স্মৃতিতে বঙ্গবন্ধু

স্মৃতিতে বঙ্গবন্ধু
ছবি: সংগৃহীত

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার কিছু স্মৃতি রয়েছে। আমার গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার লতিফপুর ইউনিয়নের মানিকদাহ গ্রামে। ১৯৪৮ সালে আমার বড় বোন সালেহা বেগম গোপালগঞ্জ শহরের বীণাপাণি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতেন। ঐ সময় আমি গোপালগঞ্জ শহরের পরেশ বাবুর পাঠশালায় পড়তাম। শহরের চৌরঙ্গীর একটি বাড়িতে আমরা থাকতাম। সেখানে লম্বা একটি টিনের ঘর ছিল। ঐ ঘরে বঙ্গবন্ধুর আপন ভাই শেখ আবু নাসের থাকতেন। বঙ্গবন্ধু গোপালগঞ্জে এলে এখানে আসতেন। একদিন বঙ্গবন্ধু ১০/১২ জনকে সঙ্গে নিয়ে ঐ বাড়িতে আসেন। তাদের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার চেয়ে লম্বা। তার চেহারা খুবই সুন্দর। কৌতূহল নিয়ে তার কাছে যেতেই তিনি আমাকে আদর করেন। পরের দিন ঐ বাড়িতে বঙ্গবন্ধু এলে আবারও আমি তার কাছে যাই। বঙ্গবন্ধু আমাকে বাদাম, ভুনভুনি ও চকলেট দেন। এটি আমার জীবনে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

১৯৫৪ সালের নির্বাচনে গোপালগঞ্জ-কোটালীপাড়া আসনে যুক্ত ফ্রন্ট থেকে প্রার্থী হন শেখ মুজিব। তার বিরুদ্ধে মুসলিম লীগের প্রার্থী হন পাকিস্তানের বাণিজ্যমন্ত্রী অহেদুজ্জামান। আমাদের গ্রামের প্রায় সবাই বঙ্গবন্ধুর সমর্থক ছিলেন। দু-একজন অহেদুজ্জামানকে সমর্থন করতেন। একদিন নির্বাচনি প্রচারণায় বঙ্গবন্ধু ও অহেদুজ্জামান আমাদের বাড়িতে আসেন। আমার বাবা মাকসুদুল হক চৌধুরী তাদের আপ্যায়ন করেন। তখন বঙ্গবন্ধু অহেদুজ্জামানকে জিজ্ঞাসা করেন, আপনি প্রচারে কোন পাড়ায় যাবেন। অহেদুজ্জামান বলেন, আমি পশ্চিমপাড়া যাব। বঙ্গবন্ধু এ কথা শুনে উত্তরপাড়ায় নির্বাচনি প্রচারণায় যান। সে সময় আমি স্কুলে পড়তাম। ঐ সময় বঙ্গবন্ধুকে কাছ থেকে দেখেছি।

১৯৪৮ ও ১৯৫৪ সালের পর বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার দেখা হয় ১৯৬২ সালে। তখন আমি বরিশাল বিএম কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণির ছাত্র। এ সময় আমি কলেজ ছাত্র সংসদের ড্রামা সেক্রেটারি ছিলাম। আর তোফায়েল আহমদ অ্যাথলেটিক সেক্রেটারি ছিলেন। ১৯৬২ সালে শিক্ষা আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন বঙ্গবন্ধু সমাবেশ করতে বরিশাল আসেন। আমি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করি। বঙ্গবন্ধু আমাকে দেখে বলে আরে এমদাদ তুই এখানে। তারপর বলেন, গোসল শেষ করে রেডি হয়ে মিটিংয়ে যাব। তারপর বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে মিটিংয়ে গেলাম। বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মালেক সাহেবের বাসায় এক সঙ্গে খাওয়ার সুযোগ হলো। তখন বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি মহিউদ্দিনসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।

আমি ১৯৬৮ সালে গোপালগঞ্জ মহকুমা ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হই। গোপালগঞ্জ ছাত্রলীগের নেতা নির্বাচিত হওয়ার পর বঙ্গবন্ধুর সংস্পর্শে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়।

১৯৭০ সালে ভোলায় জলোচ্ছ্বাসের পর আমরা গোপালগঞ্জ থেকে সেখানে রিলিফ নিয়ে যাই। এ সময় আমার সঙ্গে গোপালগঞ্জের ছাত্রলীগ নেতা বাচ্চু, ফরিদ, শহীদ মাহাবুব, জয়ন্তসহ অন্যরা ছিল। আমরা ভোলা শহরের তোফায়েল আহমদের শ্বশুরবাড়ি উঠি। হঠাত্ করে ভোলায় বঙ্গবন্ধুর আগমনের খবর পাই। আমরা ভোলা লঞ্চঘাটে বঙ্গবন্ধুকে স্বাগত জানাই। তিনি আমাদের বলেন, গোপালগঞ্জ থেকে মোল্লা জালাল উদ্দিন আহম্মেদ নির্বাচন করছে, তোমরা সেখানে গিয়ে কাজ করো। রিলিফ তোফায়েলের কাছে দিয়ে যাও। তখন রাত আনুমানিক ৮টা। ঐ সময় ভোলা থেকে গোপালগঞ্জে যাওয়ার কোনো লঞ্চ, নৌকা বা স্টিমার ছিল না। ঐ রাতটি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ভোলায় তোফায়েল আহমদের শ্বশুর বাড়িতে কাটালাম। তিনি বিশ্বের যত বিপ্লব হয়েছে, সে সম্পর্কে আমাদেরকে বলছিলেন। তিনি এসব বিপ্লবের সফলতা ও ব্যর্থতা নিয়ে অনেক গল্প করেন সেদিন। তখন তিনি বলেছিলেন, ‘আমি একটা দেশ বানাব। যুদ্ধের মাধ্যমে এটি বানাতে হবে। এ কাজের মূল শক্তি হচ্ছে ছাত্রলীগ ও শ্রমিক। এ কাজে আমি অনেকটা পথ এগিয়ে গেছি। আমরা পরিকল্পনা করে এগিয়ে যাব। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে সকালে আমরা ভোলা থেকে গোপালগঞ্জের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই।

আমরা মোল্লা জালাল উদ্দিনের নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। এর মধ্যে বঙ্গবন্ধু গোপালগঞ্জে আসেন। তিনি গোপালগঞ্জ থেকে খুলনা ও যশোর হয়ে ঢাকা যাবেন বলে জানান। বঙ্গবন্ধুর খুলনা যাওয়ার জন্য আমরা গয়না নৌকা ভাড়া করি। বঙ্গবন্ধু নৌকায় ওঠেন। আমরাও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে নৌকায় উঠি। জ্যোত্স্না রাতে নৌকার মধ্যে তিনি আমার সোনার বাংলা...আমি তোমায় ভালোবাসি... গানটি গাইতে শুরু করেন। তখন আমরা বলি এটি তো রবি ঠাকুরের কবিতা। তখন বঙ্গবন্ধু বলেন, এটিই হবে আমার দেশের জাতীয় সংগীত।

বঙ্গবন্ধুর ব্যাগ, বিছানা বহনসহ সব কাজ করে দিতেন সামচু। খুলনা মিটিং শেষে খাবার দেওয়া হলো। বঙ্গবন্ধু তখন সামচুর খোঁজ করেন। সামচুকে পাশের চেয়ারে বসিয়ে একসঙ্গে বঙ্গবন্ধু খাবার খান। তিনি যে, কত মহান নেতা এটি তার একটি নজির। এ ধরনের অনেক অনন্য গুণ তার মধ্যে ছিল।

১৯৭২ সালে গোপালগঞ্জ ছাত্রলীগের একটি বিষয় নিয়ে বঙ্গবন্ধু ছাত্রলীগ নেতাদের ঢাকা ডেকে পাঠান। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করার সময় গোপালগঞ্জ ছাত্রলীগের নেতাসহ কেন্দ্রীয় নেতা শেখ শহিদ, ইসমত কাদির গামা, শেখ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া পলিটিক্যাল সেক্রেটারি তোফায়েল আহমদ ছিলেন। পরে ঐ বিষয় নিয়ে বঙ্গবন্ধু আমাদের দিকনির্দেশনা দেন।

১৯৭৫ সালে বাকশালের গোপালগঞ্জের সেক্রেটারি হিসেবে আমার নাম প্রস্তাব করা হয়। এটি ১৬ আগস্ট থেকে কার্যকর করা হবে বলে জানতে পারি। আমি ১৪ আগস্ট ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করি। তিনি তখন ব্যস্ত ছিলেন, তাই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে শুধু কুশল বিনিময় হয়। সেটিই ছিল প্রিয় নেতার সঙ্গে শেষ দেখা।

লেখক: সভাপতি, গোপালগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগ

অনুলিখন: খোন্দকার এহিয়া খালেদ

ইত্তেফাক/কেকে

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x