বেটা ভার্সন
আজকের পত্রিকাই-পেপার ঢাকা মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২০, ৩০ আষাঢ় ১৪২৭
২৮ °সে

বঙ্গবন্ধুর অর্থনৈতিক মুক্তির চিন্তা

বঙ্গবন্ধুর অর্থনৈতিক মুক্তির চিন্তা
বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভা। ছবি : সংগৃহীত

পৃথিবীর সব রাষ্ট্রনায়ক, জননেতাই স্বদেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির কথা ভাবেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অর্থনৈতিক মুক্তিচিন্তা ছিল কিছুটা হলেও ভিন্নরকম। বঙ্গবন্ধু বাংলার মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি চেয়েছিলেন প্রাণের তাগিদে। তিনি রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠার বহু আগে থেকেই এ দেশের শোষিত মানুষের কথা ভাবতেন। এই বাংলার মানুষের ক্ষুধা-দারিদ্র্য-অভাব-শোষণ-বঞ্চনা, দুমুঠো ভাতের জন্য কান্না, অসহায় মানুষের আর্তনাদই তাকে রাজনীতি করতে উত্সাহিত হয়েছেন। ১৯৭২ সালের ৯ মে রাজশাহী মাদ্রাসায় বক্তৃতা দিতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি জীবনে প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রী হবার জন্যে রাজনীতি করিনি। একদিকে ছিল আমার প্রধানমন্ত্রীর সিংহাসন আর একদিকে ছিল আমার ফাঁসির ঘর। আমি বাংলার জনগণকে মাথা নত করতে দিতে পারি না বলেই ফাঁসিকাষ্ঠ বেছে নিয়েছিলাম। (প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-৩০৩)।

এই যে জনগণের জন্য গভীর ভালোবাসা, তাদের সুখ-দুঃখের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাওয়া এটাই তাকে মহান নেতায় পরিণত করেছিল। তিনি যে একদিন অনেক বড়ো কিছু হবেন তার কিছু নজির খুঁজে পাওয়া যায় তার ছোটোবেলাতেই। স্কুলে পড়ার সময়ই তিনি পরনের বাড়তি কাপড় খুলে গরিব ছাত্রদের দিয়ে দিতেন। তার জন্য পিতা শেখ লুত্ফর রহমানকে ঘন ঘন ছাতা কিনতে হতো। কারণ তিনি গরিব মানুষকে নিজের ছাতা বিলিয়ে দিতেন। আবদুল হাসিদ মাস্টারের সঙ্গে ‘মুসলিম সেবা’ সমিতি গঠন তার আরেকটি মানবিক হূদয়ের তাগিদের পরিচয়। তিনি যে দরিদ্র মানুষের বিপন্নতায় বিচলিত হতেন তার প্রমাণ মেলে ছোটোবেলার আরেকটি ঘটনায়। ‘একবার তার গ্রামের চাষিদের ফসল নষ্ট হয়ে যায়। ফলে কৃষকদের জীবনে নেমে আসে অভাব-অনটন। অনেক বাড়িতেই দুবেলা ভাত রান্না বন্ধ হয়ে যায়। চাষিদের চোখে-মুখে দুশ্চিন্তা। তাদের সন্তানেরা অভুক্ত। সারা গ্রামেই প্রায়-দুর্ভিক্ষাবস্থা নিয়ে চাপা গুঞ্জন। কিশোর মুজিব এরকম পরিস্থিতিতে দুঃখ-ভারাক্রান্ত। কিন্তু কী করবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না। একটা কিছু করার জন্য তিনি ছটফট করছিলেন। সেসময় যে পথটি তার সামনে খোলা ছিল, তিনি তাই করলেন। নিজের পিতাকে তিনি তাদের গোলা থেকে বিপন্ন কৃষকদের মধ্যে ধান বিতরণের জন্য অনুরোধ জানালেন। তাদের নিজেদের ধানের মজুত কেমন, এই অনুরোধ তার বাবা রাখতে পারবেন কি না, সেসব তিনি ভাবেননি। কৃষকদের বাঁচিয়ে রাখার চিন্তাটিই ছিল তখন তার কাছে মুখ্য।’ (Obaydul Haq, Bangabandhu Sheikh Mujib: A Leader with a Difference, Radical Asia Publication, 1996 2nd edition, p. 13)

সাধারণের জন্য এই কল্যাণচিন্তা তার গোটা রাজনৈতিক জীবনকে প্রভাবিত করেছে। সুযোগ পেলেই তিনি ছুটে গেছেন কৃষকের কাছে, শ্রমিকের কাছে। তাদের জন্য কিছু একটা করার তাগিদ দিতেন সবাইকে। সময় পেলেই কথা বলতেন ব্যক্তিগত কর্মচারী এবং নিরাপত্তা কর্মীদের সঙ্গে। তারা যে বেতন পায়, তাই দিয়ে তাদের সংসার চলে কি না, এরকম প্রশ্ন তিনি তাদের প্রতিনিয়তই করতেন এবং সাধ্যমতো সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতেন।

কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে পড়ার সময় থেকে তিনি যে সরাসরি রাজনীতিতে সম্পৃৃক্ত হলেন তার একমাত্র কারণ তিনি এ দেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি চেয়েছিলেন। এমন কি পাকিস্তান আন্দোলনে যুক্ত হবার পেছনেও পূর্ব-বাংলার কৃষকদের জমিদারি ব্যবস্থার শোষণ প্রক্রিয়া থেকে মুক্তি দেওয়ার বিষয়টিই বড়ো ভূমিকা রেখেছিল। উঠতি মধ্যবিত্তের শিক্ষিত সন্তানদের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যটিও এর পেছনে কাজ করেছে। ছোটোবেলা থেকেই তিনি এ দেশের মানুষের জীবনসংগ্রাম দেখে এসেছেন। তরুণ রাজনীতিবিদ হিসেবে তাই তাকে দেখা যায় ‘দাওয়াল’ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে। সম্প্রতি প্রকাশিত গোয়েন্দা প্রতিবেদনগুলো থেকে জানা যায়, এ দেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি চিন্তায় তিনি কতটা তত্পর ছিলেন সেই দেশভাগের পর থেকেই। তিনি ভেবেছিলেন মুসলমানদের জন্য আলাদা একটা দেশ হলে শান্তি আসবে। তাই যোগ দিয়েছিলেন মুসলিম লীগে। কিন্তু, দেখলেন স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্রে মুসলিম লীগ ব্যর্থ হচ্ছে পূর্ব বাংলার মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে। ১৫০০ মাইল ব্যবধানে গঠিত পূর্ব বাংলা নিয়ে কোনো ভাবনাই নেই পশ্চিম পাকিস্তানি এলিটদের। তাই তিনি শুরু থেকেই সমালোচনায় মুখোর হলেন কেন্দ্রীয় শাসন-ব্যবস্থার।

