‘মুজিব চিরন্তন’-এর যাত্রা

‘মুজিব চিরন্তন’-এর যাত্রা
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ফাইল ছবি

বাঙালি জাতির মুক্তি ও স্বাধীনতার অবিসংবাদিত নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জন্মগ্রহণ করেন ১৭ই মার্চ ১৯২০ সালে। সে অনুযায়ী ২০২০ সাল সামনে রেখে উৎসবমুখর পরিবেশে দেশে-বিদেশে তার জন্মশতবার্ষিকী আয়োজনের ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। প্রাথমিকভাবে ১৭ই মার্চ ২০২০ থেকে ২৬শে মার্চ ২০২১ পর্যন্ত সময়কে মুজিববর্ষ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু এই উদ্যাপনের প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরু হয়েছিল তারও আগে, ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে। সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপন যাত্রার প্রাকমুহূর্তে শুরু হয় বৈশ্বিক মহামারি কোভিড-১৯। এরূপ প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কিছু কর্মসূচি বাস্তবায়নের কাজ অসমাপ্ত থাকার বিষয়টি বিবেচনায় এনে সম্প্রতি সরকার এই সময়কে ১৬ই ডিসেম্বর ২০২১ পর্যন্ত বৃদ্ধি করেছে।

মুজিব শতবর্ষ উদযাপন প্রতিটি বাঙালির জীবনে অভিজ্ঞতার অসাধারণ একটি অংশ। তাই এই আয়োজনে বাংলাদেশ এবং বিভিন্ন দেশে অবস্থানকারী বাঙালি যার যার অবস্থান থেকে বিপুলভাবে সম্পৃক্ত হয়েছেন। কোভিড-১৯ মহামারি পরিস্থিতিতেও সারা পৃথিবীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে নিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে নানা রকম আয়োজন চলছে। মুজিববর্ষের লোগো দেশে-বিদেশে এখন দৃশ্যমান। অন্তর্জালে নানা আয়োজনে সংযুক্ত হচ্ছেন দেশ-বিদেশের নানা মানুষ। ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে আছেন তারা। সর্বত্রই বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা জানিয়ে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে। মুজিববর্ষে করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলা করে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের ব্যাপকভাবে এবং স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের ফলে এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠেছে যে বঙ্গবন্ধু বাঙালির হূদয়ে অবিনশ্বর এক আসন নিয়ে আছেন, যা বাঙালির হাজার বছরের অতিক্রান্ত ইতিহাসে এক অনন্য ও প্রতিষ্ঠিত সত্য। ১৯৭১ সালের ১২ এপ্রিল প্রকাশিত নিউজউইক পত্রিকায় সাংবাদিক লরেন জেনকিন্স বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সম্পর্কে লিখেছেন : পূর্ব পাকিস্তানিরা তাকে ‘মুজিব’ নামে চেনে। তিনি আমাদের বিদেশি সাংবাদিক দলটির সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর অন্য সকল দূরদর্শী মন্তব্য ও ভবিষ্যদ্বাণীর মতো এই কথাও সঠিক প্রমাণিত হয়েছে। ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুর চেতনাকে হত্যা করতে পারেনি। এটি আজ তাঁর শাহাদত বরণের এত বছর পর আরও স্পষ্ট হয়েছে যে, বঙ্গবন্ধু বাঙালির হূদয়ে চিরন্ত আলোকশিখা হিসাবে আছেন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর ঘাতক কবলিত বাংলাদেশের সেই শোকাবহ শ্বাসরুদ্ধকর সময়ে কোটি কোটি মানুষ ঘটনার আকষ্মিকতায় তাদের শোক ও অশ্রুকে চাপা দিয়ে রেখেছিল। সেই মৃত্যুপুরীতে বঙ্গবন্ধুর শবযাত্রা সম্ভব হয়নি। টুঙ্গিপাড়ায় খুব তাড়াহুড়ো করে বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তানকে দাফন করা হয়েছিল। কিন্তু বাঙালির হূদয়ে বঙ্গবন্ধুর অন্তিমযাত্রা চিরবেদনা বহন করবে চিরকাল।’

মহাত্মা গান্ধী কিংবা জন এফ কেনেডির মৃত্যুর পর তখনকার পরিস্থিতি এতোটা প্রতিকূল ছিল না। জনগণ প্রকাশ্যে শোক প্রকাশ করার সুযোগ পেয়েছিল। ১৮৬৫ সালের ১৫ই এপ্রিল আততায়ীর গুলিতে আব্রাহাম লিংকনের মৃত্যু ঘটে। আব্রাহাম লিংকনের মৃত্যু আমেরিকাকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। মৃত্যুর পরে তার মরদেহ ওয়াশিংটন থেকে ইলিনয়ের স্প্রিংফিল্ডে নিয়ে যাওয়া হয়। এই দীর্ঘ যাত্রায় ২২শে এপ্রিল থেকে ৪ই মে পর্যন্ত প্রায় দুই সপ্তাহ সময় লেগেছিল। ১৯৪৮ সালে মহাত্মা গান্ধীর মৃত্যুর পর সংবাদ শিরোনাম হয়- ’The light has gone out’। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর আমাদের জাতীয় জীবনেও নেমে এসেছিল ঘোর অমানিশা, যা থেকে আলোর পথে উত্তরণ ছিল সুকঠিন ও শ্বাপদসংকুল পথযাত্রা। তবে শেষপর্যন্ত বেঁচে যায় বাংলাদেশ। দীর্ঘ নির্বাসন শেষে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসার পর শুরু হয়েছিল আবার নতুন পথচলা। শেষাবধি ২১ বছর পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সরকার রাষ্ট্র পরিচালনায় ফিরে আসে।

জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর যুগপত্ মহা-আয়োজনের অনন্য অভিজ্ঞতার সাক্ষী হতে চলেছে সমগ্র বাঙালি জাতি। এজন্য ১৭-২৬শে মার্চ ২০২১ ‘মুজিব চিরন্তন’ শীর্ষক দশ দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের জীবনব্যাপী আন্দোলন-সংগ্রাম এবং সর্বোপরি তার বৈচিত্র্যময় জীবনের নানান অনুষঙ্গকে উপজীব্য করে প্রতিদিন ভিন্ন ভিন্ন প্রতিপাদ্য নিয়ে আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানমালা সাজানো হয়েছে। ১৯২০ সালের ১৭ই মার্চের শুভক্ষণে বঙ্গবন্ধুর জ্যোতির্ময় আবির্ভাবকে উপজীব্য করে ১৭ই মার্চ ২০২১ তারিখে ‘জাতির পিতার জন্মতিথির জন্য বাঙালি ও বাংলাদেশ এক ও অভিন্ন সত্তা’ ও বাংলাদেশের প্রকৃতি-সংস্কৃতি থেকে শুরু করে প্রতিটি অনুষঙ্গে জড়িয়ে থাকা বঙ্গবন্ধুর শাশ্বত মহিমাকে উপজীব্য করে ১৯শে মার্চের নির্ধারিত থিম কবি অন্নদাশঙ্কর রায়ের সেই অমর পঙ্?ক্তি ‘যতকাল রবে পদ্মা যমুনা’।

বঙ্গবন্ধুর যে সাহসী তারুণ্য বাঙালি জাতিকে মুক্তির আন্দোলনে প্রজ্বলিত করেছিল, তার ভিত্তিতে ‘তারুণ্যের আলোকশিখা’কে ২০শে মার্চের প্রতিপাদ্য হিসাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া বাংলা ও বাঙালির প্রতি বঙ্গবন্ধুর গভীর ভালোবাসা ও মমত্ববোধকে উপজীব্য করে ২২শে মার্চে ‘বাংলার মাটি পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার নির্মমতা’ এবং বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাকে উপজীব্য করে ২৫শে মার্চে ‘গণহত্যার কালরাত্রি ও আলোকের অভিযাত্রা’কে নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতিপাদ্য হিসেবে। মহান স্বাধীনতার অতিক্রান্ত ৫০ বছর ও অজস্র ষড়যন্ত্র-প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার বিভিন্ন দিককে উপজীব্য করে ২৬শে মার্চে ‘স্বাধীনতার ৫০ বছর ও অগ্রগতির সুবর্ণরেখা’কে প্রতিপাদ্য হিসাবে নির্ধারণ করা হয়েছে।

মূলত মৃত্যুর পরে বাঙালির হূদয়ে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে শোক ও বিনম্র শ্রদ্ধার যে যাত্রা এখন শুরু হয়েছে, তা ‘মুজিব চিরন্তন’-এর যাত্রা। তাই মুজিব জন্মশতবার্ষিকী কর্ম এবং আত্মত্যাগের মহিমা আরও উদ্ভাসিত হবে। বুলেট বাঙালির মুক্তির মহানায়কের চেতনা ও আত্মাকে ধ্বংস করতে পারেনি। বঙ্গবন্ধুর সেই অবিনাশী চেতনাই মুজিববর্ষে আমাদের ‘মুজিব চিরন্তন’ যাত্রায় আমাদের অসীম প্রেরণা।

লেখক: কবি ও প্রধান সমন্বয়ক, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x