করোনাকালীন হত্যাকাণ্ডের কারণ ও ধরন পালটেছে

সম্বন্ধীর হাতে আবাসন ব্যবসায়ী খুন পল্লবী ও মোহাম্মদপুরে খুনের ক্লু নেই
করোনাকালীন হত্যাকাণ্ডের কারণ ও ধরন পালটেছে
করোনাকালীন হত্যাকাণ্ডের কারণ ও ধরন পালটেছে

করোনাকালীন সময়ে অপরাধের ধরন বদলাচ্ছে। নানা তুচ্ছ কারণে হত্যাকাণ্ড ঘটছে। তবে এসব হত্যাকাণ্ড বা অপরাধের নেপথ্যে সম্প্রতি আর্থিক লেনদেন নিয়ে দ্বন্দ্ব, আর্থিক অভাব অনটন ও পারিবারিক কলহের জের ধরে সংঘটিত হয়েছে। তবে কোভিড-১৯ নিয়ে পুলিশ সদস্যরা ব্যস্ত থাকায় অন্য দিকগুলো নিয়ে দেখভালে কিছুটা শিথিলতা তৈরি হওয়ায় অপরাধ বেড়েছে।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীতে তিনটি খুনের ঘটনা ঘটে। সম্প্রতি করোনা মহামারিতে একদিনে রাজধানীতে পৃথকভাবে তিনটি হত্যার ঘটনা এটিই প্রথম। তবে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলোকে চলমান অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে দাবি করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গণমাধ্যম ও জনসংযোগ শাখার উপকমিশনার ওয়ালিদ হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় আবাসন ব্যবসায়ী ও পল্লবীতে অটোরিকশা চালক হত্যার ঘটনা পুলিশ তদন্ত করছে। এই দুইটি খুনের কারণও শনাক্ত করেছে। আর মোহাম্মদপুরের ফ্ল্যাট থেকে কিশোরীর গলিত লাশ উদ্ধার করার ঘটনাটি আত্মহত্যার ঘটনা হতে পারে। ঐ কিশোরী আত্মহত্যা করতে গিয়ে ওড়না ছিঁড়ে নিচে পড়ে মাথায় আঘাত লেগে মারা যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও সামাাজিক অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, করোনাকালীন সময়ে অপরাধের চিত্র ও ধরনে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। সেই পরিবর্তনগুলো শুধু বাংলাদেশে নয়, সারাবিশ্বে ঘটেছে। তবে হঠাত্ করে রাজধানীতে অপরাধ ও নৃসংশতা বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলছেন, প্রথমত প্রতিটি হত্যাকাণ্ডই পূর্বপরিকল্পিত, মনোমালিন্য ও ক্ষোভ জড়িত। এই সময়ে সুযোগ বুঝেই অপরাধীরা তা ঘটিয়েছে। দ্বিতীয়ত, যে কোনো সংকটকালীন সময়ে মানুষের মনে নানা ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়। যে অস্থিরতা কখনো আর্থিক কারণে, কখনো পারিবারিক সম্পদের কারণে আবার কখনো কর্মক্ষেত্রে কর্মপরিবেশ নিয়ে নিরপত্তার অভাবেও তৈরি হয়ে থাকে। এছাড়াও বৃহত্ পরিবেশে রাষ্ট্র ও পরিবারে নিজেকে টিকিয়ে রাখার যে সংগ্রাম তার কারণেও অস্থিরতা তৈরি হয়। আর এই অস্থিরতার কারণে বেশির ভাগ অপরাধ ঘটে থাকে।

আরও পড়ুন: সিনহা হত্যাকাণ্ড নিয়ে উস্কানিমূলক বক্তব্য কাম্য নয়

পুলিশ জানায়, গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর মোহাম্মদপুরের কাদেরাবাদ হাউজিংয়ের দোতলার ফ্ল্যাট থেকে জেরিন আক্তার নামে এক কিশোরীর গলিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। মোহাম্মদপুর থানার ওসি আবদুল লতিফ জানান, কী কারণে কিশোরীর মৃত্যু হয়েছে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। দুইটি বিষয় ধারণা করা হচ্ছে। এক, খাটের পাশে প্লাস্টিকের টুল পড়েছিল। ধারণা করা হচ্ছে, ফ্যানের সঙ্গে গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করতে গিয়ে ছিঁড়ে পড়ে মাথায় আঘাত লেগে মৃত্যু হতে পারে। ফ্যানে ওড়না প্যাঁচানো ছিল। দ্বিতীয় কারণ হিসেবে ধারণা করা হচ্ছে—মেয়েটি নেশাজাতীয় কিছু খেয়ে মারা যেতে পারে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়া গেলে মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।

শুক্রবার ভোরে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার এন ব্লকের একটি নির্মাণাধীন বাড়ির দোতলা থেকে সজীব বিল্ডার্সের মালিক আবুল খায়েরের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় নিহতের মেয়ে খাদিজা আক্তার বাদী হয়ে ভাটারা থানায় একটি হত্যামামলা দায়ের করেন।

এ ব্যাপারে পুলিশের গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার সুদীপ চক্রবর্তী বলেন, আবুল খায়েরকে হত্যা করেছে তারই সম্বন্ধী মিলন (৩৫)। তারা দুই জন এক সঙ্গে নির্মাণকাজের ব্যবসা করতেন। দুই জনই আগে রাজমিস্ত্রি ছিলেন। নির্মাণকাজ করতে করতে তারা নিজেদেরকে প্রকৌশলী বলে দাবি করেন। তারা বিভিন্ন ভবন চুক্তিতে নির্মাণের কাজ করেন। নির্মাণাধীন বাড়ির দোতলার ফ্লোরে বসে তারা পাওনা টাকার হিসাবনিকাশ করতে গিয়ে এক পর্যায়ে কথা কাটাকাটি হলে মিলন একটি লোহার রড দিয়ে খায়েরের মাথায় আঘাত করে। এতে ঘটনাস্থলে খায়ের লুটিয়ে পড়ে। মিলন চাঁদপুরে পালিয়ে যান। গতকাল তাকে গ্রেফতার করে। এ ব্যাপারে মিলন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

গত শুক্রবার পল্লবীর মহিলা ডিগ্রি কলেজের পাশের সড়কে বিহারি ক্যাম্পের বাসিন্দা মোহাম্মদ ফিরোজকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডে জড়িতরা স্থানীয় মাদক কারবারি ও সন্ত্রাসী গ্রুপের সদস্য। দীর্ঘদিন ধরে তারা এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালালেও পুলিশ তাদেরকে গ্রেফতার করতে পারেনি। ফলে তারা বেপরোয়া হয়ে উঠছে বলে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।

নিহত ফিরোজ একটি মামলায় ১৪ বছর জেল খেটে কয়েক মাস আগে মুক্ত হয়ে এলাকায় ফিরে অটোরিকশা চালাতেন। এ হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের সম্পর্কে প্রাথমিক তথ্য পেলেও গত ২৪ ঘণ্টায় এক জনকেও গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। জানতে চাইলে পল্লবী থানার ওসি নজরুল ইসলাম বলেন, প্রকাশ্যে এক জনকে হত্যা করা হয়। সেখানে অনেক লোকজন ছিলেন। এখন জানতে চাওয়া হলে কেউ ঠিকমতো কোনো তথ্য দিচ্ছে না। তবে ঘটনাস্থলের আশপাশের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে সন্দেহভাজন কয়েক জনের খোঁজ চলছে।

ইত্তেফাক/এএএম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত