পুলিশ সদস্যরা বিপথে যায় কীভাবে?

সব জেলায় কাজ করে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা, পুলিশের ওপর নজরদারিও তাদের কাজের মধ্যে
পুলিশ সদস্যরা বিপথে যায় কীভাবে?
পুলিশ। ছবি: ফাইল

একদিকে টাকা ছাড়া থানায় সেবা মেলে না, অন্যদিকে একের পর এক হয়রানির শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। সম্প্রতি ধরে নিয়ে টাকা দাবি, ক্রসফায়ার, ইয়াবাসহ নানা মাদক দিয়ে ধরিয়ে দেওয়া ও বিভিন্ন মামলায় জড়িয়ে দেওয়ার হুমকির অভিযোগ এসেছে পুলিশের বিরুদ্ধে।

মামলার বাদী-বিবাদী উভয়ের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়। জিডি করতেও পয়সা লাগে। যৌন নির্যাতনের শিকার ৮৪ শতাংশ নারীই থানায় যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন না। এর কারণ হিসেবে তারা পুলিশের দ্বারা হেনস্তা হওয়ার কথা বলেছেন।

তবে সবার প্রশ্ন, পুলিশ সদস্যরা বিপথে যায় কীভাবে? কারণ সব জেলায় কাজ করে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা। পুলিশের ওপর নজরদারিও তাদের কাজের মধ্যে পড়ে। তাহলে পুলিশ খারাপ কাজ করে পার পায় কীভাবে। বিষয়গুলো কেন পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তা, মন্ত্রণালয় ও সরকার জানতে পারে না। তাহলে কি গোয়েন্দা সংস্থাও ঘুষের টাকা পায়?

ওসির ওপরে দুই থানার সার্কেলে এক জন সহকারী পুলিশ সুপার কিংবা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার থাকেন। তার ওপরে পুলিশ সুপার। এসপির সঙ্গে এক জন কিংবা দুই অতিরিক্ত পুলিশ সুপার থাকেন। এসপির ওপরে থাকেন সাত/আটটি জেলা মিলে রেঞ্জের এক জন ডিআইজি। এর সঙ্গে কয়েক জন অতিরিক্ত ডিআইজি থাকেন।

এছাড়া জেলা ও থানা পর্যায়ে আছে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা। তাদের দায়িত্ব থানায় মনিটরিং করা। দুদকও রয়েছে দুর্নীতির বিষয়টি দেখার। কিন্তু অধিকাংশ কর্মকর্তা এ দায়িত্ব পালন করেন না। এজন্য অধিকাংশ ওসি বেপরোয়া। তাছাড়া কোনো কোনো থানার ওসি বদলি হতে ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা ঘুষ দিতে হয়।

টেকনাফের ওসি হতে ১ কোটি টাকা লাগে। কক্সবাজার সদর, মহেশখালী ও চকোরিয়া থানার ওসি হতে বিপুল পরিমাণ অর্থের ঘুষ লাগে। যেগুলোতে ঘুষ বেশি সেসব থানাকে গুরুত্বপূর্ণ থানা বলা হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে হাইওয়ের প্রতিটি থানা গুরুত্বপূর্ণ। সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা ঢাকায় আসে—পরবর্তীতে তা সারা দেশে ছড়িয়ে যায়। অধিকাংশ ওসি কিছুই করে না। কারণ ইয়াবা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে তারা টাকা পান। আর সেই টাকা ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের দিয়ে থাকেন।

অধিকাংশ এসপি, ডিআইজি মাস শেষে ঘুষের টাকার জন্য বসে থাকেন। আর ঘুষ পান বলে তারা সঠিকভাবে মনিটরিং করেন না। মনে হয় থানার ওসি অন্য কারোর দ্বারা পরিচালিত হয়। অথচ তাদের ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা দ্বারা পরিচালিত হওয়ার কথা। উল্লিখিত কারণে পুলিশ বিপথে যায়। এতে মানুষ কতটুকু ন্যায়বিচার পায়, এ প্রশ্ন সবার।

কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভে গত শুক্রবার রাতে মেজর (অব.) সিনহাকে গুলি করে পুলিশ হত্যা করে। পরের দিন কক্সবাজারের এসপি এ বি এম মাসুদ হোসেন সাংবাদিকদের সামনে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন সিনহা এবং মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়েছে। এসব তথ্য সারাদিনই তিনি মিডিয়ার কাছে বলে গেছেন। কিন্তু জেলার দায়িত্বশীল এক জন পুলিশ কর্মকর্তা হয়ে তিনি প্রকৃত ঘটনা জানার চেষ্টা করেননি। ঘটনা সম্পর্কে টেকনাফ থানা পুলিশ যা বলেছে উনি সেটাই দিনভর তোতাপাখির মতো বিভিন্ন টিভিতে বক্তব্য দিয়ে গেছেন। এই ধরনের দায়িত্ব পালনের কারণে থানা পুলিশ ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তার কাছে জবাবদিহিতা করার প্রয়োজন মনে করেন না। এখন এমন পরিস্থিতি বিরাজ করছে থানাসমূহে।

নানা অপরাধে লিপ্ত হওয়ার অভিযোগ পুলিশের বিরুদ্ধে নতুন নয়। সম্প্রতি তা আরো বেড়েছে। সম্প্রতি টেকনাফের ঘটনায় পুলিশে কালিমা লেপন করে দিয়েছে। করোনা মোকাবিলায় পুলিশের অনেক ভূমিকা ছিল। কিন্তু একটি ঘটনায় পুলিশের সব অর্জন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি ঘটনার জন্য পুরো পুলিশ বাহিনী দায়ী হতে পারে না।

সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানকে গুলি করে হত্যার মামলায় টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ পরিদর্শক লিয়াকত আলীসহ তিন আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে সাত দিনের জন্য র্যাব হেফাজতে পাঠিয়েছে আদালত। টেকনাফ থানার সদ্য প্রত্যাহার করা ওসি প্রদীপ কুমার দাশের ঘুষবাণিজ্য ও লুটপাটের হাতিয়ার ছিল কথিত বন্দুকযুদ্ধের নামে ক্রসফায়ার।

ইয়াবার এ প্রবেশদ্বার টেকনাফে ক্রসফায়ারের রেকর্ড সৃষ্টি করেছেন পুলিশের এ সাবেক ওসি। টেকনাফে পুলিশের গুলিতে অবসরপ্রাপ্ত মেজর রাশেদ সিনহার মৃত্যুর ঘটনায় আসামি টেকনাফ থানার বরখাস্ত ওসি প্রদীপ কুমার দাশের প্রতাপ ছিল পুরো চট্টগ্রাম বিভাগেই। পুলিশের গুলিতে সাবেক সেনা কর্মকর্তা নিহতের ঘটনায় প্রত্যাহারের আগেও বেশ কয়েক বার প্রত্যাহার এমনকি বরখাস্ত হয়েছিলেন ওসি প্রদীপ কুমার দাশ। ১৯৯৬ সালে চাকরি শুরুর পর কর্মজীবনের বেশির ভাগ সময় কাটে চট্টগ্রাম মহানগর ও কক্সবাজারে। তার বিরুদ্ধে অন্যের জমি দখলই নয়, নিজের পরিবারের সদস্যদের জমি দখলেরও অভিযোগ আছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তারা পুলিশের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগের সত্যতা স্বীকার করে বলেন, থানার ওসিরা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করছেন কি না তা দেখার দায়িত্ব ডিআইজি, এসপি ও সার্কেলের এএসপিদের। কিন্তু তারা সঠিকভাবে মনিটরিং করছেন না। গোয়েন্দা সংস্থাও পুলিশের অপকর্মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। তারা নিয়মিত ঘুষের টাকার ভাগ পান।

ইত্তেফাক/জেডএইচ

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত