বেটা ভার্সন
আজকের পত্রিকাই-পেপার ঢাকা সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২০, ২৯ আষাঢ় ১৪২৭
২৭ °সে

বিশেষায়িত চিকিৎসাব্যবস্থা সংকুচিত হয়ে আসছে

কিডনি হার্ট লিভার নিউরোলজিসহ বিপুলসংখ্যক অসংক্রমক রোগী সুচিকিত্সা থেকে বঞ্চিত, এদের মৃত্যুর হার করোনার চেয়ে বেশি, কিন্তু কেউ খবর রাখে না
বিশেষায়িত চিকিৎসাব্যবস্থা সংকুচিত হয়ে আসছে
ছবি: ইত্তেফাক

করোনা মহামারিকে কেন্দ্র করে দেশের চিকিৎসা সেবায় চরম বেহাল দশা বিরাজ করছে। বিশেষায়িত চিকিৎসা ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে সংকুচিত হয়ে আসছে। করোনা আক্রান্ত নন কিন্তু অন্য গুরুতর রোগ রয়েছে এমন রোগীরা জরুরি চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং কঠিন এক সময় পার করছেন। বিশেষ করে কিডনি, হার্ট, লিভার, নিউরোলজি, ক্যান্সার, ডায়াবেটিসসহ বিপুল সংখ্যক অসংক্রামক রোগী এখন চরম বিপাকে পড়েছেন। যারা নিয়মিত দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতেন। কিন্তু এখন ন্যুনতম চিকিৎসা সেবা পাচ্ছেন না। তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেক বেড়েছে। এদের মৃত্যুর হার করোনার চেয়ে বেশি। কিন্তু কেউ খবর রাখে না। গর্ভবতী নারী, প্রসূতি ও শিশুদের ক্ষেত্রেও স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ জানান, দেশের বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোতে যার যা চিকিৎসা তাই করবে। সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের কোন রোগী যদি করোনায় আক্রান্ত হন তাহলে ওই হাসপাতালে আলাদা আইসোলেশনে রেখে তাদের সেবা প্রদান করবে। কিন্তু নতুন করে কোন বিশেষায়িত হাপসাতালকে কোভিড হাসপাতাল করা হবে না।

এদিকে কোভিড-১৯ টেস্টের রিপোর্ট সঙ্গে না থাকায় হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা না দিয়ে রোগীকে ফিরিয়ে দেয়া, রাস্তায় অজানা গন্তব্যে ঠেলে দেয়া, অ্যাম্বুলেন্সে হাসপাতালের পর হাসপাতাল ঘুরে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়ার ঘটনা এখন নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। কোভিড হাসপাতালগুলো কোভিড টেস্টের পজিটিভ রিপোর্ট ছাড়া লক্ষণ ও উপসর্গ আছে এমন রোগীদেরও ফিরিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে নন-কোভিড হাসপাতালগুলো কোভিড টেস্টেও নেগেটিভ রিপোর্ট ছাড়া সাধারণ রোগীদের সেবা দিচ্ছে না। অথচ এর আগে মন্ত্রণালয় ও অধিদফতর থেকে সব ধরনের রোগীর চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে দেশের সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতালে নির্দেশনা দেয়া হয়। তবে কোনো নির্দেশনা কাজে আসছে না।

অবস্থা এমন যে, সাধারণ রোগীদের সেবা না দিলেও তাদের কোনো রকম শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে না। এমনটা বুঝেই হাসপাতালগুলো নিজেদের সুবিধামতো সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। এদিকে ডাক্তারদের প্রাইভেট চেম্বারও বন্ধ। দীর্ঘদিনের পরিচিত রোগীরাও ফোন করে তাদের সেবা নিতে পারছেন না। অনেক হাসপাতাল থেকে দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা মুঠোফোন আলাপেই রোগীদের হাসপাতালে আসতে নিষেধ করছেন। দেশজুড়ে করোনাবহির্ভূত লাখ লাখ অসংক্রামক রোগী রয়েছেন। যাদের অনেকের অবস্থা এতটা গুরুতর যে, শুধু ডাক্তারের সঙ্গে ফোনালাপ করে ওষুধ দেয়া সম্ভব না। অনেকের জরুরি অপারেশন করার বিষয় রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হল, এসব বিষয় নিশ্চিত করার কার্যত যেন কেউ নেই। ফলে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ঘুরতে ঘুরতে রোগীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। এমনকি প্রসূতিরাও জরুরি স্বাস্থ্য সেবা পাচ্ছেন না। হাসপাতালে ভর্তি না করায় হাসপাতাল চত্ত্বরে ভ্যান গাড়িতেও সন্তান জন্মদানের ঘটনা ঘটেছে।

অপরদিকে হাসপাতালগুলো থেকে রোগীদেরকে চিকিত্সা পেতে হলে আগেই করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত কি না সেই টেস্ট করে আসতে বলা হচ্ছে। এতে জটিল রোগে আক্রান্ত এবং জরুরি চিকিৎসা সেবা প্রয়োজন এমন রোগীরা কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন। চেষ্টা করলেও সহসাই করোনা টেস্ট করানো যাচ্ছে না। করোনা টেস্টের জন্য নির্ধারিত হাসপাতালগুলোতে মধ্য রাত থেকে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েও নমুনা দিতে অনেককে হিমশিম খেতে হয়েছে। আবার নমুনা দিতে পারলেও টেস্টের রিপোর্ট আসতেই অনেক সময় পার হয়ে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও করোনা টেস্ট করাতে গিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে রোগীদের মত্যু পর্যন্ত হয়েছে। জীবিত অবস্থায় করোনা টেস্ট করাতে না পারলেও মৃত্যুর পরে অনেকের নমুনা নেয়া হচ্ছে। ভুক্তভোগী কিছু মানুষ ইত্তেফাককে তাদের দুর্দশার কথা তুলে ধরে বলেন, অসুস্থ ব্যক্তি এবং তাদের উদ্বিগ্ন স্বজনরা চিকিৎসা পরিষেবা পেতে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটে চলেছেন এবং করোনার এ সংকটের সময়ে অন্য গুরুতর রোগীরা কীভাবে চিকিৎসা পাবেন বা রোগ নির্ণয় করাবেন সেই বিষয়ে কোনো পরিকল্পনা না থাকায় অনেক রোগী চিকিৎসা পাওয়ার আগেই মারা যাচ্ছেন। তারা বলেন, ‘অব্যবস্থাপনা’, চিকিৎসকদের অতিরিক্ত নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত সুরক্ষার প্রতি ঝোঁক, ভাইরাস সংক্রমণের ভয় এবং জনবলের অভাবে বহু সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালই অন্য রোগীদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। এমনকি গুরুতর রোগী যারা কোভিড-১৯ আক্রান্ত নন তাদেরও স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য করোনা রোগীদের নির্ধারিত হাসপাতালগুলোতে স্থানান্তর করে ঝুঁকিতে ফেলা হচ্ছে।

করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত নন এমন রোগীরা নিয়মিত চেকআপ এবং চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন কারণ অনেক সিনিয়র চিকিৎসক ভাইরাস সংক্রমণ এড়াতে রোগীদের চিকিৎসা দিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন। আর ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক), বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ), কুর্মিটোলা এবং মুগদা জেনারেল হাসপাতালের মতো বিশেষায়িত হাসপাতালগুলো করোনার পরীক্ষা এবং করোনা রোগীদের চিকিৎসার বিষয়টিকে প্রাধান্য দিচ্ছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ণ ইউনিটকে যখন কোভিড ইউনিট ঘোষণা করা হলো, তখন সিদ্ধান্ত হয় পোড়া রোগীদের বার্ণ ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হবে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল-২ যখন কোভিড হাসপাতালে রূপান্তরিত হলো, তখন সিদ্ধান্ত হয় যে, নিউরো রোগীদের রাজধানী নিউরো সার্জারী ইনস্টিটিউটে সেবা দেওয়া হবে। হার্টের রোগীদের হূদরোগ হাসপাতাল এবং কিডনির রোগীদের কিডনি ইনস্টিটিউটে চিকিত্সা সেবা দেওয়া হবে। কিন্তু পরবর্তীতে ওই সব হাসপাতালগুলোতেও কোডিভ রোগীদের সেবা দেয়া হচ্ছে। ফলে লক্ষ লক্ষ অসংক্রামক রোগী ও জরুরি রোগীরা সেবা নেওয়ার জায়গা পাচ্ছেন না। সারা বছর বেসরকারি হাসপাতাল রোগীর কাছ থেকে মোটা অংকের অর্থ আদায় করলেও এখন আর সেই রোগীকেই চিনছে না।

অথচ দেশে করোনা রোগীর শনাক্ত হওয়ার পর শুরুতেই বলা হয়েছিল, কোভিড ও নন-কোভিড রোগীদের জন্য অবশ্যই চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। যাতে কেউ চিকিৎসা বঞ্চিত না হয়। কিন্তু বাস্তবতা অত্যন্ত করুণ। দেশে গত ৮ মার্চ প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার পর থেকে একের পর এক অসুস্থ রোগী বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছে। একটু চিকিত্সার জন্য প্রতিনিয়ত শত অনুনয় করেও হাসপাতালে ভর্তি হতে পারছে না অসংখ্য রোগী। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয়ে উঠেছে যে করোনা চিকিৎসার জন্য মনোনীত নয় এমন এক ডজন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে সম্প্রতি কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে কিডনিজনিত সমস্যায় মারা গেছেন অতিরিক্ত সচিব গৌতম আইচ সরকার। গৌতমের আইচের মেয়ে সুস্মিতা আইচ, যিনি নিজেও একজন চিকিত্সক এবং চিকিৎসা পরামর্শের জন্য সরকারের ৩৩৩ হেল্পলাইনে কাজ করেন। তিনি বলেন, তিনি তার বাবাকে বিএসএমএমইউ, ডিএমসিএইচ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ, ইউনাইটেড, স্কয়ার, ল্যাবএইড, ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ এবং আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ সব বড় বড় সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তির চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তারা বিভিন্ন অজুহাতে ভর্তি নিতে অস্বীকৃতি জানায়।

নগরীর বাসাবো এলাকার বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা আলমাস উদ্দিনের মেয়েও প্রায় একই রকম অভিজ্ঞতার কথা জানান। তার বাবা মার্চ মাসের শেষের দিকে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়ে বিনা চিকিত্সায় মারা গেছেন। তিনি তার বাবাকে আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ, বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতাল, বারডেম জেনারেল হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, পপুলার মেডিকেল কলেজ এবং দুটি কোভিড হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কথা জানান। এরপর কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতার আন্তরিক প্রচেষ্টার পর আলমাস উদ্দিনকে মুগদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও কয়েক ঘণ্টা পরই তিনি মারা যান।

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার কাশীপুর গ্রামের ৭০ বছর বয়সী ওষুধের দোকানদার আমান উল্লাহ সম্প্রতি জ্বরে আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। আমান উল্লাহর মেয়ে শর্মি মাহমুদ বলেন, ‘আমরা বাবাকে নারায়ণগঞ্জ শহরের একজন চিকিৎসকের চেম্বারে নিয়ে গিয়েছিলাম এবং কিছু রোগ নির্ণয়ের পরে তার ফুসফুসের সংক্রমণ ধরা পড়ে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বাবাকে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল এবং কয়েকটি ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হলেও করোনাভাইরাস আক্রান্ত সন্দেহে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে চিকিৎসা দিতে অস্বীকৃতি জানায়।’

রাজধানীর পান্থপথে বিআরবি হাসপাতালের আইসিও বিভাগের প্রধান প্রফেসর ডা. সাজ্জাদুর রহমানের করোনা উপসর্গ দেখা দিলে নিজের হাসপাতালেই চিকিৎসার সুযোগ পাননি। অনেক চেষ্টা তদবির করে তিনি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তির সুযোগ পান। ওই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে আইসিইউ সাপোর্ট না পেয়ে মারা যান। যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা সামিরা জাবেরী। ৩০ মে রাত ১০টার দিকে সামিরা করোনা উপসর্গ-শ্বাসকষ্ট নিয়ে একটি হাসপাতালে ভর্তি হন। আইসিইউ বিভাগে ২০টি ভেন্টিলেটরের মধ্যে বেশিরভাগ খালি পড়ে আছে। অভিজ্ঞ চিকিত্সক সংকটের অজুহাতে তাকে অক্সিজেন সাপোর্ট দেয়া হয়নি। এ বিভাগের এনেসথেসিয়া চিকিৎসকও অপারগতা প্রকাশ করেন। ওই রাতেই চিকিৎসা না পেয়ে সামিরা জাবেরী মারা যান। একজন কিডনি ডায়ালিসিস রোগী অনেক আগে থেকেই নির্দিষ্ট একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়মিত চিকিৎসা গ্রহণ করেন। গত ৭ মে ওই রোগী সেখানে চিকিৎসা নিতে গেলে তাকে চিকিত্সা না দিয়ে অন্য কোনো হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কয়েকটি হাসপাতাল ঘুরে অবশেষে ওই দিনই বিকেলে রোগীটি মারা যায়।

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত