবাসী বাংলাদেশিরা রেমিট্যান্স পাঠানো অব্যাহত রেখেছেন। গত নভেম্বরে তারা ২০৭ কোটি ৮৭ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। সব মিলিয়ে ১ জানুয়ারি থেকে ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে দেশে এসেছে ২ হাজার ৫০ কোটি ডলার (১ লাখ ৭৪ হাজার ২৫০ কোটি টাকা), যা ২০১৯ সালের পুরো সময়ের চেয়ে প্রায় ১২ শতাংশ বেশি। এর আগে এক বছরে বাংলাদেশে এতো রেমিট্যান্স আর কখনো আসেনি। ২০১৯ সালে ১ হাজার ৮৩৩ কোটি ডলার দেশে পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা। রেমিট্যান্সের প্রবাহ চাঙ্গা থাকায় ইতিবাচক অবস্থায় রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে রিজার্ভ ৪১ বিলিয়ন বা ৪ হাজার ১০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে (৩ লাখ ৪৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা)। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি অর্থনীতি শক্তিশালী হওয়াকে নির্দেশ করে।

ই-কমার্সে লেনদেন এখন ২০ হাজার কোটি টাকা

করোনার মধ্যে ই-কমার্স ব্যবসায় বিস্ফোরণ ঘটেছে। বর্তমানে ই-কমার্সের বাজার ২০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা গত বছরের ডিসেম্বরেও ছিল ১৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা। প্রতিযোগিতা কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬ সালের পর থেকে দেশে ই-কর্মাস ব্যবসার প্রবৃদ্ধি হতে শুরু করেছে। ২০১৭ সালে ই-কর্মাস বাজারের আকার ছিল ৮ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। ২০১৮ সালের শেষে গিয়ে দাঁড়ায় ১০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। গত আগস্ট মাসের শেষে দেশে ই-কর্মাস বাণিজ্যের বাজার ছিল ১৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত ফেব্রুয়ারি মাসের তুলনায় করোনা ভাইরাস-পরবর্তী সময়ে দেশে আন্তঃব্যাংক ইন্টারনেট ব্যাংকিং সেবার প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২১৪ শতাংশ। আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিস্টেম নেটওয়ার্ক মাস্টার কার্ডের হিসাবে করোনা ভাইরাসের আগে বাংলাদেশে ই-কমার্সে ডিজিটাল পেমেন্টের পরিমাণ ১৫ শতাংশের মতো ছিল। এখন এই লেনদেনের পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে।

ইন্টারনেট গ্রাহক বেড়েছে ১ কোটিরও বেশি

দেশে চলতি বছরের শুরুতে ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথের ব্যবহার ছিল সর্বোচ্চ ৯০০ জিবিপিএস। বছর শেষে সেই ব্যান্ডউইথের ব্যবহার দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২০০ জিবিপিএসে। অর্থাৎ প্রায় আড়াই গুণ। অন্যদিকে, গত ফেব্রুয়ারিতে ইন্টারনেটের গ্রাহক ছিল ৯ কোটি ৯৯ লাখ ৮৪ হাজার। ৩০ নভেম্বর সেই ইন্টারনেট গ্রাহক দাঁড়িয়েছে ১১ কোটি ৫ লাখ ৬১ হাজারে। এর মধ্যে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট গ্রাহক ফেব্রুয়ারিতে ৫৭ লাখ ৪৩ হাজার থেকে বেড়ে নভেম্বর শেষে দাঁড়িয়েছে ৮৬ লাখ ৬৭ হাজারে।

মানব উন্নয়ন সূচকে ২ ধাপ এগোল বাংলাদেশ

মানব উন্নয়ন সূচকে গত বছরের তুলনায় দুই ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ। সূচকে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান ১৩৩। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) ২০২০ সালের দ্য হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার ৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের পঞ্চম অবস্থানে আছে। তবে পরিবেশের প্রভাবজনিত সমন্বিত মানব উন্নয়ন সূচক অনুযায়ী আরও ৯ ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ।ইউএনডিপির বাংলাদেশে প্রকাশিত ‘মানব উন্নয়ন সমীক্ষা-২০২০’ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে।

ইত্তেফাক/কেকে

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x