বারবার তিনি হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন, পূর্ব বাংলায় খাদ্য নেই, বস্ত্র নেই। দুর্ভিক্ষ শুরু হয়েছে। মানুষ না খেয়ে মরছে। আমাদের শিশুদের শিক্ষার ব্যবস্থা নেই, অন্য দিকে বিপুল ব্যয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে ধনীদের শিশুদের জন্য স্কুল নির্মাণ হচ্ছে, নির্মাণ হচ্ছে সরকারি বড়ো কর্মকর্তাদের জন্য বিলাসবহুল আবাসভবন। অথচ পূর্ব-বাংলার পাটই বৈদেশিক মুদ্রার বড়ো উত্স। কৃষকের ট্যাক্সের টাকায় গভর্নরদের মাত্রাতিরিক্ত বেতন নেওয়ারও সমালোচনা করেন তিনি। ১৪ আগস্ট ১৯৪৮ ছিল পাকিস্তানের প্রথম ‘আজাদী দিবস’। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষ্যে বিশিষ্ট লীগ কর্মী শেখ মুজিবুর রহমান ইত্তেহাদ পত্রিকায় যে বিবৃতি দেন তাও গোয়েন্দা বিভাগ সংরক্ষণ করে। এক বছরের আজাদীকে তরুণ শেখ মুজিব কী চোখে দেখছেন জানা যাক : ‘১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট আমরা যে ‘আজাদী লাভ করিয়াছি, সেটা যে গণ আজাদী নয়, তা গত একটি বছরে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হইয়াছে। ‘জাতীয় মন্ত্রিসভা’ দীর্ঘ একটি বছরে জনগণের ২০০ বছরের পুঞ্জীভূত দুঃখ-দুর্দশা মোচনের কোনো চেষ্টা ত করেন নাই, বরঞ্চ সেই বোঝার ওপর অসংখ্য শাকের আঁটি চাপাইয়াছেন। ভুখা, বিবস্ত্র, জরাগ্রস্ত ও শত অভাবের ভারে ন্যুব্জ জনসাধারণের ভাত, কাপড়, ওষুধপত্র ও অন্যান্য নিত্য-ব্যবহার্য দ্রব্যের কোনো ব্যবস্থা তারা করেন নাই; বরঞ্চ পাট, তামাক সুপারি ইত্যাদির ওপর নয়া ট্যাক্স বসাইয়া ও বিক্রয়-কর বৃদ্ধি করিয়া জনগণের দৈনন্দিন জীবন দুর্বিষহ করিয়া তুলিয়াছেন। বিনা খেসারতে জমিদারি বিলোপের ওয়াদা খেলাফ করিয়া তারা জমিদার ও মধ্যস্বত্বভোগীদিগকে ৫০-৬০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা করিতেছেন। নতুন জরিপের নাম করিয়া তারা জমিদারি প্রথার সম্পূর্ণ বিলোপ আট বছর স্থগিত রাখার ষড়যন্ত্র করিতেছেন। শুধু তাই নয়, রাষ্ট্রের নিরাপত্তার অছিলায় তারা অনেক দেশভক্ত লীগ-কর্মীকেও বিনা বিচারে কয়েদ খানায় আটকাইয়া রাখিতেছেন। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে মুসলিম ছাত্র সমাজের ওপর এবং আরো কতিপয় ক্ষেত্রে জনতার ওপর লাঠী চার্জ, কাঁদুনে গ্যাস ব্যবহার ও গুলী চালনা করিয়া তারা আজাদীকে কলঙ্কিত করিয়াছেন।’ (SECRET DOCUPMENTS OF INTELLINGENCE BRANCE ON FATHER OF THE NATION BANGABANDHU SHEIKH MUJIBUR RAHMAN Edited by Sheikh Hasina, Hakkani Publishers, Dhaka, 2018, VOl-1, page-44.)।

তিনি সেই ১৯৪৮-৪৮ সালেই বুঝতে পেরেছিলেন পাকিস্তানের অধীনে মুসলিম লীগের শাসনে এ দেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি অসম্ভব। ধীরে ধীরে তার কণ্ঠস্বর উঁচু হতে থাকে। প্রতিবাদ তীব্র হতে থাকে। অর্থনৈতিক মুক্তির পাশাপাশি তিনি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি, নিজস্ব সংস্কৃতি-ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন রাখার দাবি তুলেন। কারণ, তিনি ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন ভাষা-সংস্কৃতি-অর্থনীতি একে অপরের পরিপূরক। একটি ছাড়া আরেকটির উন্নতি সম্ভব নয়। মানুষের অস্তিত্বই যদি হারিয়ে যায় স্বদেশের উন্নতির কথা সে ভাববে কী করে! তাই তিনি সবকিছু এক করে কঠোর আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়লেন এ দেশের মানুষের মুক্তির জন্য।

একটি শিল্পোন্নত দেশ গড়ার জন্য বঙ্গবন্ধু তৈরি করলেন পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা (১৯৭৩-৭৮) । ছিয়াশি পৃষ্ঠাব্যাপী মস্ত এক শিল্পোন্নয়ন পরিকল্পনার ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি পরিকল্পানুযায়ী। বঙ্গবন্ধুর অর্থনৈতিক মুক্তি চিন্তা বুঝতে হলে অবশ্যই তত্কালীন বিশ্ব পরিস্থিতি বুঝতে হবে। পৃথিবী তখন দুটি ব্লকে বিভক্ত। একদিকে সমাজতান্ত্রিক রাশিয়া, চীন। অন্য দিকে পুঁজিবাদী শক্তি আমেরিকা। বঙ্গবন্ধু কোনো ব্লকেই যোগ দেননি। তিনি এ ভূখণ্ডের মানুষ, তাদের সংস্কৃতি, মাটির গঠন, প্রাকৃতিক পরিবেশ, ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী স্বতন্ত্র একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। এটা শুধু একজন রাজনীতিবিদের কাজ নয়, একজন দার্শনিকের কাজ। কিন্তু, নানাকারণেই সেগুলো কিছু বাধার সম্মুখীন হয়। একদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ। ব্যাংকে টাকা নেই, কোষাগার শূন্য, সমস্ত অবকাঠামো বিপর্যস্ত, রাস্তা-ঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট ভাঙা, ২ কোটি মানুষ তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে গেছে, ১ কোটি ৪০ লাখ কৃষক পরিবার তাদের লাঙল- জোয়াল, গবাদিপশু রেখে গেছে, বাড়িঘর সব লুটপাট হয়ে গেছে, এমন কি, ফিরে যাবার আগে-পরে পাকিস্তানি সেনারা এ দেশের গুদামগুলো পর্যন্ত লুট করে গেছে, না পারলে পুরিয়ে দিয়ে গেছে। যেন পারমাণবিক বোমার আঘাতে এক পরিত্যক্ত বিভীষিকাময় ভূখণ্ড। এ দেশ ধ্বংসস্তূপকে তিনি দাঁড় করাবেন কী করে? তাও প্রবল বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। বিদেশ থেকে খাদ্য-আমদানি করলেন, রাস্তাঘাট ঠিক করতে লাগলেন, শিল্প-প্রতিষ্ঠানগুলোকে জাতীয়করণ করতে লাগলেন। এর পাশাপাশি এদেশেরই একদল ভিন্ন মতাবল্বী তাকে অসহযোগিতা করতে শুরু করলেন। কাজ করতে গেলে কিছু ভুল হয়ই। তিনি বলেছেনও, ‘আমি ভুল নিশ্চয়ই করব , আমি ফেরেস্তা নই, শয়তানও নই। আমি মানুষ, আমি ভুল করবই। আমি ভুল করলে আমার মনে থাকতে হবে, আই ক্যান রেকটিফাই মাইসেলফ’। (বাঙালির কণ্ঠ- ৪২৫)।

একটু খোঁজ নিলেই জানা যাবে একটি দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আরো কত রক্তক্ষরণ হয়েছে। আরো কত আত্মত্যাগ করতে হয়েছে। বিপ্লবের পর ভিন্নমতের মানুষকে বশে আনতে নির্বিচারে হত্যা করেছেন অনেক রাষ্ট্রনায়ক। কিন্তু, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর কতজন মানুষ এমন হত্যার শিকার হয়েছেন তার একটা পরিসংখ্যান বের করলেই বোঝা যাবে এত বাধা-প্রতিবন্ধকতার পরও বঙ্গবন্ধু কতখানি সহনশীল ছিলেন। তিনি শুধু সামান্য সময় চেয়েছিলেন শুরুর দিকে অর্থনীতিকে পুনর্গঠনের জন্য। কিন্তু সে সময় দিতে রাজি ছিল না অসহিষ্ণু একদল বিপদগামী তরুণ। তাই আত্মত্যাগ তাকেই করতে হয়েছে। পুরো পরিবার নিয়ে জীবন বিসর্জন দিতে হয়েছে। জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে তিনি যে দ্বিতীয় বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন তার মধ্যেই নিহিত আছে তার সারাজীবনের অর্থনৈতিক মুক্তিচিন্তার সারমর্ম। ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের চতুর্থ বর্ষ উদ্যাপন উপলক্ষ্যে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধু দ্বিতীয় বিপ্লবের ঘোষণা দেন।

কৃষক-শ্রমিক-ছাত্র-জনতার প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘সমাজ ব্যবস্থায় যেন ঘুণ ধরে গেছে। এই সমাজের প্রতি চরম আঘাত করতে চাই—যে আঘাত করেছিলাম পাকিস্তানিদের। সে আঘাত করতে চাই এই ঘুণে ধরা সমাজ ব্যবস্থাকে। আমি আপনাদের সমর্থন চাই। আমি জানি আপনাদের সমর্থন আছে কিন্তু একটা কথা, এই যে নতুন সিস্টেমে যেতে চাচ্ছি আমি, গ্রামে গ্রামে বহুমুখী কো-অপারেটিভ করা হবে। ভুল করবেন না। আমি আপনাদের জমি নেব না। ভয় পাবেন না যে, জমি নিয়ে যাব। তা নয়। পাঁচ বছরের প্ল্যান—এই বাংলাদেশের ৬৫ হাজার গ্রামে কো-অপারেটিভ হবে। প্রত্যেকটি গ্রামে গ্রামে এই কো-অপারেটিভ-এ জমির মালিকের জমি থাকবে। কিন্তু তার অংশ—যে বেকার, প্রত্যেকটি মানুষ, যে মানুষ কাজ করতে পারে, তাকে কো-অপারেটিভ-এর সদস্য হতে হবে। এগুলো বহুমুখী কো-অপারেটিভ হবে। পয়সা যাবে তাদের কাছে, ওয়ার্কাস প্রোগ্রাম যাবে তাদের কাছে। আস্তে আস্তে ইউনিয়ন কাউন্সিল টাউটদেরকে বিদায় দেওয়া হবে, তা না হলে দেশকে বাঁচানো যাবে না। এই জন্যই ভিলেজ কো-অপারেটিভ হবে। আমি ঘোষণা করছি আজকে যে, পাঁচ বছরের প্ল্যানে প্রত্যেকটি গ্রামে ৫০০ থেকে হাজার ফ্যামিলি পর্যন্ত নিয়ে কম্পলসারি কো-অপারেটিভ হবে।’ (জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নির্বাচিত ভাষণ, ড. এইচ খান (সম্পাদনা), (একাত্তর প্রকাশনী, ঢাকা ২০১১), চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৮৭)।

তথ্য-উপাত্তসহ বঙ্গবন্ধুর অর্থনৈতিক মুক্তি চিন্তার সামগ্রিক দিক তুলে ধরতে গেলে আস্ত একটি গ্রন্থই রচনা করতে হবে। তেমন গ্রন্থ অনেক হয়েছে। রচিত হবে আরো। আমি শুধু এই সংক্ষিপ্ত লেখায় বাংলার মানুষের মুক্তির জন্য তার অন্তরাত্মার প্রতিচ্ছবিটিই ফুটিয়ে তুলতেই চেয়েছি। আমি শুধু বলতে চাই, এ মানুষটিকে পরিপূর্ণভাবে বুঝতে হলে তার সমগ্র জীবনটিই বুঝতে হবে।

লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক এবং সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত