‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ থেকে...

‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ থেকে...
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ফাইল ছবি

১৯৫১ সালের অক্টোবর মাসে মওলানা ভাসানী ও আমি যখন জেলে, সেই সময় জনাব লিয়াকত আলী খানকে রাওয়ালপিন্ডিতে এক জনসভায় গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। খাজা নাজিমুদ্দীন সাহেব গভর্নর জেনারেলের পদ ছেড়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী হলেন এবং গোলাম মোহাম্মদ অর্থমন্ত্রী ছিলেন, তাকে গভর্নর জেনারেল করলেন। লিয়াকত আলী খান যে ষড়যন্ত্রের রাজনীতি শুরু করেছিলেন সেই ষড়যন্ত্রেই তাকে মরতে হলো।

কে বা কারা লিয়াকত আলী খানকে হত্যা করার পেছনে ছিল আজ পর্যন্ত তা উদ্ঘাটন হয় নাই। আর হবেও না। এই ষড়যন্ত্রকারীরা যে খুব শক্তিশালী ছিল তা বোঝা যায়। কারণ তারা কোনো চিহ্ন পর্যন্ত রাখে নাই। প্রকাশ্য দিবালোকে জনসমাবেশে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। কী করে হত্যাকারী অত নিকটে স্থান পেল? কী করে পিস্তল তুলে গুলি করল কেউই দেখতে পেল না কেন? গুলির সঙ্গে সঙ্গে আততায়ীকে গুলি করে হত্যা করার কারণ কী? অনেক প্রশ্নই আমাদের মনে জেগেছিল। যদিও তারই হুকুমে এবং নূরুল আমিন সাহেবের মেহেরবানিতে আমরা জেলে আছি, তবুও তার মৃত্যুতে দুঃখ পেয়েছিলাম। কারণ ষড়যন্ত্রের রাজনীতিতে আমরা বিশ্বাস করি না।

পাকিস্তানে যে ষড়যন্ত্রের রাজনীতি শুরু হয়ে গেছে, তাতেই আমাদের ভয় হলো। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে গুলি করে হত্যা করা যে কত বড় জঘন্য কাজ তা ভাষায় প্রকাশ করা কষ্টকর। আমরা যারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি, তারা এই সমস্ত জঘন্য কাজকে ঘৃণা করি। খাজা নাজিমুদ্দীন সাহেব তার মন্ত্রিত্বে একজন সরকারি আমলাকে গ্রহণ করলেন, তার নাম চৌধুরী মোহাম্মদ আলী। তিনি পাকিস্তান সরকারের সেক্রেটারি জেনারেল ছিলেন। তাকে অর্থমন্ত্রী করা হলো। এরপর আমলাতন্ত্রের প্রকাশ্য খেলা শুরু হলো পাকিস্তানের রাজনীতিতে। একজন সরকারি কর্মচারী হলেন গভর্নর জেনারেল, আরেকজন হলেন অর্থমন্ত্রী। খাজা সাহেব ছিলেন দুর্বল প্রকৃতির লোক। তিনি অনেক গুণের অধিকারী ছিলেন, তবে কর্মক্ষমতা এবং উদ্যোগের অভাব ছিল। ফলে আমলাতন্ত্র মাথা তুলে দাঁড়াল। বিশেষ করে যখন তাদেরই একজনকে অর্থমন্ত্রী করা হলো, অনেকের মনে গোপনে গোপনে উচ্চাশারও সঞ্চার হলো। আমলাতন্ত্রের জোটের কাছে রাজনীতিবিদরা পরাজিত হতে শুরু করল।

রাজনীতিকদের মধ্যে তখন এমন কোনো ব্যক্তিত্বসম্পন্ন নেতা মুসলিম লীগে ছিল না, যারা এই ষড়যন্ত্রকারী আমলাতন্ত্রকে দাবিয়ে রাখতে পারে। নাজিমুদ্দীন সাহেব গণতন্ত্রের মূলে কুঠারাঘাত করলেন। কারণ জাতীয় পরিষদের সদস্য নন, একজন সরকারি কর্মচারী, তাকে চাকরি থেকে পদত্যাগ করিয়ে মন্ত্রিত্ব দেওয়ার কি অর্থ থাকতে পারে? আমাদের মনে হলো একটা বিশেষ প্রদেশের চাপে পড়েই তাকে একাজ করতে হয়েছিল। তিনি প্রধানমন্ত্রী হলেও দুটা গ্রুপ তার ক্যাবিনেটে কাজ করছিল। একটা গ্রুপ পাঞ্জাবিদের আর একটা গ্রুপ বাঙালিদের। পাকিস্তানের অন্যান্য প্রদেশের নেতারা বাঙালি গ্রুপকে তলে তলে সাহায্য করছিল। খাজা সাহেব বিরাট ভুল করে বসলেন।

প্রধানমন্ত্রী হয়ে কিছুদিন পরে তিনি পূর্ব বাংলায় আসেন। প্রথমবারে তিনি কিছুই বলেন নাই। কিছুদিন পরে, বোধহয় ১৯৫১ সালের শেষের দিকে অথবা ১৯৫২ সালের জানুয়ারি মাসে পল্টন ময়দানে এক জনসভায় তিনি বক্তৃতা করলেন। সেখানে ঘোষণা করলেন, ‘উর্দুই পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে।’ তিনি ১৯৪৮ সালে পূর্ব বাংলার প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে যে ওয়াদা করেছিলেন, সে ওয়াদার খেলাপ করলেন। ১৯৪৮ সালের রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে চুক্তি করেছিলেন এবং নিজেই পূর্ব বাংলা আইনসভায় প্রস্তাব পেশ করেছিলেন যে, পূর্ব বাংলার অফিশিয়াল ভাষা ‘বাংলা’ হবে। তাছাড়া যাতে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা হয়, তার জন্য কেন্দ্রীয় আইনসভায় কেন্দ্রীয় সরকারকে অনুরোধ করা হবে। এ প্রস্তাব পূর্ব বাংলার আইনসভায় সর্বসম্মতিক্রমে পাশ হয়। যে ঢাকায় বসে তিনি ওয়াদা করেছিলেন সেই ঢাকায় বসেই উল্টা বললেন। দেশের মধ্যে ভীষণ ক্ষোভের সৃষ্টি হলো। তখন একমাত্র রাজনৈতিক দল পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ, ছাত্র প্রতিষ্ঠান ছাত্রলীগ এবং যুবাদের প্রতিষ্ঠান যুবলীগ সবাই এর তীব্র প্রতিবাদ করে।

আমি হাসপাতালে আছি। সন্ধ্যায় মোহাম্মদ তোয়াহা ও অলি আহাদ দেখা করতে আসে। আমার কেবিনের একটা জানালা ছিল ওয়ার্ডের দিকে। আমি ওদের রাত ১টার পরে আসতে বললাম। আরো বললাম, খালেক নেওয়াজ, কাজী গোলাম মাহাবুব আরো কয়েক জন ছাত্রলীগ নেতাকে খবর দিতে। দরজার বাইরে আইবিরা পাহারা দিত। রাতে অনেকে ঘুমিয়ে পড়েছে। তখন পেছনের বারান্দায় ওরা পাঁচ-সাত জন এসেছে। আমি অনেক রাতে একা হাঁটাচলা করতাম। রাতে কেউ আসে না বলে কেউ কিছু বলত না। পুলিশরা চুপচাপ পড়ে থাকে, কারণ জানে আমি ভাগব না। গোয়েন্দা কর্মচারী একপাশে বসে ঝিমায়। বারান্দায় বসে আলাপ হলো এবং আমি বললাম, সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন করতে। আওয়ামী লীগ নেতাদেরও খবর দিয়েছি। ছাত্রলীগই তখন ছাত্রদের মধ্যে একমাত্র জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠান। ছাত্রলীগ নেতারা রাজি হলো। অলি আহাদ ও তোয়াহা বলল, যুবলীগও রাজি হবে। আবার ষড়যন্ত্র চলছে বাংলা ভাষার দাবিকে নস্যাত্ করার। এখন প্রতিবাদ করলে কেন্দ্রীয় আইনসভায় মুসলিম লীগ উর্দুর পক্ষে প্রস্তাব পাশ করে নেবে। নাজিমুদ্দীন সাহেব উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার কথাই বলেন নাই, অনেক নতুন নতুন যুক্তিতর্ক দেখিয়েছেন। অলি আহাদ যদিও আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সদস্য হয় নাই, তবুও আমাকে ব্যক্তিগতভাবে খুবই শ্রদ্ধা করত ও ভালোবাসত।

আরো বললাম, ‘খবর পেয়েছি, আমাকে শিগিগরই আবার জেলে পাঠিয়ে দেবে, কারণ আমি নাকি হাসপাতালে বসে রাজনীতি করছি। তোমরা আগামীকাল রাতেও আবার এসো।’ আরো দু-একজন ছাত্রলীগ নেতাকে আসতে বললাম। শওকত মিয়া ও কয়েক জন আওয়ামী লীগ কর্মীকেও দেখা করতে বললাম। পরের দিন রাতে এক এক করে অনেকেই আসল। সেখানেই ঠিক হলো আগামী ২১শে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা দিবস পালন করা হবে এবং সভা করে সংগ্রম পরিষদ গঠন করতে হবে। ছাত্রলীগের পক্ষ থেকেই রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের কনভেনর করতে হবে। ফেব্রুয়ারি থেকেই জনমত সৃষ্টি করা শুরু হবে। আমি আরো বললাম, ‘আমিও আমার মুক্তির দাবি করে ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে অনশন ধর্মঘট শুরু করব। আমার ২৬ মাস জেল হয়ে গেছে। আমি এ কথাও বলেছিলাম, ‘মহিউদ্দিন জেলে আছে, আমার কাছে থাকে। যদি সে অনশন করতে রাজি হয়, তবে খবর দেব। তার নামটাও আমার নামের সঙ্গে দিয়ে দেবে। আমাদের অনশনের নোটিশ দেওয়ার পরই শওকত মিয়া প্যামপ্লেট ও পোস্টার ছাপিয়ে বিলি করার বন্দোবস্ত করবে।’

দুই দিন পরেই দেখলাম একটা মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করে আমাকে এক্সজামিন করতে এসেছে। তারা মত দিলেন আমি অনেকটা সুস্থ, এখন কারাগারে বসেই আমার চিকিত্সা হতে পারে। সরকার আমাকে ঢাকা জেলে পাঠিয়ে দিলেন, ভালোভাবে চিকিত্সা না করে। আমি জেলে এসেই মহিউদ্দিনকে সব কথা বললাম। মহিউদ্দিনও রাজি হলো অনশন ধর্মঘট করতে। আমরা দুজনে সরকারের কাছে পহেলা ফেব্রুয়ারি দরখাস্ত পাঠালাম। যদি ১৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে আমাদের মুক্তি দেওয়া না হয় তাহা হলে ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে অনশন ধর্মঘট করতে শুরু করব। দুইখানা দরখাস্ত দিলাম। আমাকে যখন জেল কর্তৃপক্ষ অনুরোধ করল অনশন ধর্মঘট না করতে তখন আমি বলেছিলাম, ২৬-২৭ মাস বিনা বিচারে বন্দি রেখেছেন। কোনো অন্যায়ও করি নাই। ঠিক করেছি জেলের বাইরে যাব, হয় আমি জ্যান্ত অবস্থায় না হয় মৃত অবস্থায় যাব। "Either I will go out of the jail or my deadbody will go out." তারা সরকারকে জানিয়ে দিল। বাইরে খবর দিয়েই এসেছিলাম এই তারিখে দরখাস্ত করব।

বাইরে সমস্ত জেলায় ছাত্রলীগ কর্মীদের ও যেখানে যেখানে আওয়ামী লীগ ছিল সেখানে খবর পাঠিয়ে দিয়েছিল। সামান্য কয়েকটা জেলা ছাড়া আওয়ামী লীগ তখনো গড়ে ওঠে নাই। তবে সমস্ত জেলায়ই আমার ব্যক্তিগত বন্ধু ও সহকর্মী ছিল। এদিকে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়েছে। একুশে ফেব্রুয়ারি দিনও ধার্য করা হয়েছে। কারণ, ঐদিনই পূর্ব বাংলার আইনসভা বসবে। কাজী গোলাম মাহাবুবকে সংগ্রাম পরিষদের কনভেনর করা হয়েছিল। ১৯৪৮ সালে ছাত্ররাই এককভাবে বাংলা ভাষার দাবির জন্য সংগ্রাম করেছিল। এবার আমার বিশ্বাস ছিল, জনগণ এগিয়ে আসবে। কারণ জনগণ বুঝতে শুরু করেছে যে, বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা না করতে পারলে তাদের দাসত্বের শৃঙ্খল আবার পরতে হবে। মাতৃভাষার অপমান কোনো জাতি সহ্য করতে পারে না।

পাকিস্তানের জনগণের শতকরা ৫৬ জন বাংলা ভাষাভাষী হয়েও শুধু বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা বাঙালিরা করতে চায় নাই। তারা চেয়েছে বাংলার সঙ্গে উর্দুকেও রাষ্ট্রভাষা করা হোক, তাতে আপত্তি নাই। কিন্তু বাঙালির এই উদারতাটাই অনেকে দুর্বলতা হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছে। এদিকে বাঙালিরা অনুভব করতে শুরু করেছে যে, তাদের ওপর অর্থনৈতিক দিক দিয়ে, ব্যবসা-বাণিজ্য, সরকারি চাকরিতেও অবিচার চলছে। পশ্চিম পাকিস্তানের করাচিতে রাজধানী হওয়াতে বাঙালিরা সুযোগ-সুবিধা হতে বঞ্চিত হতে শুরু করেছে। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি এবং শেষ পর্যন্ত সর্বদলীয় গ্রান্ড ন্যাশনাল কনভেনশনে স্বায়ত্তশাসনের দাবি করায় বাঙালিদের মনোাভাব ফুটে উঠেছে। পূর্ব বাংলার মুসলিম লীগ নেতারা যতই জনগণের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছিলেন ততই পশ্চিম পাকিস্তানের কোটারি ও আমলাতন্ত্রের ওপর নির্ভর করতে শুরু করেছেন ক্ষমতায় থাকার জন্য। খাজা নাজিমুদ্দীন ও জনাব নূরুল আমিন জনগণকে ভয় করতে শুরু করেছেন। সেই জন্য টাঙ্গাইল উপনির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পরে অনেকগুলো আইনসভার সদস্যের পদ খালি হওয়া সত্ত্বেও উপনির্বাচন দিতে সাহস পাচ্ছিলেন না।

জনগণের আস্থা হারাতে শুরু করেছিল বলে আমলাতন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল মুসলিম লীগ নেতারা। তখন পূর্ব বাংলার চিফ সেক্রেটারি ছিলেন জনাব আজিজ আহমদ (পুরানা আইসিএস)। তিনি বুদ্ধিমান এবং বিচক্ষণ ছিলেন, কাজকর্ম খুব ভালো বুঝতেন। কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধি হিসেবেই কাজ করতেন। হামিদুল হক চৌধুরী সাহেবের বিরুদ্ধে পোডো মামলায় সাক্ষী হিসেবে তিনি স্বীকার করেছিলেন, তিনি মন্ত্রীদের কাজকর্ম সম্বন্ধে ফাইল রাখতেন এবং কেন্দ্রীয় সরকারকে সে ব্যাপারে খবর দিতেন। হামিদুল হক চৌধুরী সাহেব মন্ত্রিত্ব ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন, কিন্তু তার সহকর্মীরা ক্ষমতায় ছিলেন।

তারা সাহস পেলেন না কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে। আজিজ আহমদের ব্যক্তিত্বের সামনে অনেকে কথা বলতেও সাহস পেতেন না। মুসলিম লীগ সরকার জনমত যাতে তাদের দিকে থাকে তার চেষ্টা না করে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল আওয়ামী লীগ এবং বিরুদ্ধ মতবাদের কর্মী ও নেতাদের ওপর। যে কোনো অজুহাতে নিরাপত্তা আইন ব্যবহার করতে শুরু করেছিল।

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x