মূলে ফেরা: মুজিববাদ ও ১৯৭২-এর সংবিধান

মূলে ফেরা: মুজিববাদ ও ১৯৭২-এর সংবিধান
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ছবি: সংগৃহীত

বঙ্গবন্ধু তার সারা জীবনের রাজনৈতিক যাত্রাপথ ও সংগ্রামের মাধ্যমে যে অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন, সেগুলোর ওপর ভিত্তি করেই দেশ চালানোর নীতি গ্রহণ করেন। আজন্ম দুঃখী মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য রাজনীতি করে আসা এই মহামানব জাতির ভাগ্য বদলাতে চেয়েছিলেন। তাই তিনি একটি সুষম সমাজব্যবস্থা গড়ার লক্ষ্যে কিছু নীতি নির্দিষ্ট করেন।

১৯৫৪ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে নৌকা প্রতীককে যেভাবে সাধারণ মানুষ লুফে নেয়, তাতে মানুষের চাওয়া-পাওয়ার দিকগুলো স্পষ্ট হয়ে যায় তরুণ নেতা শেখ মুজিবের কাছে। এরপর তিনি গণমানুষের সঙ্গে আরো বেশি সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন। মানুষের সঙ্গে মিলেমিশে, তাদের সঙ্গে নিয়ে, নতুন রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের দিকে ধাবিত হন তিনি। সোনার বাংলা গঠনের লক্ষ্যে, জাতির জন্য যেসব বৈশিষ্ট্য অর্জনের নীতি নিয়ে, দুই যুগের বেশি সময় মুক্তির সংগ্রাম করেছেন বঙ্গবন্ধু; সেই আদর্শগুলোই মুজিববাদ নামে পরিচিতি লাভ করে। আর স্বাধীনতার পর আমাদের যে সংবিধান প্রণীত হয়, তাতে ফুটে ওঠে বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ যাত্রাপথের সেই আদর্শ এবং গণমানুষের আকাঙ্ক্ষাগুলো।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য চারটি মূলনীতি নির্ধারণ করেন বঙ্গবন্ধু। সেগুলো হলো- জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা ও বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর ঘাতকেরা বাংলাদেশের স্বাধীনতার আদর্শকে ভূলুন্ঠিত করে দেয়। চার মূলনীতি থেকে বিচ্যুত হয় দেশ। ফলে উত্থান ঘটে উগ্রবাদের।

তবে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের পর সেই অন্ধকার অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটেছে। ২০১১ সালের ৩০ জুন, দীর্ঘ তিন যুগ পর এই চার নীতি আবার পর সংবিধানে ফিরেছে। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী আইন, ২০১১-এ বাহাত্তরের সংবিধানের এই সংক্রান্ত অনুচ্ছেদটি ফিরিয়ে আনা হয়। একইসঙ্গে সংবিধানের মৌলিক বিধানগুলোকে সংশোধনের অযোগ্য ঘোষণা করে একটি নতুন অনুচ্ছেদ যোগ করা হয়েছে। মোট ৫৫টি সংশোধনীসহ সংবিধান (পঞ্চদশ সংশোধন) আইন, ২০১১ জাতীয় সংসদে পাস করা হয়েছে।

এর আগে, ১৯৭৭ সালে জেনারেল জিয়াউর রহমান এক সামরিক আদেশে ১৯৭২ সালের সংবিধানের প্রস্তাবনা থেকে রাষ্ট্রের ওই চার মূলনীতির অংশটি পরিবর্তন করেছিল। এছাড়াও মুখবন্ধে 'জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রামের' শব্দবন্ধটি 'জাতীয় স্বাধীনতার জন্য ঐতিহাসিক যুদ্ধ' দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয় তখন। এরপর ১৯৭৯ সালের এপ্রিলে বিএনপি নেতৃত্বাধীন দ্বিতীয় সংসদের মাধ্যমে ওই প্রস্তাবনাটি সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়া হয়, যা পঞ্চম সংশোধনী হিসেবে পরিচিত।

২০১০ সালের ২৭ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ এক রায়ে পঞ্চম সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করে। একইসঙ্গে সংবিধানকে পঞ্চম সংশোধনীর আগের অবস্থানে ফিরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেন। আদালতের রায়ের আলোকে সংবিধান সংশোধনের জন্য গঠিত বিশেষ কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী বাহাত্তরের চার মূলনীতি ফিরিয়ে এনে ২০১১ সালের ৩০ জুন পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করা হয়।

সংশোধিত সংবিধানের প্রস্তাবনার প্রথম অনুচ্ছেদে ক) 'জাতীয় স্বাধীনতার জন্য ঐতিহাসিক যুদ্ধের' শব্দের পরিবর্তে 'জাতীয় মুক্তির ঐতিহাসিক সংগ্রামের শব্দগুলো প্রতিস্থাপিত হয়েছে।

খ) প্রস্তাবনার দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে প্রতিস্থাপিত হয়েছে, 'আমরা অঙ্গীকার করিতেছি যে, যে সকল মহান আদর্শ আমাদের বীর জনগণকে জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে আত্মনিয়োগ ও বীর শহীদদিগকে প্রাণোৎসর্গ করিতে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিল- জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্ম নিরপেক্ষতার সেই সকল আদর্শ এ সংবিধানের মূলনীতি হইবে;'- অংশটি।

অনুচ্ছেদ-৮ এর রাষ্ট্রীয় মূলনীতির দফা ১ ও ১ক) এর পরিবর্তে '(১) জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্ম নিরপেক্ষতা এ নীতিসমূহ এবং তৎসহ এ নীতিসমূহ হইতে উদ্ভূত এই ভাগে বর্ণিত অন্য সকল নীতি রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি বলিয়া পরিগণিত হইবে' প্রতিস্থাপিত হয়েছে।

বাঙালি জাতীয়তাবাদ বিষয়ে অনুচ্ছেদ ৯-এ প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, 'ভাষাগত ও সংস্কৃতিগত একক সত্ত্বাবিশিষ্ট যে বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ ও সংকল্পবদ্ধ সংগ্রাম করিয়া জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্জন করিয়াছেন, সেই বাঙালি জাতির ঐক্য ও সংহতি হইবে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি।'

অনুচ্ছেদ ১০-এ প্রতিস্থাপিত হয়েছে, 'সমাজতন্ত্র ও শোষণমুক্তি- মানুষের উপর মানুষের শোষণ হইতে মুক্ত ন্যায়ানুগ ও সাম্যবাদী সমাজলাভ নিশ্চিত করিবার উদ্দেশ্যে সমজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হইবে'।

এছাড়াও জাতীয় ক্রান্তিকালে সংবিধানের মৌলিক বিধানগুলোকে বদলে ফেলার পথ বন্ধ করতে সংশোধিত সংবিধানে নতুন একটি অনুচ্ছেদ যুক্ত করা হয়েছে।

অনুচ্ছেদ ৭ (খ) এ বলা হয়েছে, 'এ সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে যাহাই কিছু থাকুক না কেন, সংবিধানের প্রস্তাবনা, প্রথমভাগের সকল অনুচ্ছেদ, দ্বিতীয় ভাগের সকল অনুচ্ছেদ, নবম ক-ভাগে বর্নিত অনুচ্ছেদসমূহের বিধানাবলী সাপেক্ষে তৃতীয় ভাগের সকল অনুচ্ছেদ এবং একাদশ ভাগের অনুচ্ছেদ ১৫০-সহ সংবিধানের অন্যান্য মৌলিক কাঠামো সংক্রান্ত অনুচ্ছেদগুলোর বিধানবলী সংযোজন, পরিবর্তন, প্রতিস্থাপন, রহিতকরণ কিংবা অন্য কোনো পন্থায় সংশোধনের অযোগ্য হইবে।'

ইত্তেফাক/জেডএইচডি

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
আরও
আরও
x