বেটা ভার্সন
আজকের পত্রিকাই-পেপার ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২০, ২৯ শ্রাবণ ১৪২৭
৩১ °সে

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে অনমনীয় মিয়ানমার

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে অনমনীয় মিয়ানমার
ছবি: সংগৃহীত।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ত্বরান্বিত করতে বিশ্ব জনমত গঠনের লক্ষে সম্প্রতি কম্বোডিয়া সফর করেছেন পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির এক প্রতিনিধি দল। ফারুক খানের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ানের সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনে কম্বোডিয়ার সহযোগিতা চান। এই সফরে কম্বোডিয়ার বিখ্যাত গণমাধ্যম খামের টাইমসের সঙ্গে রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে কথা বলেছেন পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রতিনিধি দলের চেয়ারম্যান ফারুক খান। সেই সাক্ষাতকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশটি তুলে ধরা হলো

খামের টাইমস: গতমাসে আসিয়ানের পক্ষ থেকে মিয়ানমারের একটি প্রতিনিধি দল রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে আলোচনা করতে ঢাকা গিয়েছিল।আমরা কি আলোচনার ফলাফল জানতে পারি এবং এই শরনার্থীদের প্রত্যাবাসনের বিষয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে কি কোন সত্যিকারের অগ্রগতি হয়েছে?

ফারুক খান: রোহিঙ্গা প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে গত ১৭ ডিসেম্বর থেকে ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত কক্সবাজারের বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্প সফর করেন মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক সংস্থা ও অর্থনীতিক বিভাগের পরিচালক চ্যান অ্যায়ের নেতৃত্বে ৯ সদস্য বিশিষ্ট প্রতিনিধি দল । সেখানে তারা রোহিঙ্গাদের রাখাইনের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত নিজেদের ঘর-বাড়িতে ফিরে যেতে উৎসাহ দেন। মিয়ানমারের প্রতিনিধি দল ছাড়াও ৭ সদস্যের একটি দল ছিল ওই সফরে ছিল। এই নিয়ে তৃতীয়বারের মতো রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে আলোচনা হলো। একই রকম আলোচনা ২০১৮ সালের অক্টোবরে এবং ২০১৯ সালের জুলাইয়ে কোন রকম ফলাফল ছাড়াই শেষ হয়েছিল।

এদিকে মিয়ানমার অবকাঠামো সুবিধার কথা বললেও রোহিঙ্গারা তাদের অধিকার, নিরাপত্তা এবং সুরক্ষা নিয়ে শঙ্কিত । মিয়ানমারের প্রতিনিধি দল অন্য বৈঠকগুলোর মতো এবারো রোহিঙ্গাদের মূল শঙ্কার বিষয়টি নিয়ে অনমনীয় ছিল তাই কোন ধরণের ফলাফল আসেনি। তবে এই ধরণে বৈঠক চলতে থাকবে।

খামের টাইমস: আপনার এই সফর এবং উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের বৈঠকের পর কম্বোডিয়ার কাছ থেকে আপনি আশা করছেন? সত্তর কিংবা আশি দশকে শরনার্থী নিয়ে কম্বোডিয়ার যে অভিজ্ঞতা পেয়েছে সেটি দিয়ে কি রোহিঙ্গা শরনার্থীদের সমস্যার সমাধান হতে পারে?

ফারুক খান: মিয়ানমার এবং কম্বোডিয়া উভয়ই আসিয়ানের সদস্য। বাংলাদেশ সব আশিয়ানভুক্ত দেশ থেকে এই সমস্যা সমাধানে সমর্থন আশা করে। এটি এমন একটি সংকট যদি দীর্ঘদিন ধরে সমাধান না হয়ে তাহলে আঞ্চলিক শান্তি , উন্নতি এবং উন্নয়ন বিনষ্ট হবে। প্রত্যেকটি প্রত্যাবাসনই প্রকৃতিগতভাবে আলাদা এবং রোহিঙ্গা সংকটটিও তেমন। রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায় যাদের দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে বঞ্চনার শিকার হচ্ছে। রোহিঙ্গাদের শঙ্কা দূর করতে পারাই এই সংকট সমাধানে একমাত্র স্থায়ী সমাধান হতে পারে। আমরা স্বাগত জানাবো যদি কম্বোডিয়া রোহিঙ্গাদের তাদের জন্মভূমিতে স্থায়ী প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারকে সাহায্য করতে চায়।

খামের টাইমস: মিয়ানমার আসিয়ানের সদস্য। আপনার কি মনে হয় কি আসিয়ান বাংলাদেশকে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে কোন রকম সাহায্য করেছে যদিও কোন সদস্য দেশের বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার বিষয়ে আসিয়ানের একটি নীতি রয়েছে।

ফারুক খান: রোহিঙ্গাদের তাদের দেশে প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে আসিয়ানের অন্তর্ভুক্ত দেশগুলো একটি অর্থবহ বৈঠকের জন্য উৎসাহ প্রদান করতে পারে। বাংলাদেশ আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক দেশগুলোকেও রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং স্বত:স্ফূর্ত প্রত্যাবাসনের জন্য ঐক্যবদ্ধ থাকার আহবান জানাচ্ছে।

খামের টাইমস: যদি মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে রাজি হয় তাহলে একটি নিরাপদ এবং সুরক্ষিত প্রত্যাবাসন পর্যবেক্ষণে আপনি কি জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীবাহিনী হতে পারে সেটি অস্ত্রসজ্জিত অথবা কোন প্রতিনিধি দলের হস্তক্ষেপ চান ?

ফারুক খান: আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখা হাসিনা শুধু মানবিক দিক চিন্তা করে বড় সংখ্যার রোহিঙ্গাদের সাময়িকভাবে আশ্রয় দিয়ে একটি সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এটি আমদের জন্য সম্মানের যে আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা নিয়ে সফলভাবে কোনরকম দুর্ঘটনা ছাড়া এই মানবিক জরুরী অবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করেছি এবং এখনো আমরা তাদের আশ্রয়, খাদ্য, নিরাপত্তা এবং স্যানিটেশন সহ সকল মানবিক সহায়তার বিষয়টি দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করে যাচ্ছি। এর জন্য আমরা আমাদের ৬ হাজার ৮ শত একর জমি নষ্ট করেছি এবং এতে আমাদের জীববৈচিত্র্য এবং বন্যজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বাংলাদেশ এখন এমন পরিস্থিতিতে নেই যে অনির্দিষ্টকালের জন্য এই রোহিঙ্গাদের এই বোঝা বহন করবে। রোহিঙ্গা সংকটের তৈরি হয়েছে মিয়ানমারে এবং সমাধান তাদেরই করতে হবে। পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের স্থায়ী এবং নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জন্য রোহিঙ্গাদের শঙ্কা এবং এই সংকটের মূল কারণ নিয়ে সামনে নিয়ে আসাটা অপরিহার্য। স্বতঃস্ফূর্ত প্রত্যাবাসনের জন্য অনুকূল অবস্থা তৈরি করার ব্যাপারটি রাজনৈতিক, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক কারণের সাথে সংশ্লিষ্ট। স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা, পদ্ধতিগত বৈষম্য এবং প্রান্তিককরণ দূর করা এবং সংঘ্যালঘুদের সাথে সৌহার্দ্য সম্পর্ক রাখা জরুরি যাতে তারা অবকাঠামো এবং জীবিকা নির্বাহের পর্যাপ্ত সুযোগ পায়। এই রোহিঙ্গাদের অবশ্যই তাদের দেশে নিরাপত্তা, সম্মান এবং অধিকার দিয়ে মিয়ানমারের সমাজে তাদের ফিরিয়ে নিতে হবে।

খামের টাইমস: আপনার কি মনে হয় মিয়ানমারের ওপর বহুপাক্ষিক হস্তক্ষেপ এবং মৃদু চাপ কোন ফলাফল আনতে পারবে?

ফারুক খান: আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের রোহিঙ্গাদের বিষয়টির ওপর থেকে দৃষ্টিপাত সরানো উচিত হবে না এবং মিয়ানমারকে অব্যাহতভাবে চাপ দিয়ে যেতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অব্যাহতভাবে মিয়ানমারের কাছ থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত হওয়ার জন্য সুযোগ নিতে হবে। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে একটি বার্তা দিতে চায় সেটি হলো মিয়ানমারের ওপর কূটনীতিক চাপ ছাড়া রোহিঙ্গাদের ফেরানো কঠিন হবে।যদি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় অপরাধীদের শাস্তি দিতে ব্যর্থ হয় তাহলে এরকম আরো অনেক গণহত্যার ঘটনা ঘটবে।

ইত্তেফাক/এআর

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত